অসুস্থতা থেকে সুস্থতা লাভ
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার স্বামীর অসুস্থতার কথা শুনে খুবই দুঃখিত হলাম। আল্লাহ তা'আলা তাকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন এবং আপনাদের পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনুন। আমিন।
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে বলব, ইসলামে রোগ থেকে মুক্তি ও মানসিক শান্তির জন্য দুটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে— চিকিৎসা (ঔষধ) এবং দুয়া ও আমল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "প্রতিটি রোগের ঔষধ আছে। যখন রোগের সঠিক ঔষধ প্রয়োগ করা হয়, তখন আল্লাহর হুকুমে রোগ নিরাময় হয়।" (সহীহ মুসলিম: ২২০৪)
তাই প্রথমে নিশ্চিত করুন যে আপনার স্বামী একজন ভালো ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। হেপাটাইটিস একটি জটিল রোগ, তাই চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি নিম্নোক্ত আমলগুলো করবেন ইনশাআল্লাহ।
১. রোগ থেকে মুক্তির জন্য দুয়া ও আমল
ক) রোগীকে পড়ে দম করা: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোগীকে দেখতে গিয়ে এই দুয়া পড়তেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা রাব্বান্নাস, আজহিবিল বা'সা, ইশফি আনতাশ শাফী, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা।" অর্থ: "হে আল্লাহ! মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করুন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্য দাতা। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখবে না।" (সহীহ বুখারী: ৫৭৪২)
খ) সূরা ফাতিহা দিয়ে দম করা: সূরা ফাতিহা是所有 রোগের শিফা। এটি পড়ে রোগীর শরীরে দম করলে অনেক উপকার হয়। হাদিসে আছে, সাহাবায়ে কেরাম সূরা ফাতিহা দিয়ে দম করেছিলেন এবং রোগী সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। (সহীহ বুখারী: ৫৭৩৬)
গ) সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস দিয়ে দম: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ হলে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে নিজের শরীরে দম করতেন। (সহীহ বুখারী: ৫০১৬)
ঘ) আয়াতুল কুরসি: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আয়াতুল কুরসি পড়লে আল্লাহর হেফাজতে থাকে। এটি রোগ ও জিনের কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করে।
২. মানসিক শান্তির জন্য আমল
ক) নামাজ ও জিকির: আল্লাহ তা'আলা বলেন, "জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ শান্তি পায়।" (সূরা রাদ: ২৮) প্রতিদিন ফজরের পর এবং এশার পর এই জিকিরগুলো করুন:
- সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি ১০০ বার
- আস্তাগফিরুল্লাহ ১০০ বার
- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ১০০ বার
খ) দুয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযান।" অর্থ: "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে আশ্রয় চাই।" (সহীহ বুখারী: ৬৩৬৯)
গ) ধৈর্য ধারণ করা: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "মুসলিমের জন্য যে কোনো কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, পেরেশানি এমনকি কাঁটার আঘাত লাগলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন।" (সহীহ বুখারী: ৫৬৪১)
৩. বদনজর সম্পর্কে আপনার প্রশ্ন
আপনি যে লক্ষণগুলো বলেছেন—রুকায়ার সময় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা হওয়া এবং ব্যথার জায়গা বদলানো—এটি বদনজর বা জিনের প্রভাবের লক্ষণ হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। ইসলামে বদনজর সত্য। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "বদনজর সত্য।" (সহীহ মুসলিম: ২১৮৭)
বদনজর থেকে বাঁচার আমল:
- মাশাআল্লাহ বলা: কোনো ভালো জিনিস দেখলে "মাশাআল্লাহ, তাবারাকাল্লাহ" বলা।
- সূরা ফালাক ও নাস নিয়মিত পড়া।
- আয়াতুল কুরসি পড়া।
৪. পারিবারিক কলহ দূর করার আমল
ক) বেশি বেশি ইস্তিগফার করা: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার সব দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন।" (আবু দাউদ: ১৫১৮)
খ) দান-সাদকা: আপনি বলেছেন দান-সাদকা করেন, এটি খুবই ভালো। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "দান-সাদকা রোগ দূর করে এবং বিপদ থেকে রক্ষা করে।" (তিরমিজি: ১৯৬৫)
গ) স্বামীর সাথে নরম ব্যবহার: আল্লাহ তা'আলা বলেন, "তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার, তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করে।" (সূরা নিসা: ১৯)
৫. ঘুমের মধ্যে কথা বলার বিষয়ে
ঘুমের মধ্যে কথা বলা সাধারণত শারীরিক বা মানসিক চাপের কারণে হয়ে থাকে। এটি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। তবে যদি এটি বাড়তে থাকে, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সাথে সাথে এই আমলগুলো করুন:
- ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়া।
- সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে শরীরে দম করা।
- ডান কাতে ঘুমানো (সুন্নাহ)।
৬. বিশেষ পরামর্শ
১. ডাক্তারের পরামর্শ নিন: আপনার স্বামীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা গুরুতর মনে হচ্ছে। একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়মিত দেখান। ২. রুকায়া করান: যদি বদনজর বা জিনের প্রভাব সন্দেহ হয়, তাহলে একজন বিশ্বস্ত ও আলেম রুকায়া করান। তবে মনে রাখবেন, রুকায়া করা জায়েজ, কিন্তু কোনো তাবিজ-কবজ পরা বা ঝাড়ফুঁক করা জায়েজ নয়। ৩. ধৈর্য ধরুন: এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। ধৈর্য ধরলে আল্লাহ অবশ্যই উত্তম প্রতিদান দেবেন।
দুয়া: আল্লাহ তা'আলা আপনার স্বামীকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন, আপনার পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনুন এবং আপনাদের সব সমস্যার সমাধান করুন। আমিন।