দ্বীনের পথে চলতে চাইলে পরিবার ও আত্মীয়দের বিরোধিতার ক্ষেত্রে আমার করণীয় কী?
Family Life · Hanafi
Question
আমি নন-মাহরাম আত্মীয়দের সামনে পর্দা করতে চাই কিন্তু পরিবার মনে করে আত্মীয়দের সামনে পর্দা করা সম্ভব নয় এবং সামাজিকভাবে এটি মেনে নেওয়া হবে না। এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে আমার প্রায়ই অশান্তি হয়। তারা বলে সমাজে থাকতে হলে কিছু বিষয় মানিয়ে নিতে হয়।
আমি একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গী চাই। কিন্তু পরিবার বলে, “এমন দ্বীনদার ছেলে কোথায় পাওয়া যাবে?” তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এমন ছেলে খুঁজতে রাজি হলেও পরিপূর্ণভাবে দ্বীন মেনে চলে, স্ত্রীকে পর্দায় সহযোগিতা করবে এমন ছেলে খোঁজার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। বরং তারা যাকে পছন্দ করবে তাকেই যেন আমি বিয়ে করি এমন চাপ রয়েছে। তারা আরও বলে আমি যদি আমার চাহিদা অনুযায়ী দ্বীনদার ছেলে চাই তাহলে হয়তো আমার জন্য ছেলে পাওয়া যাবে না।
পরিবার চায় আমি পড়াশোনা করে চাকরি করি এবং চাকরি করাকে ভবিষ্যতের জন্য জরুরি মনে করে। অন্যদিকে আমি নিজের জীবনকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করতে চাই। এমনকি IOM-এর মতো দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিবার এর খরচ দিতেও রাজি নয়।
আমার প্রশ্ন হলো আমি যদি দ্বীনের পথে থাকতে চাই এবং শরিয়ত অনুযায়ী নন-মাহরাম থেকে পর্দা করতে চাই কিন্তু পরিবার ও আত্মীয়রা আমাকে বাধা দেয় এবং বলে যে এতে সমাজে চলা যাবে না বা আমার বিয়ে হবে না তাহলে আমার করণীয় কী?
পরিবারের সঙ্গে অশান্তি না করে কীভাবে আমি দ্বীন মেনে চলতে পারি? বাবা-মায়ের আনুগত্যের সীমা কোথায়? আর তারা যদি এমন কিছু করতে বলেন যা শরিয়তসম্মত নয় তাহলে আমার কী করা উচিত? এই ক্ষেত্রে তাদের অবাধ্য হলে কি আমার গুনাহ হবে?
বিয়ের ক্ষেত্রেও কি শুধু পরিবারকে সন্তুষ্ট করার জন্য এমন কাউকে বিয়ে করতে হবে যাকে আমি দ্বীনদার জীবনসঙ্গী হিসেবে উপযুক্ত মনে করি না? নাকি নিজের দ্বীন ও ভবিষ্যৎ সংসারের জন্য দ্বীনদার পাত্র চাওয়ার অধিকার আমার আছে? বড়দের সম্মান করতে গিয়ে কি আমার বেদ্বীন কাউকে বিয়ে করা উচিত নাকি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা উচিত?
Answer
দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে পরিবার ও আত্মীয়দের বিরোধিতার ক্ষেত্রে করণীয়
উত্তর (সংক্ষেপে): ইসলামে পর্দা ও দ্বীনদার জীবনসঙ্গী নির্বাচন আপনার শরিয়তসিদ্ধ অধিকার। পিতা-মাতার আনুগত্য ফরজ, তবে তা কেবল শরিয়তসম্মত বিষয়ে। তারা যদি হারাম বা শরিয়তবিরোধী কাজের আদেশ দেন, তবে তা মানা যাবে না—এবং সেক্ষেত্রে অবাধ্য হওয়া গুনাহ নয়; বরং দ্বীন রক্ষা করা আপনার দায়িত্ব। তবে তাদের সঙ্গে অশান্তি না করে ধৈর্য, নম্রতা ও হিকমতের সঙ্গে চলা কর্তব্য।
১. পিতা-মাতার আনুগত্যের সীমা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا ۖ وَإِن جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا ۚ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
"আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তবে তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছু শরিক করতে বাধ্য করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না।" (সূরা আনকাবুত: ৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
"সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১০৯৫; সহীহ)
সারকথা: পিতা-মাতার আনুগত্য ওয়াজিব, তবে তা শরিয়তসম্মত বিষয়ে। শরিয়তবিরোধী আদেশে আনুগত্য করা যাবে না, এবং সেক্ষেত্রে অবাধ্য হওয়া গুনাহ নয়।
২. পর্দা সম্পর্কে
পর্দা কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا...
"মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত করবে, লজ্জাস্থান হেফাজত করবে এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না..." (সূরা নূর: ৩১)
নন-মাহরাম আত্মীয় (যেমন: চাচা-ফুফু, মামা-খালা, খালাতো-ফুপাতো ভাই ইত্যাদি) সম্পর্কে স্পষ্ট বিধান রয়েছে—তারা মাহরাম নয়, তাদের সামনে পর্দা ফরজ। শুধু চাচা-মামা-ফুফু-খালা (যারা মাহরাম) ছাড়া তাদের সন্তানরা নন-মাহরাম।
ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেন:
"নন-মাহরাম আত্মীয়দের সামনে পর্দা করা ফরজ।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৬৭)
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
"চাচাতো-ফুপাতো-খালাতো-মামাতো ভাইয়েরা সবাই নন-মাহরাম। তাদের সামনে পর্দা করা ফরজ।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৩৫)
সুতরাং পরিবারের চাপে পর্দা ত্যাগ করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়। এটি আল্লাহর হুকুম, সৃষ্টির সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করা যাবে না।
৩. দ্বীনদার জীবনসঙ্গী নির্বাচন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
"নারীকে চারটি কারণে বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও।" (সহীহ বুখারি: ৫০৯০)
পুরুষের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। দ্বীনদার পাত্র চাওয়া আপনার শরিয়তসিদ্ধ অধিকার। পরিবারের পছন্দের বাইরে গিয়ে বেদ্বীন বা অসৎ চরিত্রের কাউকে বিয়ে করতে বাধ্য হওয়া ইসলামে নেই।
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি: বিবাহে পাত্র-পাত্রীর সম্মতি অপরিহার্য। জোরপূর্বক বিয়ে ইসলামে বৈধ নয়।
لَا تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ إِلَّا بِإِذْنِ وَلِيِّهَا، وَلَا تُنْكَحُ إِلَّا بِإِذْنِهَا
"নারীর বিয়ে তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া হয় না, তবে তার সম্মতি ছাড়াও নয়।" (সুনানে আবু দাউদ: ২০৯৫)
৪. ব্যবহারিক করণীয়
ক. পর্দার ক্ষেত্রে:
- ধীরে ধীরে ও হিকমতের সঙ্গে পর্দা বাড়ান। একসঙ্গে সবকিছু পরিবর্তন করতে গেলে পারিবারিক সংঘাত বাড়ে।
- নরম ভাষায় বোঝান: "আমি আল্লাহর হুকুম পালন করছি, এতে আমার ক্ষতি নেই।"
- নন-মাহরাম আত্মীয়দের সামনে সম্ভব হলে আলাদা বসা, ওড়না/হিজাব ব্যবহার, দৃষ্টি সংযত রাখা—এগুলো ধীরে ধীরে চালু করুন।
- কঠোরতা নয়, ধৈর্য—এটি দাওয়াতের পথ।
খ. বিয়ের ক্ষেত্রে:
- দ্বীনদার পাত্রের জন্য দুআ করুন (সূরা ফুরকান: ৭৪-এর দুআ)।
- পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করুন, তাদের বোঝান যে দ্বীনদার ছেলে মানে সংসারে শান্তি ও বরকত।
- ইসলামি পরিবেশে পাত্র খোঁজার চেষ্টা করুন—মসজিদ, দ্বীনি প্রতিষ্ঠান, বিশ্বস্ত আলেমদের মাধ্যমে।
- জোরপূর্বক বিয়েতে সম্মতি দেবেন না—এটি আপনার অধিকার।
গ. পড়াশোনা ও চাকরির ক্ষেত্রে:
- শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে পড়াশোনা ও চাকরি করা জায়েজ, যদি পর্দা ও দ্বীন রক্ষা হয়।
- IOM-এর মতো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে পড়ার ইচ্ছা থাকলে পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুন; না হলে নিজের সামর্থ্যে বা বৃত্তির মাধ্যমে চেষ্টা করুন।
- দ্বীনি ইলম অর্জন প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব—কমপক্ষে ফরজ ইলম।
ঘ. পারিবারিক অশান্তি এড়াতে:
- ধৈর্য ও দুআ—আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
- নম্র ব্যবহার—কঠোরতা নয়, ভালোবাসা দিয়ে বোঝান।
- গোপনীয়তা রক্ষা—সব বিষয়ে তর্ক নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অটল থাকুন।
- বিশ্বস্ত আলেম/মুরুব্বির সাহায্য নিন—পরিবারের সঙ্গে মধ্যস্থতা করাতে পারেন।
৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- পর্দা ত্যাগ করা যাবে না—এটি আল্লাহর হুকুম, পরিবারের সন্তুষ্টির জন্য নয়।
- বেদ্বীন বা অসৎ চরিত্রের কাউকে বিয়ে করতে বাধ্য হওয়া যাবে না—এটি আপনার অধিকার।
- পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া তখনই জায়েজ যখন তারা শরিয়তবিরোধী কাজের আদেশ দেন; তবে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না।
- ধৈর্য ধারণ করুন—আল্লাহর সাহায্য আসবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা তালাক: ২)
৬. উপসংহার
আপনার করণীয় হলো:
- পর্দা ও দ্বীন রক্ষা করুন—এটি আল্লাহর হুকুম।
- পিতা-মাতার আনুগত্য করুন—শরিয়তসম্মত বিষয়ে।
- শরিয়তবিরোধী আদেশ মানবেন না—এতে গুনাহ নেই।
- দ্বীনদার পাত্র চাওয়ার অধিকার আপনার আছে—এটি শরিয়তসিদ্ধ।
- ধৈর্য, দুআ ও হিকমতের সঙ্গে পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
- বিশ্বস্ত আলেমদের পরামর্শ নিন।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম পথ সহজ করে দিন এবং দ্বীনদার জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।