সুদ গ্রহণকারী ব্যক্তির সম্পদ মেয়েকে দেওয়া কি জায়েয? সুদের টাকা দিয়ে কেনা জমি, জায়গা বা সোনা মেয়ের জন্য হালাল হবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
এখন প্রশ্ন হলো—এই ব্যক্তির মালিকানাধীন জমি, জায়গা বা সোনা যদি তাঁর মেয়েকে দেওয়া হয়, তাহলে মেয়ের জন্য সেগুলো গ্রহণ করা, মালিক হওয়া বা ব্যবহার করা কি শরিয়তসম্মত ও হালাল হবে? নাকি বাবার সুদ গ্রহণ ও ব্যবহারের কারণে তাঁর সম্পদের কোনো অংশ মেয়ের জন্য হারাম হয়ে যাবে?
Answer
সুদের টাকায় ক্রয়কৃত সম্পদ মেয়েকে দেওয়া কি জায়েয?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
এক ব্যক্তির মূল উপার্জন হালাল, কিন্তু তিনি ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ গ্রহণ করেন এবং সেই সুদের টাকা দিয়ে বিভিন্ন খরচ করেন। প্রশ্ন হলো—তাঁর মালিকানাধীন জমি, জায়গা বা সোনা যদি তিনি মেয়েকে দেন, তবে মেয়ের জন্য তা গ্রহণ করা, মালিক হওয়া ও ব্যবহার করা কি শরিয়তসম্মত?
মূল উত্তর
১. সুদ গ্রহণ করা কঠোরভাবে হারাম
সুদ (রিবা) ইসলামে স্পষ্টভাবে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লানত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
কাজেই ব্যাংক থেকে সুদ গ্রহণ করা ও তা খরচ করা সুস্পষ্ট হারাম। এ থেকে তাওবা করা ও পরিত্যাগ করা অবশ্যই কর্তব্য।
২. সুদের টাকা দিয়ে কেনা সম্পদের হুকুম
ফুকাহায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সুদের টাকা দিয়ে কোনো জিনিস ক্রয় করলে সেই জিনিসের মালিকানা স্বতঃসিদ্ধভাবে হারাম হয়ে যায় না; বরং উক্ত সম্পদ নিজের মালিকানায় থাকলেও তা থেকে উপকৃত হওয়া থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব, এবং সুদের টাকার পরিমাণ সদকা করে দেওয়া আবশ্যক।
আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন:
"সুদের টাকা যদি কারো হাতে আসে, তবে তা তার মালিকানায় প্রবেশ করে না; বরং তা ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে সদকা করা ওয়াজিব।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৪৭, দারুল ফিকর)
তবে যদি সম্পদটি হালাল ও হারাম মিশ্রিত টাকা দিয়ে কেনা হয়, তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নিকট হালাল অংশের অনুপাতে তা হালাল, আর হারাম অংশের অনুপাতে তা হারাম। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর নিকট সম্পূর্ণ সম্পদই হালাল, তবে হারাম অংশের পরিমাণ সদকা করা ওয়াজিব। (আল-হিদায়া, কিতাবুল বুয়ু; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫)
৩. মেয়েকে সম্পদ দান করার হুকুম
এখন প্রশ্ন হলো—যদি পিতা তাঁর মেয়েকে জমি, জায়গা বা সোনা দান করেন, তবে মেয়ের জন্য তা গ্রহণ করা কি জায়েয?
বিস্তারিত হুকুম:
ক) যদি সম্পদটি সম্পূর্ণ হালাল উপার্জন দিয়ে কেনা হয়: তাহলে তা মেয়েকে দান করা সম্পূর্ণ জায়েয, এবং মেয়ের জন্য তা গ্রহণ করা, মালিক হওয়া ও ব্যবহার করা হালাল।
খ) যদি সম্পদটি সুদের টাকা দিয়ে কেনা হয় বা হালাল-হারাম মিশ্রিত টাকা দিয়ে কেনা হয়: তাহলে হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী—
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: হারাম অংশের অনুপাতে সম্পদটি হারাম। সুতরাং মেয়েকে দেওয়ার আগে হারাম অংশের পরিমাণ সদকা করে বাকি হালাল অংশ মেয়েকে দেওয়া যাবে।
- সাহেবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.)-এর মত: সম্পদটি হালাল, তবে হারাম অংশের পরিমাণ সদকা করা ওয়াজিব। এই মতটি অধিক সহজ ও প্রয়োগযোগ্য।
ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) উল্লেখ করেন:
"সুদের টাকা দিয়ে কেনা জিনিসের মালিকানা হালাল নয়; বরং তা সদকা করা ওয়াজিব। তবে যদি হালাল ও হারাম মিশ্রিত হয়, তবে হারাম অংশের পরিমাণ সদকা করে বাকি অংশ ব্যবহার করা জায়েয।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩০-৩৩২)
৪. মেয়ের জন্য করণীয়
মেয়ের জন্য করণীয় হলো—
- যদি জানা যায় যে সম্পদটি সম্পূর্ণ হালাল টাকা দিয়ে কেনা — তবে তা গ্রহণ করা ও ব্যবহার করা জায়েয।
- যদি জানা যায় যে সম্পদটি সুদের টাকা দিয়ে কেনা বা মিশ্রিত — তবে:
- পিতার উচিত প্রথমে হারাম অংশের পরিমাণ সদকা করে দেওয়া, তারপর মেয়েকে দেওয়া।
- যদি পিতা তা না করেন এবং মেয়ে জানে যে সম্পদটি সুদের টাকা দিয়ে কেনা, তবে মেয়ের জন্য উক্ত সম্পদ গ্রহণ করা ও ব্যবহার করা জায়েয হবে না; বরং তার উচিত পিতাকে সদকা করার জন্য বলা।
- তবে যদি মেয়ে না জানে বা জানার সুযোগ না থাকে, তবে সে গ্রহণ করতে পারে; গুনাহ পিতার উপরই বর্তাবে।
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন:
"সুদের টাকা দিয়ে কেনা জিনিসের মালিকানা হালাল নয়; বরং তা সদকা করা ওয়াজিব। যদি কেউ তা না জেনে গ্রহণ করে, তবে তার উপর গুনাহ নেই; গুনাহ দাতার উপর।" — (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮৯)
৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- সুদ গ্রহণ করা, খাওয়া, খাওয়ানো, লেখা, সাক্ষী হওয়া—সবই হারাম। (সহিহ মুসলিম)
- সুদের টাকা দিয়ে কেনা সম্পদ হালাল করার একমাত্র উপায় হলো—হারাম অংশের পরিমাণ সদকা করা। (ফাতাওয়া উসমানি)
- মেয়েকে সম্পদ দান করার আগে পিতার উচিত সুদের টাকা থেকে তাওবা করা ও হারাম অংশ সদকা করা।
- যদি পিতা সুদ গ্রহণ ও ব্যবহার অব্যাহত রাখেন, তবে তাঁর অন্যান্য হালাল সম্পদ হারাম হয়ে যায় না; শুধু সুদের টাকা ও তা দিয়ে কেনা জিনিসের হুকুম আলাদা।
সারসংক্ষেপ
| অবস্থা | মেয়ের জন্য হুকুম | |---|---| | সম্পদ সম্পূর্ণ হালাল টাকা দিয়ে কেনা | গ্রহণ, মালিক হওয়া ও ব্যবহার করা হালাল | | সম্পদ সুদের টাকা দিয়ে কেনা | হারাম অংশ সদকা করার পর বাকি অংশ হালাল; সদকা না করলে গ্রহণ করা জায়েয নয় | | সম্পদ হালাল-হারাম মিশ্রিত টাকা দিয়ে কেনা | ইমাম আবু হানিফার মত: হারাম অনুপাতে হারাম; সাহেবাইনের মত: হালাল, তবে হারাম অংশ সদকা ওয়াজিব |
মূল কথা: বাবার সুদ গ্রহণ ও ব্যবহারের কারণে তাঁর সমস্ত সম্পদ মেয়ের জন্য হারাম হয়ে যায় না; শুধু সুদের টাকা ও তা দিয়ে কেনা জিনিসের হুকুম আলাদা। তবে সুদ পরিত্যাগ করা ও হারাম অংশ সদকা করা অবশ্যই কর্তব্য।
রেফারেন্স:
- আল-কুরআন: সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫-২৭৯
- সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮
- রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদিন, খণ্ড ৫, পৃ. ২৪৭
- আল-হিদায়া, কিতাবুল বুয়ু
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩০-৩৩২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮৯
- বাহিশতী জেওর, সুদ অধ্যায়
- মাআরিফুল কুরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫-এর তাফসির
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।