নামাজে সূরা আছরে ভুল পড়ার বিধান কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১) নামাজে সুরা আছর এ আমি একটু ভুল পড়ে আসছি। সুরা আছর এ "হাক্কি" এর জায়গায় হাক্ক পড়েছি। শেষে ক্বফ এ যবর পড়েছি। আজ খেয়াল করলাম। এখন আমার আগের যতগুলো নামাজে এ সুরা পড়েছি সেসব নামাজ কি সহীহ হবে??
২) নামাজে তাশাহুদ, দুরুদ শরীফ, দোয়া কুনুত এ কি ওয়াক্বফের রুলস মেনে পড়তে হবে??
৩) ২ সিজদাহর মধ্যবর্তী দোয়া টা অর্ধেক এর মত পড়ে মনে মনে এ চিন্তা চলে আসে আমি এ দোয়া টা মানিনা তারপর ২য় সিজদা দিয়ে ফেলি। এখন চিন্তা হচ্ছে। আমার ইমানে কোনো সমস্যা হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১) সূরা আছরে যদি "حَقِّ" এর স্থানে "حَقَّ" পড়ে থাকেন, অর্থের মধ্যে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি; তাই পূর্বের নামাজগুলো ইনশাআল্লাহ সহীহ হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন। আর "ق" এর উপর যবর পড়া—যদি ভুলে হয়, তাহলে সিজদা সাহু ওয়াজিব হবে; আর যদি ইচ্ছাকৃত হয়, তাহলে নামাজ মাকরূহ তাহরীমী হবে। তবে সিজদা সাহু ছাড়া নামাজ বাতিল হবে না, যদি না অর্থ সম্পূর্ণ বিকৃত হয়।
২) তাশাহহুদ, দুরূদ, দোয়া কুনূতে ওয়াকফের নিয়ম মানা জরুরি নয়; বরং স্বাভাবিকভাবে পড়াই যথেষ্ট। তবে অর্থ বিকৃত হওয়ার মতো ভুল করা যাবে না।
৩) ২ সিজদার মধ্যবর্তী দোয়াটি অর্ধেক পড়ে মনে মনে "আমি এ দোয়া মানি না" এমন চিন্তা আসা—এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এতে ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে এ ধরনের চিন্তা এলে আউযুবিল্লাহ পড়ে মনোযোগ নামাজে ফিরিয়ে আনুন এবং দোয়াটি পূর্ণভাবে পড়ার চেষ্টা করুন।
১) সূরা আছরের ভুল প্রসঙ্গে:
সূরা আছর হলো:
وَالْعَصْرِ ﴿١﴾ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ ﴿٢﴾ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ﴿٣﴾
এখানে "بِالْحَقِّ" শব্দে "حَقِّ" এর উপর কসরা (যের) আছে। আপনি যদি "حَقَّ" (যবর দিয়ে) পড়েন, তাহলে অর্থ হয় "সত্যকে" এর পরিবর্তে "সত্য" বা "হক" —অর্থের মূল বিষয়বস্তু একই থাকে। ফকীহগণের মতে, কুরআন পাঠে যদি অর্থ সম্পূর্ণ বিকৃত না হয় এবং শব্দের মূল গঠন অটুট থাকে, তাহলে নামাজ বাতিল হয় না।
২) তাশাহহুদ, দুরূদ, দোয়া কুনূতে ওয়াকফের নিয়ম:
তাশাহহুদ, দুরূদ শরীফ, দোয়া কুনূতে ওয়াকফের নিয়ম মানা জরুরি নয়। এগুলো দোয়া ও যিকিরের অন্তর্ভুক্ত; এগুলোতে তিলাওয়াতের মতো তাজবীদের বিধান প্রযোজ্য নয়। স্বাভাবিকভাবে পড়াই যথেষ্ট।
তবে শর্ত হলো: অর্থ বিকৃত হওয়ার মতো ভুল করা যাবে না। যেমন—কোনো শব্দের হরকত এতটা পরিবর্তন করা যাবে না যে অর্থই বদলে যায়।
দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَسْتَجِيبُ لِدُعَاءٍ مِنْ قَلْبٍ غَافِلٍ لَاهٍ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা এমন দোয়া কবুল করেন না যা উদাসীন ও অমনোযোগী হৃদয় থেকে আসে।" (সুনানে তিরমিযী: ৩৪৭৯)
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬৬
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২১
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৫
৩) ২ সিজদার মধ্যবর্তী দোয়া অর্ধেক পড়া ও মনে চিন্তা আসা:
২ সিজদার মধ্যবর্তী দোয়াটি হলো:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
অথবা
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
এটি সুন্নত। এটি অর্ধেক পড়া বা মনে মনে "আমি এ দোয়া মানি না" এমন চিন্তা আসা—এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এতে ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না, ইনশাআল্লাহ।
দলিল:
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
"আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (সূরা আরাফ: ২০০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَ ذَلِكَ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ
"নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে: কে সৃষ্টি করেছে এই? কে সৃষ্টি করেছে এই? এমনকি বলে: তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং বিরত হয়।" (সহীহ বুখারী: ৩২৭৬, সহীহ মুসলিম: ১৩৪)
আপনার করণীয়:
১. এ ধরনের চিন্তা এলে সাথে সাথে আউযুবিল্লাহ পড়ুন। ২. মনে রাখবেন, এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা; আপনার ঈমান সহীহ আছে। ৩. দোয়াটি পূর্ণভাবে পড়ার চেষ্টা করুন; অর্ধেক পড়ে ছেড়ে দেবেন না। ৪. নামাজে মনোযোগ বাড়ানোর জন্য আগে থেকে দোয়াটি মুখস্থ করে নিন। ৫. যদি বারবার এমন চিন্তা আসে, তাহলে নামাজের পর "আউযুবিল্লাহ" পড়ে শয়তান থেকে আশ্রয় চান এবং আল্লাহর কাছে মনোযোগের তাওফিক চান।
والله أعلم بالصواب