কসম ভঙ্গের কাফফারার ৩টি রোজা কি ধারাবাহিক রাখা জরুরী?
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের উত্তর:
কসম ভঙ্গের কাফফারার (শপথ ভঙ্গের প্রায়শ্চিত্ত) তিনটি রোজা ধারাবাহিকভাবে (পেছনে পেছনে) রাখা জরুরী। ছেড়ে ছেড়ে রাখা জায়েয নেই। তবে যদি কোনো ওজর (যেমন: অসুস্থতা, হায়েজ/নিফাস) থাকে, তাহলে ছেড়ে ছেড়ে রাখা যাবে, কিন্তু পরে সেই ছুটে যাওয়া রোজাগুলো ধারাবাহিকভাবে পূরণ করতে হবে।
দলিল ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১. কুরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ "যে ব্যক্তি (দাস মুক্ত করতে বা খাদ্য খাওয়াতে) সামর্থ্য পাবে না, সে তিন দিন রোজা রাখবে।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮৯)
এই আয়াতে "ثلاثة أيام" (তিন দিন) শব্দটি এসেছে। হানাফী মাযহাবের ইমামগণ এবং সাহাবায়ে কিরামের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) অনেকের মতে, এখানে ধারাবাহিকতা (তাতাবী') শর্ত। কারণ, কুরআনে অন্য স্থানে (সূরা বাকারা: ১৮৪) সাধারণ রোজার কথা বলতে "أياما معدودات" (গণনাযুক্ত কয়েকটি দিন) বলা হয়েছে, কিন্তু কাফফারার রোজার ক্ষেত্রে "ثلاثة أيام" বলা হয়েছে, যা ধারাবাহিকতার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে।
২. হাদীসের দলিল: হযরত উকবা ইবনে আমির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
صيام ثلاثة أيام متتابعات في كفارة اليمين "কসমের কাফফারার তিনটি রোজা ধারাবাহিকভাবে রাখতে হবে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৩০৯; দারাকুতনী)
এই হাদীসটি সরাসরি ধারাবাহিকতার শর্ত প্রমাণ করে।
৩. হানাফী ফিকহের গ্রন্থসমূহের বক্তব্য:
-
আল-হিদায়াহ: ইমাম আল-মারগীনানী (রহ.) বলেন:
ومن نذر صياما متتابعا فجامعة في أثناء يومه فعليه قضاء ذلك اليوم ولا يبني عليه، وكذا لو أفطر لعذر "যে ব্যক্তি ধারাবাহিক রোজার মান্নত করে, অতঃপর দিনের বেলায় সহবাস করলে তার উপর ঐ দিনের কাযা ওয়াজিব হবে এবং এর উপর (পরবর্তী রোজা) বিল্ড করা যাবে না। অনুরূপভাবে ওজরের কারণে ইফতার করলেও (ধারাবাহিকতা ভঙ্গ হবে)।" (আল-হিদায়াহ, কিতাবুস সাওম, ফাসলুন ফিল কাযা)
-
রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী): আল্লামা ইবনে আবিদীন (রহ.) কাফফারার রোজার ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে লিখেছেন:
(قَوْلُهُ مُتَتَابِعَاتٍ) أَيْ لِأَنَّهُ الْمَشْرُوعُ فِي كَفَّارَةِ الْيَمِينِ عِنْدَنَا "ধারাবাহিকভাবে (রোজা রাখা) কারণ আমাদের মতে কসমের কাফফারায় ধারাবাহিকতাই বিধান।" (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল আইমান, বাবুল কাফফারা, ৩/৭৩৫)
-
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): বলা হয়েছে:
ولو صام ثلاثة أيام متفرقة لا يجوز عندنا "যদি কেউ তিনটি রোজা ছেড়ে ছেড়ে রাখে, তবে তা আমাদের (হানাফী) মতে জায়েয হবে না।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, কিতাবুস সাওম, ১/২০৭)
-
ফাতাওয়া উসমানী: মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, কসমের কাফফারার রোজা ধারাবাহিক রাখা ওয়াজিব। যদি কোনো ওজর ছাড়া ছেড়ে ছেড়ে রাখে, তবে তা আদায় হবে না এবং পুনরায় ধারাবাহিকভাবে রাখতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৮৫)
৪. ব্যতিক্রম (ওজর): যদি কেউ রোজা রাখা শুরু করে এবং এর মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে, অথবা মহিলাদের হায়েজ/নিফাস শুরু হয়, তাহলে ধারাবাহিকতা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে এই ওজর দূর হওয়ার পর আবার নতুন করে ধারাবাহিকভাবে তিনটি রোজা রাখতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/৯৮)
সারকথা: কসম ভঙ্গের কাফফারার তিনটি রোজা ধারাবাহিকভাবে (একটির পর একটি) রাখা ফরজ/ওয়াজিব। ছেড়ে ছেড়ে রাখলে কাফফারা আদায় হবে না। অসুস্থতা বা বৈধ শরয়ী ওজর থাকলে ধারাবাহিকতা ভঙ্গ হবে, তবে পরে নতুন করে অবশিষ্ট রোযার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে পূরণ করতে হবে।