২ লক্ষ টাকা মোহরানা ধার্য করে তা পরিশোধ না করার বিধান।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4113
Questioner: Akhi Akter
Question Asked: 18 Aug 2026, 07:37 AM
Reviewed & Published: 18 Aug 2026, 09:17 AM
Views: 29
Tokens: 7,909
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ। আমার বিয়ে হয়েছে ২ বছর হয়। বিয়েতে আমার মোহরানা ছিল ২ লক্ষ টাকা। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বলেছে স্বর্ণ দিয়ে পরিশোধ করে দিবে এবং বিয়ের দিন তারা একটা চেইন ও এক জোড়া কানের দুল দিয়ে বলেছিল এটাই মোহরানা। এর পর আমাদের পক্ষ থেকে আর সেই স্বর্ণের পরিমাণ পরীক্ষা করেও দেখা হয় নাই। এই বিষয়ে আর কোনো কথাও হয় নাই। তো যেই কানের দুল দিয়েছিল সেটা শুধু বিয়ের দিন পরতে দিয়েছে তারপর আমার শাশুড়ী তুলে রেখেছে। এই ২ বছরে সেই দুল আমি চোখেও দেখি নাই। আমি তার কাছে কখনো পরার জন্য চাইও নাই। কিন্তু কিছুদিন আগে আমার ভাইয়ের বিয়েতে পরার জন্য আমার শাশুড়ীকে কানের দুল আর চেইন দেওয়ার কথা বললে সে শুধু চেইনটা দেয়, আর বলে কানের দুল দূরে হেফাজতে রাখছে তার কাছে নেই। তারপর এই বিষয়ে আমার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করি কানের দুল কোথায় রাখছে সে জানে কিনা, সে জানেনা বলে এবং আমার সাথে অনেক রাগারাগি করে। এবং এই কথা তার মাকে বলে। পরে তার মা বিষয়টা জানতে চাইলে আমি কানের দুলের কথা বলি তখন উনি বলে এই দুল নাকি উনার, এটা আমাকে মোহরানা হিসেবে দেওয়া হয় নাই, এমনি বিয়ের দিন পরিয়ে মানুষকে দেখাইছে। বিয়েতে যে কসমেটিকস দিয়েছে সেগুলো, চেইন, আর এনগেজমেন্টে যে আংটি দিয়েছে এগুলোই নাকি মোহরানা। এই বলে আমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছে। এটাও বলে আমি নাকি আমার স্বামীর সাথে থাকতে চাই না তাই মোহরানার হিসাব চাচ্ছি! স্বামী থাকতে আবার মোহরানা কি! অথচ বিয়েতে তারা মোহরানা পরিশোধ লিখেছে কিন্তু এখন অস্বীকার করছে। আমার স্বামী একজন হাফেজ আলেম কিন্তু তারপরও সে সবসময় তার মায়ের কথায় আমার সাথে খারাপ আচরণ করে। কোনো বিষয় নিয়ে তার সাথে কথা কাটাকাটি হলেও তার মাকে সব বলে দেয়। উনার মায়ের সব অন্যায় মেনে নেয়। বর্তমানে আমি প্রেগন্যান্ট, এই অবস্থায়ও তারা আমাকে ছাড় দেয় নাই। আমার শাশুড়ী কিছু হলেই বলে আমার বাবার বাড়ি থেকে কি দিছে! কিছু দেয় না কেনো। অথচ আমার বাবার সামর্থ্য অনুযায়ী অনেক কিছু দেয়। এখন আমি কি করবো? আর এই মোহরানার মাসআলা কি?

Answer

মোহরানা সংক্রান্ত মাসআলা ও আপনার করণীয়

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নের বিবরন মতে আপনার মোহরানা আদায় হয়নি।

প্রিয় বোন, আপনার সমস্যা ও কষ্টের কথা জানতে পেরে আমরা সত্যিই দুঃখিত। আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা মোহরানার মাসআলা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।

মোহরানার সংজ্ঞা ও গুরুত্ব

মোহরানা (দেনমোহর) ইসলামী বিবাহের একটি অপরিহার্য অংশ। এটি স্ত্রীর অধিকার, যা স্বামী তাকে প্রদান করতে বাধ্য। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

"আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহরানা সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান কর।" (সূরা আন-নিসা: ৪)

মোহরানা স্ত্রীর সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সম্পদ। এটি স্ত্রীর একান্ত অধিকার, যা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না।

মোহরানা নির্ধারণ ও পরিশোধের বিধান

১. মোহরানা নির্ধারণ: বিবাহের সময় যে পরিমাণ মোহরানা নির্ধারিত হয়, তা স্ত্রীর জন্য অবশ্যই প্রদেয় (ওয়াজিব) হয়ে যায়। আপনার ক্ষেত্রে মোহরানা নির্ধারিত হয়েছে ২ লক্ষ টাকা।

২. মোহরানা পরিশোধ: মোহরানা পরিশোধ করা স্বামীর উপর ফরজ। যদি নির্ধারিত মোহরানা নগদ টাকা হয়, তবে তা অবশ্যই নগদে পরিশোধ করতে হবে। স্বর্ণ বা অন্যান্য বস্তু দ্বারা পরিশোধ করতে চাইলে স্ত্রীর সম্মতি প্রয়োজন।

আপনার প্রশ্নের উত্তর

১. কানের দুল ও চেইন কি মোহরানা হিসেবে গণ্য হবে?

বিয়ের দিন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যদি বলে থাকে যে, "এটাই মোহরানা" এবং সেই হিসেবে কানের দুল ও চেইন প্রদান করে, তবে তা মোহরানা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু এখন তারা যদি অস্বীকার করে এবং বলে যে, এটি মোহরানা নয়, তবে তাদের কথা প্রমাণ করতে হবে।

২. মোহরানা অস্বীকার করলে কী করণীয়?

মোহরানা অস্বীকার করা সম্পূর্ণ অন্যায় ও গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।" (মুসলিম)

যেহেতু বিবাহের সময় মোহরানা পরিশোধ লেখা হয়েছে, সেহেতু তারা তা অস্বীকার করতে পারে না। যদি তারা অস্বীকার করে, তবে আপনার পক্ষ থেকে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

৩. মোহরানার পরিমাণ:

  • যদি মোহরানা ২ লক্ষ টাকা নির্ধারিত হয় এবং তারা স্বর্ণ দিয়ে পরিশোধের কথা বলে, তবে সেই স্বর্ণের মূল্য কমপক্ষে ২ লক্ষ টাকা হতে হবে।
  • যদি তারা কানের দুল ও চেইনকে মোহরানা হিসেবে দাবি করে, তবে সেগুলোর মূল্য ২ লক্ষ টাকা হতে হবে। যদি মূল্য কম হয়, তবে বাকি টাকা পরিশোধ করতে হবে।

৪. মোহরানা দাবি করা কি বৈধ?

স্বামী থাকা অবস্থায় মোহরানা দাবি করা সম্পূর্ণ বৈধ। মোহরানা স্ত্রীর অধিকার, যা সে যেকোনো সময় দাবি করতে পারে। এটি দাবি করাকে "স্বামীর সাথে থাকতে না চাওয়া" হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এটি একটি বৈধ ইসলামী অধিকার।

আপনার করণীয়

১. ধৈর্য ধারণ করুন: আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। কুরআনে বলা হয়েছে:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)

২. মোহরানার দাবি করুন: আপনি আপনার মোহরানার সম্পূর্ণ অধিকার রাখেন। এটি দাবি করা আপনার বৈধ অধিকার। আপনি আপনার স্বামীর কাছে মোহরানা দাবি করতে পারেন।

৩. প্রমাণ সংগ্রহ করুন: বিবাহের সময় মোহরানা পরিশোধ লেখা হয়েছে বলে আপনি উল্লেখ করেছেন। সেই কাগজপত্র বা দলিল সংরক্ষণ করুন। প্রয়োজনে সাক্ষী উপস্থাপন করুন।

৪. মীমাংসার চেষ্টা করুন: পরিবারের সিনিয়র সদস্য বা এলাকার ইমাম/মুফতির মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করুন।

৫. ইসলামী আদালতে যেতে পারেন: যদি তারা মোহরানা দিতে অস্বীকার করে, তবে আপনি ইসলামী আদালত বা সালিশি কমিটির কাছে যেতে পারেন।

স্বামীর দায়িত্ব

আপনার স্বামী একজন হাফেজ আলেম। তার উচিত ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী আপনার মোহরানা পরিশোধ করা এবং তার মায়ের অন্যায় আচরণ থেকে আপনাকে রক্ষা করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি)

গর্ভাবস্থায় আচরণ

আপনি বর্তমানে গর্ভবতী। এই অবস্থায় আপনার প্রতি সদয় আচরণ করা তাদের কর্তব্য। গর্ভবতী স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করা ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

ফতোয়া

মোহরানার মাসআলা: আপনার মোহরানা ২ লক্ষ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এটি আপনার প্রাপ্য। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যদি স্বর্ণ দিয়ে পরিশোধের কথা বলে থাকে, তবে সেই স্বর্ণের মূল্য ২ লক্ষ টাকা হতে হবে। যদি তারা কানের দুল ও চেইনকে মোহরানা হিসেবে দাবি করে, তবে সেগুলোর মূল্য ২ লক্ষ টাকা হতে হবে। যদি মূল্য কম হয়, তবে বাকি টাকা পরিশোধ করতে হবে। তারা যদি মোহরানা দিতে অস্বীকার করে, তবে এটি সম্পূর্ণ অন্যায় ও গুনাহের কাজ। আপনি মোহরানা দাবি করতে পারেন এবং প্রয়োজনে ইসলামী আদালতের সাহায্য নিতে পারেন।

আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্য ও সাহস বৃদ্ধি করুন এবং আপনার সমস্যার সমাধান করুন। আমিন।

রেফারেন্স:

  • সূরা আন-নিসা: ৪
  • সূরা আল-বাকারা: ১৫৩
  • সহিহ মুসলিম
  • সুনানে তিরমিজি
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.