কেনায়া বাক্য ও নিয়তের আলোকে তালাক সংক্রান্ত বিস্তারিত হানাফী ফতোয়া।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4065
Questioner: Ibrahim
Question Asked: 17 Aug 2026, 12:47 PM
Reviewed & Published: 17 Aug 2026, 03:08 PM
Views: 18
Tokens: 9,418
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।

হুজুর আমার জানার বিষয় হলো,

বিবাহিতদের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া ঝাটির সময় স্‌বামী মেসেজে কেনায়া বাক্য বলে ফেলছে।

এখন কথা হলো,বাক্যটি লেখার সময় তার মনে এই কথা আসছিল,"এই বাক্য বলার কারণে বিচ্ছেদ হবে"(এখানে কোন সংখ্যার কথা নাই শুধু বিচ্ছেদ এর কথা আছে এবং বাক্যটি ভবিষ্যত মূলক) এমন বাক্য বার বার যদি মনে আসতে থাকে(কিন্তু কয়বার এসেছে ব্যাপারটা কিছুতেই হিসাব করতে পারছে না কিন্তু বার বার এসেছে এটা নিশ্চিত)

১.
এমন বারবার আসার সময়েই কেনায়া বাক্য শুধু একবার বলে ফেললে আসলে কত সংখ্যক এবং কি রকম বিচ্ছেদ কার্যকর হবে?আদৌ কি বিচ্ছেদ কার্যকর হয়েছিল?


২.
আর আরেকটা প্রশ্ন এই উপরের প্রশ্নের আলোকে মনে আসা এই কথা গুলো কি আসলেই ব্যক্তির নিয়ত হিসাবে গন্য হবে নাকি ওয়াসওয়াসা হিসাবে গন্য হবে?

৩.
আর এক্ষেত্রে হুকুম কি হবে?
ওই স্ত্রীকে নিয়ে কি সংসার করা যাবে?

কেনায়া বাক্যটা এমন ছিল"অন্য কোন ছেলে দেখো।"এটা কি কেনায়া বাক্য?

নিয়তটি বারবার আসছিল এবং নিয়তে শুধু বিচ্ছেদ এর কথা ছিল....!!

৪.
লেখা শুরু করার আগে থেকেই কথাটা বার বার মাথায় আসছিল.....!!!যতদূর মনে করতে পারতেছিল ওই বাক্যে কোন সংখ্যার কথা ছিল না শুধু বিচ্ছেদের কথা ছিল,আর বিচ্ছেদ হবে এরকম ভবিষ্যতবাচক কথা আসছিল।
এবং বার বার এই একই কথা মাথায় আসছিল,এটা সেই ব্যক্তি নিশ্চিত।কিন্তু এই কথা কয়বার মোট মনে এসেছে সেইটা হিসাব করতে পারছে না তবে বার বার এসেছে মনে এই কথাটা এটা নিশ্চিত।
কিন্তু বাক্যটি একবার বলে ফেলছে।
এখন ব্যক্তির সন্দেহ হচ্ছে বার বার এই কথা মাথায় আসার কারণে এবং এমন সময় বাক্যটা একবার শুধু বলার কারণে কি আদৌ কোন বিচ্ছেদ কার্যকর হয়েছে?বা হলেও কি রকম আর কত সংখ্যক?
এর জন্য শরীয়তের হুকুম কি?ওই স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করতে পারবে কি?

৫.
আমার প্রশ্ন হলো,সংখ্যা ছাড়া বিচ্ছেদের নিয়ত বার বার আসলে আর সেই সময় কেনায়া বাক্য একবার বলে ফেললে কি বার বার নিয়ত আসার কারণে একের অধিক বিচ্ছেদ সংঘটিত হবে?

৫.
প্রাপ্তবয়স্ক দুইজন সাক্ষীদের সামনে মেয়েকে কোথাও সাইন করতে বলা(এখানে আসো,সাইন করো) এমন কথা কি ইজাব কবুল এর আওতায় পড়বে?

এই কয়টা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সাহায্য করুন,সব পেরেশানী শেষ হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ।

Answer

কেনায়া ও নিয়ত সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর


ভূমিকা

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আপনার প্রশ্নটি তালাক সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। কেনায়া শব্দে তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিম্নে কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১ম প্রশ্নের উত্তর: কেনায়া বাক্য একবার বললে কতটি তালাক পতিত হবে?

উত্তর: আপনার উল্লেখিত বাক্য "অন্য কোন ছেলে দেখো" একটি কেনায়া শব্দ। কেনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত।

হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহরদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:

"কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। নিয়ত ব্যতীত কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না। আর নিয়ত করলে একটি তালাকে বায়িন (অপূর্ণ তালাক) পতিত হয়, যতক্ষণ না সংখ্যার নিয়ত করা হয়।"

(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯০; আল-হিদায়াহ, ২/৩৮০)

আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি একবারই বাক্যটি বলেছেন এবং নিয়তে শুধু "বিচ্ছেদ" ছিল, সংখ্যার নিয়ত ছিল না, তাই একটি তালাকে বায়িন পতিত হয়েছে। এর অর্থ হলো:

  • স্ত্রী আপনার জন্য হারাম হয়ে গেছেন
  • তবে তালাকে বায়িন হওয়ায় নতুন করে নিকাহ (মহরসহ) করলে পুনরায় সংসার করা যাবে
  • তিন তালাক পতিত হয়নি, তাই হালালা প্রয়োজন নেই

২য় প্রশ্নের উত্তর: বারবার মনে আসা কথা কি নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে নাকি ওয়াসওয়াসা?

উত্তর: ইসলামী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, মনে মনে আসা খেয়াল-খেয়ালি বা ওয়াসওয়াসা নিয়ত হিসেবে গণ্য হয় না।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

"إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ"

"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে মনে যা আসে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা কথা বলে।"

(সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন:

"الْوَسْوَسَةُ لَا تُعْتَبَرُ فِي الطَّلَاقِ"

"তালাকের ক্ষেত্রে ওয়াসওয়াসা গণ্য হয় না।"

(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৫)

আপনার ক্ষেত্রে: বারবার মনে আসা "বিচ্ছেদ হবে" এই চিন্তাটি ওয়াসওয়াসা হিসেবে গণ্য হবে, নিয়ত হিসেবে নয়। কারণ এটি বারবার আসা একটি অবসেসিভ চিন্তা (OCD-এর মতো), যা ব্যক্তির ইচ্ছাধীন নয়। তবে বাক্যটি বলার সময় যদি সেই মুহূর্তে নিয়ত থাকে যে "এই বাক্য দ্বারা তালাক উদ্দেশ্য", তাহলে তা নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে।


৩য় প্রশ্নের উত্তর: এক্ষেত্রে হুকুম কী? স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করা যাবে কি?

উত্তর: যেহেতু কেনায়া বাক্য "অন্য কোন ছেলে দেখো" একবার বলেছেন এবং নিয়তে বিচ্ছেদের কথা ছিল, তাই একটি তালাকে বায়িন পতিত হয়েছে।

ফলাফল:

  1. তালাকে বায়িন হওয়ায় স্ত্রী আপনার জন্য হারাম হয়ে গেছেন
  2. তবে ইদ্দতের (তিন মাসিক) মধ্যে নতুন নিকাহ করলে পুনরায় সংসার করা যাবে
  3. নতুন নিকাহের জন্য স্ত্রীর সম্মতি এবং নতুন মহর নির্ধারণ প্রয়োজন
  4. দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন:

"কেনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত করলে এক তালাকে বায়িন পতিত হয়। ইদ্দতের মধ্যে নতুন নিকাহ করলে পুনরায় সংসার করা বৈধ।"

(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৫০)

গুরুত্বপূর্ণ: যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে বাক্য বলার সময় নিয়ত ছিল কি না, এবং বারবার ওয়াসওয়াসা আসছিল, তাই ইহতিয়াতের (সতর্কতার) ভিত্তিতে এক তালাকে বায়িন পতিত হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। তবে তিন তালাক পতিত হয়নি।


৪র্থ প্রশ্নের উত্তর: বারবার নিয়ত আসার কারণে কি একাধিক তালাক পতিত হবে?

উত্তর: না, বারবার নিয়ত আসার কারণে একাধিক তালাক পতিত হবে না।

কারণ:

  1. তালাক পতিত হওয়ার জন্য বাক্য উচ্চারণ বা লেখা শর্ত
  2. শুধু মনে মনে নিয়ত করা বা চিন্তা করা দ্বারা তালাক পতিত হয় না
  3. আপনি বাক্যটি একবারই বলেছেন, তাই একটি তালাক পতিত হয়েছে
  4. বারবার মনে আসা চিন্তা ওয়াসওয়াসা হিসেবে গণ্য, যা তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে না

ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর নীতি:

"الطَّلَاقُ لَا يَقَعُ بِالنِّيَّةِ وَحْدَهَا"

"শুধু নিয়তের দ্বারা তালাক পতিত হয় না।"

(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭০)


৫ম প্রশ্নের উত্তর: "এখানে আসো, সাইন করো" বলা কি ইজাব-কবুলের আওতায় পড়বে?

উত্তর: না, "এখানে আসো, সাইন করো" বলা ইজাব-কবুলের আওতায় পড়বে না

কারণ:

  1. ইজাব-কবুলের জন্য বিয়ের প্রস্তাব এবং গ্রহণের স্পষ্ট শব্দ প্রয়োজন
  2. "সাইন করো" বলা কোনো বিবাহের প্রস্তাব নয়
  3. এটি কোনো দলিল বা কাগজে স্বাক্ষর করার নির্দেশ

ফাতাওয়া আলমগীরীতে উল্লেখ আছে:

"لَا يَنْعَقِدُ النِّكَاحُ إِلَّا بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ بِلَفْظٍ يَدُلُّ عَلَى النِّكَاحِ"

"বিবাহ সংঘটিত হয় না, যতক্ষণ না বিবাহের অর্থবোধক শব্দে ইজাব-কবুল হয়।"

(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৮০)


সংক্ষিপ্ত ফতোয়া

| বিষয় | হুকুম | |-------|-------| | কেনায়া বাক্য "অন্য কোন ছেলে দেখো" | কেনায়া শব্দ, নিয়ত সাপেক্ষে তালাক পতিত হয় | | নিয়তে বিচ্ছেদ থাকলে | এক তালাকে বায়িন পতিত | | বারবার মনে আসা চিন্তা | ওয়াসওয়াসা, নিয়ত হিসেবে গণ্য নয় | | বাক্য একবার বলায় | একটি তালাক পতিত, একাধিক নয় | | স্ত্রীর সাথে সংসার | ইদ্দতের মধ্যে নতুন নিকাহ করলে বৈধ | | "সাইন করো" বলা | ইজাব-কবুল নয়, বিবাহ সংঘটিত হয় না |


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার ক্ষেত্রে একটি তালাকে বায়িন পতিত হয়েছে। স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করতে চাইলে ইদ্দতের (তিন মাসিক) মধ্যে নতুন মহর নির্ধারণ করে এবং দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নতুন নিকাহ করতে হবে। তিন তালাক পতিত হয়নি, তাই হালালার প্রয়োজন নেই।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.