একসাথে তিন তালাক দিলে কত তালাক হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যক্তিগত শরয়ি বিষয়ে আপনার পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা চাই। বিষয়টি নিয়ে আমি মানসিকভাবে খুব চিন্তিত, তাই দয়া করে সময় করে আমার ঘটনাটি দেখে সঠিক হুকুমটি জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।
প্রায় পাঁচ বছর আগে আমি আমার স্ত্রীকে কোর্টের মাধ্যমে ডিভোর্স দিই। এবং বাসায় গিয়ে স্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে আমি সরাসরি বলেছিলাম—“আমি তোমাকে তালাক দিলাম, এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।” বাসায় শুধু আমরা দুজনই উপস্থিত ছিলাম আর কেউ ছিলনা, এরপর আমি বাসা ছেড়ে চলে যাই।
এর কিছুদিন পর থেকে তালাকের বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে আমার ও আমার স্ত্রীর মধ্যে মাঝে মাঝে কথা হতে থাকে। এভাবে প্রায় পাঁচ বছর কেটে যায়। এরপর পাঁচ বছর পর আমরা আবার একে অপরকে বিয়ে করি।
এখন আমার প্রশ্ন হলো—আমাদের সেই প্রথম বিচ্ছেদ ও আমি একসঙ্গে তিনবার তালাক বলার কারণে শরিয়ত অনুযায়ী আমাদের প্রথম বিবাহ কি সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল? পাঁচ বছর পর আমরা যে আবার বিয়ে করেছি, সেটি কি শরিয়তসম্মত হয়েছে? নাকি আমাদের বিয়েটি সঠিক হয়নি এবং এ অবস্থায় একসঙ্গে থাকা আমাদের জন্য গুনাহের কারণ হচ্ছে?
আর যদি আগের তালাকের কারণে পুনরায় বিয়ের কোনো শরয়ি বাধা থেকে থাকে, তাহলে বর্তমানে আমাদের কী করণীয়?
হুজুর, আমি অনুরোধ করছি—আমার কথাগুলোকে ভুলভাবে না নিয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন। প্রয়োজনে কী কী তথ্য জানা দরকার, সেটিও জানাবেন। আমি আল্লাহর কাছে সঠিকভাবে ফিরে আসতে চাই এবং কোনো হারাম বা ভুল অবস্থায় থাকতে চাই না।
আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার ঘটনা শুনে আমি বুঝতে পারছি আপনি আন্তরিকভাবে সঠিক সমাধান জানতে চান। আসুন, আমরা কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
প্রথম অংশ: একসাথে তিন তালাকের হুকুম
আপনি আপনার স্ত্রীকে একসাথে "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক" বলেছেন। হানাফি মাযহাবের নিম্নোক্ত মত অনুযায়ী:
একসাথে তিন তালাক দিলে তা তিন তালাকই গণনা হয় এবং তা পূর্ণ হয়। এর ফলে স্ত্রী তালাক-ই-বায়িন (অপূর্ণ ও চূড়ান্ত) হয়ে যায়। অর্থাৎ:
- তালাক-ই-বায়িন হওয়ার কারণে সাথে সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
- এই তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে যায়।
- এই অবস্থায় পুনরায় বিবাহ করতে হলে হালালা (স্ত্রীর অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ ও সেই বিবাহের পর তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যমে ইদ্দত পূরণ) ছাড়া সম্ভব নয়।
দলিল:
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ "তালাক দুইবার। এরপর হয় ভালোভাবে রাখা অথবা সৌজন্যের সাথে ছেড়ে দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
এরপর আল্লাহ বলেন:
فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ "অতঃপর যদি সে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিবাহ করে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)
হাদিস:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ "তিনটি বিষয় যা গুরুত্ব সহকারে করলে তা কার্যকর হয় এবং ঠাট্টা করে করলেও তা কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক এবং রজ'আত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (আবু দাউদ: ২১৯৪, তিরমিজি: ১১৮৪, ইবনে মাজাহ: ২০৩৯)
হানাফি ফিকহের মত:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, একসাথে তিন তালাক দিলে তা তিন তালাকই গণনা হয় এবং তা পূর্ণ ও কার্যকর হয়। (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/১০০; আল-হিদায়া, ২/৮০)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
وَلَوْ قَالَ: أَنْتِ طَالِقٌ ثَلَاثًا، وَقَعَ الثَّلَاثُ فِي الْحَالِ "যদি কেউ বলে: তুমি তিন তালাক, তবে সাথে সাথে তিন তালাকই পতিত হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮৫)
আপনার ঘটনার প্রেক্ষিতে হুকুম:
আপনি একসাথে তিন তালাক বলেছেন। তাই হানাফি মাযহাব অনুযায়ী:
- আপনার প্রথম বিবাহ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল।
- আপনার স্ত্রী তালাক-ই-বায়িন হয়ে গিয়েছিলেন।
- এই তালাকের পর আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসাথে থাকতে পারতেন না।
- পাঁচ বছর পর আপনারা যে পুনরায় বিবাহ করেছেন, তা শরিয়তসম্মত নয়, কারণ হালালা (স্ত্রীর অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ ও সেই বিবাহের পর তালাক বা মৃত্যুর মাধ্যমে ইদ্দত পূরণ) ছাড়া পুনরায় বিবাহ বৈধ নয়।
বর্তমানে আপনার করণীয়:
যেহেতু আপনারা হালালা ছাড়া পুনরায় বিবাহ করেছেন, তাই এই বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে। আপনাদের জন্য একসাথে থাকা হারাম এবং গুনাহের কাজ।
করণীয়:
- অবিলম্বে আপনাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। অর্থাৎ, আপনারা আলাদা হয়ে যাবেন।
- এই বিবাহ বাতিল হওয়ার কারণে আপনাদের মধ্যে কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক থাকবে না।
- এরপর যদি সত্যিই আপনারা আবার একসাথে থাকতে চান, তাহলে হালালা করতে হবে। অর্থাৎ:
- স্ত্রীকে অন্য একজন মুসলিম পুরুষের সাথে সঠিকভাবে বিবাহ করতে হবে।
- সেই বিবাহের মাধ্যমে তারা সহবাস করবে।
- এরপর সেই স্বামী তালাক দিলে বা মৃত্যুবরণ করলে স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে।
- ইদ্দত শেষ হলে আপনারা পুনরায় বিবাহ করতে পারবেন।
মনে রাখবেন: হালালা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এটি শুধুমাত্র বৈধ উপায়ে সম্পন্ন করতে হবে। কোনো প্রকার প্রতারণা বা চুক্তির মাধ্যমে হালালা করানো হারাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَعَنَ اللَّهُ الْمُحَلِّلَ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ "আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন মুহাল্লিলকে (যে হালালা করে) এবং মুহাল্লাল লাহুকে (যার জন্য হালালা করা হয়)।" (তিরমিজি: ১১২০, ইবনে মাজাহ: ১৯৩৬)
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনি কোর্টের মাধ্যমে ডিভোর্স দিয়েছেন এবং তারপর বাসায় গিয়ে তিন তালাক বলেছেন। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন:
- কোর্টের ডিভোর্স শরিয়তের দৃষ্টিতে তালাক হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে সেই ডিভোর্সের প্রকৃতির উপর। তবে আপনি যেহেতু বাসায় গিয়ে সরাসরি তিন তালাক উচ্চারণ করেছেন, তাই সেই উচ্চারণের মাধ্যমেই তিন তালাক পতিত হয়েছে।
উপসংহার:
- আপনার প্রথম বিবাহ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল।
- পাঁচ বছর পর পুনরায় বিবাহ করা শরিয়তসম্মত হয়নি, কারণ হালালা ছাড়া পুনরায় বিবাহ বৈধ নয়।
- বর্তমানে আপনাদের জন্য একসাথে থাকা হারাম এবং গুনাহের কাজ।
- আপনাদের অবিলম্বে আলাদা হয়ে যেতে হবে।
- পুনরায় একসাথে থাকতে চাইলে হালালার মাধ্যমে বৈধ পথ অবলম্বন করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন এবং আপনার এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সহজ পথ বের করে দিন। আমিন।