ঘুমের আগে কি কি আমল করতে হয়
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
**উত্তর
ঘুমের আমলসমূহ
ইসলামে ঘুমের পূর্বে বেশ কিছু আমল বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে হাদীস ও ফিকহের কিতাবসমূহ থেকে ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. অযু করে ঘুমানো
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তুমি যখন ঘুমাতে যাবে, তখন অযু করে ঘুমাবে, যেমন সালাতের জন্য অযু করো।" (সহীহ বুখারী: ২৪৭)
২. বিছানায় গিয়ে তাসবিহ-তাহলিল পড়া
আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফাতিমা (রা.)-কে বলেছিলেন: "ঘুমানোর সময় ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়বে।" (সহীহ বুখারী: ৩১১৮)
৩. আয়াতুল কুরসি পড়া
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি রাতে ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি পড়বে, তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকবে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারবে না।" (সহীহ বুখারী: ২৩১১)
৪. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত: "রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রত্যেক রাতে ঘুমানোর সময় সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস পড়ে নিজের দুই হাতে ফুঁক দিয়ে শরীরে মাসাহ করতেন।" (সহীহ বুখারী: ৫০১৭)
৫. সূরা কাফিরুন পড়া
ফারওয়া ইবনে নওফাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী ﷺ-এর কাছে এসে বললেন: "হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন কিছু শেখান যা আমি ঘুমানোর সময় পড়ব।" তিনি বললেন: "সূরা কাফিরুন পড়ো, কেননা এটি শিরক থেকে মুক্তি।" (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৫৫, তিরমিযি: ৩৪০০)
৬. অন্যান্য আমল
- ঘুমানোর আগে তওবা করা
- দোয়া পড়া: "বিসমিকা আল্লাহুম্মা আহইয়া ওয়া বিসমিকা আমুতু" (তোমার নামে হে আল্লাহ! আমি জীবিত থাকি এবং তোমার নামেই মৃত্যুবরণ করি)
- ডান কাত হয়ে ঘুমানো
- ঘুমানোর আগে মিসওয়াক করা
সূরা কাফিরুন ৩ বার পড়ার বিষয়ে
হাদীসের আলোকে
সূরা কাফিরুন সম্পর্কে হাদীসে এসেছে:
১. ফারওয়া ইবনে নওফাল (রা.)-এর হাদীস: নবী ﷺ তাকে ঘুমানোর সময় সূরা কাফিরুন পড়তে বলেছেন এবং বলেছেন: "নিশ্চয়ই এটি শিরক থেকে মুক্তি (বারা'আতুন মিনাশ শিরক)।" (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৫৫, তিরমিযি: ৩৪০০)
২. আবু হুরাইরা (রা.)-এর হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "সূরা কাফিরুন এবং সূরা ইখলাস পড়া সকল কাজে তোমাকে যথেষ্ট হবে।" (সহীহ ইবনে হিব্বান)
৩ বার পড়ার বিষয়ে
হাদীসে সূরা কাফিরুন ৩ বার পড়ার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সরাসরি কোনো সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না। তবে কিছু বর্ণনায় সূরা ইখলাস ৩ বার পড়ার কথা এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি সূরা ইখলাস ৩ বার পড়ল, সে যেন সম্পূর্ণ কুরআন পড়ল।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৬১)
সূরা কাফিরুন ৩ বার পড়ার বিষয়ে ইমাম তিরমিযি (রহ.) একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, যেখানে আছে: "যে ব্যক্তি সূরা কাফিরুন পড়ল, সে যেন কুরআনের চতুর্থাংশ পড়ল।" (তিরমিযি: ২৮৯৩)
তবে ৩ বার পড়ার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সহীহ হাদীস না থাকলেও, সাধারণভাবে কুরআনের সূরা পড়ার ফজিলতের কারণে এটি পড়া যেতে পারে।
শিরক থেকে বাঁচার বিষয়ে
সূরা কাফিরুন পড়ার মাধ্যমে শিরক থেকে বাঁচার বিষয়টি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম তিরমিযি (রহ.) হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেছেন: "এই হাদীসের অর্থ হলো, সূরা কাফিরুন পাঠকারী শিরক থেকে মুক্ত থাকবে, কারণ এই সূরায় আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন কাফিরদের ইবাদত থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা দিতে।"
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: "সূরা কাফিরুন পাঠ করা শিরক থেকে বাঁচার অন্যতম মাধ্যম, কারণ এই সূরার মূল বিষয়বস্তুই হলো তাওহীদ ও শিরক থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসীর "মা'আরিফুল কুরআন"-এ বলেছেন: "সূরা কাফিরুনের মূল শিক্ষা হলো, মুমিনের ঈমান ও কাফিরের কুফর কখনো এক হতে পারে না। এই সূরা পাঠের মাধ্যমে মুমিন শিরক ও কুফর থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করে।"
ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে ঘুমের আগে সূরা কাফিরুন পড়া মুস্তাহাব। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য হানাফী ইমামগণ ঘুমের আগে কুরআনের সূরা পাঠকে মুস্তাহাব বলেছেন।
সারসংক্ষেপ
১. ঘুমের আগে অযু করা, ডান কাতে ঘুমানো, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস এবং সূরা কাফিরুন পড়া সুন্নত ও মুস্তাহাব। ২. সূরা কাফিরুন পড়া শিরক থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা এবং এটি শিরক থেকে বাঁচার একটি মাধ্যম। ৩. ৩ বার পড়ার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সহীহ হাদীস না থাকলেও, সাধারণভাবে কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলতের কারণে এটি পড়া যেতে পারে। ৪. শিরক থেকে বাঁচার মূল উপায় হলো তাওহীদের উপর দৃঢ় থাকা, শিরক সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে শিরক থেকে হেফাজত করুন এবং সহীহ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।