মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার ও রাগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইসলামি সমাধান।

Family Life · Hanafi

Question No: 6048
Questioner: Nabila Binte Shorif
Question Asked: 28 Sep 2026, 05:36 AM
Reviewed & Published: 28 Sep 2026, 05:47 AM
Views: 33
Tokens: 3,913
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে মা বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলি
ওনারাও আমায় কষ্ট দিছেন
আমিও ওনাদেরকে
এখন সামনের দিনগুলো চলবো কিভাবে?

Answer

মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার ও পারস্পরিক কষ্ট দেওয়া: করণীয় কী?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী বলছেন—রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তিনি মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেন, তাঁরা তাঁকে কষ্ট দেন, তিনিও তাঁদের কষ্ট দেন। এখন সামনের দিনগুলো কীভাবে চলবেন?


১. মা-বাবার মর্যাদা: কুরআনের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا

"তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' পর্যন্ত বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" — সূরা বনী ইসরাইল: ২৩

وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

"মমতাবশত তাদের প্রতি বিনয়ী হও এবং বলো, 'হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।'" — সূরা বনী ইসরাইল: ২৪

শিক্ষা: মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করা ফরজ পর্যায়ের নির্দেশ। এমনকি তাঁরা অন্যায় করলেও সন্তানের পক্ষ থেকে "উফ" বলা বা ধমক দেওয়া নিষিদ্ধ।


২. হাদিসের আলোকে

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ

"আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" — তিরমিজি: ১৮৯৯; মুসতাদরাক হাকিম: ৭২৪৫

আরও ইরশাদ হয়েছে:

لَا يَجْزِي وَلَدٌ وَالِدًا إِلَّا أَنْ يَجِدَهُ مَمْلُوكًا فَيَشْتَرِيَهُ فَيُعْتِقَهُ

"সন্তান তার পিতার হক আদায় করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে পিতাকে ক্রীতদাস অবস্থায় পেয়ে ক্রয় করে মুক্ত করে দেয়।" — মুসলিম: ১৫১০

অর্থ: মা-বাবার হক এত বিশাল যে সাধারণভাবে তা পুরোপুরি শোধ করা অসম্ভব। কাজেই তাঁদের প্রতি সামান্য অবহেলাও বড় ক্ষতির কারণ।


৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে মা-বাবার হক

(ক) হক আদায় করা ওয়াজিব

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেন—পিতা-মাতার খেদমত, তাঁদের সাথে সদাচরণ ও তাঁদের আনুগত্য (গুনাহের নির্দেশ ছাড়া) ওয়াজিব। তাঁদেরকে কষ্ট দেওয়া কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৭৯-৩৮০)

(খ) তাঁদের অবাধ্যতা কবিরা গুনাহ

ফাতাওয়া আলমগিরি ও বাদায়েউস সানায়ে-তে বর্ণিত—ওয়ালিদাইনকে কষ্ট দেওয়া, গালি দেওয়া বা তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা কবিরা গুনাহ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৪৭)

(গ) রাগ নিয়ন্ত্রণ

রাসূল ﷺ বলেছেন:

لَا تَغْضَبْ "রাগ করো না।" — বুখারি: ৬১১৬

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ করেন—রাগ শয়তানের প্রভাব; রাগের সময় চুপ থাকা, পানি পান করা, দাঁড়ানো অবস্থায় থাকলে বসে পড়া—এসব সুন্নত পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত। (ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪৯২)


৪. এখন সামনের দিনগুলো কীভাবে চলবেন? — বাস্তব করণীয়

ধাপ ১: তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা

  • আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করুন—মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহারের জন্য।
  • সরাসরি মা-বাবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চান, কাঁদুন, তাঁদের পা চুমু খান বা মাথায় হাত বুলিয়ে দিন।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভি (রহ.) বলেন—হক নষ্ট হলে আগে হকদারের কাছে ক্ষমা চাওয়া, তারপর আল্লাহর কাছে তাওবা। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৫৬)

ধাপ ২: রাগ নিয়ন্ত্রণের আমল

| আমল | দলিল | |---|---| | রাগের সময় চুপ থাকা | মুসলিম: ২৯৯১ | | "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়া | বুখারি: ৩২৮২ | | দাঁড়ানো থাকলে বসে পড়া, শুয়ে পড়া | আবু দাউদ: ৪৭৮২ | | ওজু করা | আবু দাউদ: ৪৭৮৪ | | "আল্লাহুম্মাগফিরলি" বেশি পড়া | তিরমিজি: ৩৪৩৫ |

ধাপ ৩: যোগাযোগের নিয়ম তৈরি করুন

  • রাগ উঠলে: সাথে সাথে ওই মজলিস ছেড়ে চলে যান, ওজু করুন, ২ রাকাত নামাজ পড়ুন।
  • কথা বলার সময়: নরম স্বরে, "জি আব্বু", "জি আম্মু" বলে সম্বোধন করুন।
  • ভুল হলে: সাথে সাথে "আমি ভুল করেছি, মাফ করুন" বলুন—অভিমান জমতে দেবেন না।
  • তাঁরা কষ্ট দিলে: চুপ থাকুন, পরে শান্ত অবস্থায় ভদ্রভাবে বুঝান; পাল্টা খারাপ ব্যবহার করবেন না।

ধাপ ৪: দৈনিক আমল

  1. ৫ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায়ের চেষ্টা।
  2. প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তিগফার।
  3. সূরা বনী ইসরাইলের ২৩-২৪ আয়াত নিয়মিত তিলাওয়াত ও আমল।
  4. মা-বাবার জন্য দোয়া: "রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা"।
  5. প্রতিদিন তাঁদের জন্য কিছু ভালো কাজ—চা বানিয়ে দেওয়া, পানি এগিয়ে দেওয়া, মাসাজ করুন।

ধাপ ৫: পারিবারিক পরিবেশ ঠিক করা

  • পরিবারের বড় কেউ থাকলে তাঁকে মধ্যস্থতা করতে বলুন।
  • পারিবারিক বৈঠক করুন—শান্ত পরিবেশে দুঃখ-অভিযোগ খোলাখুলি বলুন, কিন্তু অভিযোগের সুরে নয়, ভালোবাসার সুরে।
  • মা-বাবার কষ্টের কারণ বোঝার চেষ্টা করুন—তাঁরা হয়তো চিন্তা, অসুস্থতা বা আর্থিক চাপে আছেন।
  • নিজের কষ্টের কথা ভদ্রভাবে বলুন—"আম্মু, এভাবে বললে আমার খুব কষ্ট হয়"।

৫. বিশেষ সতর্কতা

وَلَا تَنْهَرْهُمَا — "তাদের ধমক দিও না।" (বনী ইসরাইল: ২৩)

  • মা-বাবা ভুল করলেও তাঁদের প্রতি খারাপ ব্যবহার করা জায়েজ নয়।
  • তাঁরা যদি গুনাহের নির্দেশ দেন, তবে তা মানবেন না—কিন্তু নরমভাবে অস্বীকার করবেন, রুক্ষভাবে নয়।
  • শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন হলে—শরিয়তসম্মত উপায়ে (পরিবারের বড়, সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, প্রয়োজনে আইনগত) সমাধান খুঁজুন; তবে নিজে থেকে খারাপ ব্যবহার করা সমাধান নয়।

৬. উপসংহার

মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করা কবিরা গুনাহ। তাঁরা কষ্ট দিলেও সন্তানের দায়িত্ব ধৈর্য, ক্ষমা ও সদাচরণ। এখন থেকে:

  1. তাওবা করুন ও তাদের কাছে ক্ষমা চান।
  2. রাগ নিয়ন্ত্রণের সুন্নত আমল শুরু করুন।
  3. দৈনিক ছোট ছোট খেদমত দিয়ে সম্পর্ক ঠিক করুন।
  4. দোয়া করুন—আল্লাহ তাঁদের প্রতি দয়া করুন এবং আপনার অন্তর নরম করুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মা-বাবার হক আদায় করার তাওফিক দান করুন এবং পারিবারিক সম্পর্ক সুন্দর করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.