অনলাইনে পণ্য কিনে অন্যদের কাছে বিক্রি করে ৫০ টাকা লাভ করা ইসলামি দৃষ্টিতে জায়েয কি না?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—আপনি যদি অনলাইনে পণ্য কিনে তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেন এবং এর বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ (লাভ) নেন, তাহলে ইসলামি দৃষ্টিতে এটি জায়েয (বৈধ) হবে কি না, তা নির্ভর করবে আপনি কীভাবে এই লেনদেনটি করছেন তার উপর।
১. ইসলামি নীতিমালা:
- ইসলামে ক্রয়-বিক্রয়ের মূলনীতি হলো—পণ্যের মালিকানা অর্জন করে তা বিক্রি করা। আপনি যখন অনলাইনে পণ্য কিনে নিজের মালিকানায় নেন, তারপর তা অন্যকে বিক্রি করেন, তখন এটি একটি বৈধ ব্যবসা। এতে আপনি ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারবেন এবং লাভ হালাল হবে।
- তবে, যদি আপনি অর্ডার (আমানত) হিসেবে কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে শুধুমাত্র পণ্য এনে দেন (যেমন: কুরিয়ার সার্ভিস বা দালাল), তাহলে সেটি উজরত (মজুরি) এর আওতাভুক্ত। এই ক্ষেত্রে আপনি আপনার শ্রম ও সময়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নিতে পারবেন, কিন্তু পণ্যের দামের সাথে অতিরিক্ত লাভ যোগ করা জায়েয নয়, কারণ পণ্যটির মালিকানা আপনার কাছে হস্তান্তরিত হয়নি।
২. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান:
-
আপনি বলেছেন, "আমি অনলাইনে বিভিন্ন জিনিস কিনি, তারপর আমার কেনা দেখে অনেকেই কিনতে চায়, আমাকে অর্ডার দিয়ে দিতে বলে।" অর্থাৎ আপনি নিজে পণ্যটি কিনে থাকেন (মালিকানা অর্জন করেন), তারপর অন্যদের কাছে তা বিক্রি করেন। এটি একটি বৈধ ব্যবসা। এই ক্ষেত্রে আপনি ক্রয়মূল্যের চেয়ে ৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করতে পারবেন এবং এই লাভ আপনার জন্য হালাল।
-
তবে শর্ত হলো, পণ্যটি আপনার কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার পর (অথবা অন্ততপক্ষে আপনি পণ্যটির মালিক হওয়ার পর) আপনি তা বিক্রি করবেন। যদি আপনি অগ্রিম অর্ডার নিয়ে তারপর পণ্য কিনে আনেন, তাহলে সেটি সালাম (অগ্রিম ক্রয়) এর নিয়মে হবে, যা জায়েয, তবে সেক্ষেত্রে পণ্যের বর্ণনা ও মূল্য নির্ধারিত হতে হবে।
-
কেহ কাউকে দাম বলার ক্ষেত্রে আপনি মিথ্যার আশ্রয় নিবেননা। অর্থাৎ ৫০ টাকা বাড়িয়ে এমনটি বলেন বলবেননা যে এতো দামে কিনেছি, বরং বলবেন যে (আমি যে দামই কিনি নি কেনো!) আপনার কাছে বিক্রয় করলে এতো দাম নিবো। তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকবেনা।
৩. হানাফি ফিকহের দলিল:
- কিতাবুল আসল (ইমাম মুহাম্মদ) এবং আল-হিদায়াহ তে বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি কোনো পণ্য ক্রয় করে নিজের দখলে নেয়, তারপর তা বিক্রি করে, সে ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি বা কম যেকোনো মূল্যে বিক্রি করতে পারবে।" (আল-হিদায়াহ, কিতাবুল বয়ু)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ উল্লেখ আছে, "পণ্যের মালিকানা অর্জনের পর তা বিক্রি করা জায়েয, এবং এতে লাভ নেওয়া হালাল।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫০০)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া তে বলা হয়েছে, "যদি কেউ অপরের জন্য পণ্য ক্রয় করে দেয় এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেয়, তবে তা জায়েয, কিন্তু পণ্যের দামের সাথে অতিরিক্ত লাভ যোগ করা জায়েয নয়, যদি না সে নিজে পণ্যটি ক্রয় করে বিক্রি করে।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২০৫)
৪. আপনার জন্য সুপারিশ:
- আপনি যদি পণ্যটি নিজে কিনে (মালিকানা অর্জন করে) তারপর বিক্রি করেন, তাহলে ৫০ টাকা লাভ করা সম্পূর্ণ জায়েয। এটি একটি বৈধ ব্যবসা।
- তবে, যদি আপনি শুধুমাত্র অর্ডার নিয়ে পণ্য এনে দেন (মালিকানা না নিয়ে), তাহলে আপনি শ্রমের বিনিময়ে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক (যেমন: ২০-৫০ টাকা) নিতে পারেন, কিন্তু পণ্যের দামের সাথে অতিরিক্ত লাভ যোগ করা জায়েয হবে না।
- আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু আপনি নিজে পণ্য কিনে থাকেন, তাই আপনি ৫০ টাকা লাভ করতে পারবেন। তবে খেয়াল রাখবেন, পণ্যের মান ও দাম সম্পর্কে ক্রেতাকে সঠিক তথ্য দিন এবং প্রতারণা করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের নয়।" (সহিহ মুসলিম)
সারসংক্ষেপ:
-
আপনি নিজে পণ্য কিনে বিক্রি করলে ৫০ টাকা লাভ হালাল।
-
শুধুমাত্র অর্ডার এনে দিলে (মালিকানা ছাড়া) লাভ নয়, বরং শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিতে পারবেন।
-
আপনার বর্তমান পদ্ধতি (নিজে কিনে বিক্রি) অনুযায়ী লাভ করা জায়েয।
-
কেহ কাউকে দাম বলার ক্ষেত্রে আপনি মিথ্যার আশ্রয় নিবেননা। অর্থাৎ ৫০ টাকা বাড়িয়ে এমনটি বলেন বলবেননা যে এতো দামে কিনেছি, বরং বলবেন যে (আমি যে দামই কিনি নি কেনো!) আপনার কাছে বিক্রয় করলে এতো দাম নিবো। তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকবেনা।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।