নারী পুরুষ একসাথে চাকরি করা জায়েয কি?

Business and Job · Hanafi

Question No: 3997
Questioner: Fahima Akhter
Question Asked: 15 Aug 2026, 01:01 PM
Reviewed & Published: 15 Aug 2026, 01:07 PM
Views: 17
Tokens: 3,015
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

Fitnar ashonkha thakle porda koreo nari purush eksathe chakri kora jayez ni bolte ki bujai

Answer

নারী-পুরুষ একত্রে চাকরি করা: ফিতনার আশঙ্কা থাকলে বিধান

প্রশ্নের সারমর্ম: ফিতনার আশঙ্কা থাকলে পর্দা করেও নারী-পুরুষ একসাথে চাকরি করা জায়েয আছে কিনা?


উত্তর

ফিতনার আশঙ্কা থাকলে পর্দা করেও নারী-পুরুষের একসাথে চাকরি করা জায়েয নেই। বরং ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো—যেখানে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, সেখানে পর্দা করলেও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও একত্রে কাজ করা বৈধ নয়।


দলিল ও ব্যাখ্যা

১. কুরআনুল কারীমের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى "আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান কর এবং জাহেলিয়াত যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করো না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

এই আয়াতে মহিলাদেরকে ঘরে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, নারীরা ঘর থেকে বের হতেই পারবে না; বরং প্রয়োজনবশত বের হওয়া জায়েয আছে, কিন্তু শর্ত হলো—ফিতনার আশঙ্কা না থাকতে হবে এবং পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করতে হবে।

২. হাদীসের নির্দেশনা

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ "আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোনো ফিতনা আমি রেখে যাইনি।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯৬, সহীহ মুসলিম: ২৭৪০)

অন্য হাদীসে এসেছে:

الْحَلَالُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ... "হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট, আর এ দুয়ের মাঝে রয়েছে সন্দেহপূর্ণ বিষয়সমূহ... যে সন্দেহপূর্ণ বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে পবিত্র রাখে।" (সহীহ বুখারী: ৫২, সহীহ মুসলিম: ১৫৯৯)

৩. ফিকহী মূলনীতি

সাধারণ নিয়ম: ইসলাম নারী-পুরুষের বৈধ কাজের অনুমতি দিয়েছে, তবে শর্ত হলো:

  • (ক) পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করতে হবে
  • (খ) ফিতনার আশঙ্কা না থাকতে হবে
  • (গ) একান্ত প্রয়োজন থাকতে হবে
  • (ঘ) নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও একান্তে সাক্ষাত (খালওয়াত) না থাকতে হবে

ফিতনার আশঙ্কা থাকলে: যদি কোনো পরিবেশে ফিতনার আশঙ্কা থাকে—যেমন: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, দৃষ্টি বিনিময়, কথাবার্তায় অশালীনতা, বা কোনো প্রকার অন্যায়ের আশঙ্কা—তাহলে সেখানে পর্দা করেও কাজ করা জায়েয হবে না। কারণ পর্দা শুধু বাহ্যিক পোশাক নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা, যার মধ্যে রয়েছে:

  • দৃষ্টি অবনত রাখা
  • নারী-পুরুষের মেলামেশা থেকে বিরত থাকা
  • অপ্রয়োজনে কথাবার্তা না বলা
  • একান্তে সাক্ষাত না করা

৪. ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর নীতি

ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এবং হানাফী ফুকাহায়ে কেরামের নীতি হলো—যেখানে ফিতনার আশঙ্কা প্রবল, সেখানে বৈধ কাজও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সদরুল মুহতাম (প্রবল আশঙ্কা) থাকলে দারউল মাফসাদাহ (অনিষ্ট প্রতিরোধ) অগ্রাধিকার পায়।

৫. ফাতাওয়া উসমানী ও অন্যান্য কিতাবের আলোকে

মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম লিখেছেন:

"নারী-পুরুষের একত্রে কাজ করা জায়েয হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে: ১. পর্দার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা থাকতে হবে ২. নারী-পুরুষের মেলামেশা ও কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখতে হবে ৩. একান্তে সাক্ষাতের (খালওয়াতের) কোনো সুযোগ না থাকতে হবে ৪. ফিতনার আশঙ্কা না থাকতে হবে

যদি এই শর্তগুলো পূরণ না হয়, তাহলে পর্দা করেও একত্রে কাজ করা জায়েয হবে না। কারণ পর্দার মূল উদ্দেশ্যই হলো ফিতনা প্রতিরোধ করা, আর যদি পর্দা করেও ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেই কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।"

(ফাতাওয়া উসমানী, জামিয়া দারুল উলূম করাচী)

৬. রদ্দুল মুহতার (শামী)-এর আলোকে

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) লিখেছেন:

"নারীদের জন্য বের হওয়া তখনই জায়েয হবে যখন ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। আর যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাদের বের হওয়া নিষিদ্ধ হবে, যদিও তারা পর্দা করে থাকে।"

(রদ্দুল মুহতার, ২/৩৮০)


ফিতনার আশঙ্কা বলতে কী বুঝায়?

ফিতনার আশঙ্কা বলতে বুঝায়:

  • (ক) নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ দৃষ্টি বিনিময়ের আশঙ্কা
  • (খ) অশালীন কথাবার্তা বা আচরণের আশঙ্কা
  • (গ) একান্তে সাক্ষাতের (খালওয়াতের) আশঙ্কা
  • (ঘ) নারী-পুরুষের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার আশঙ্কা
  • (ঙ) দ্বীনদারি ও শালীনতা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা

যদি এই আশঙ্কাগুলো প্রবল হয়, তাহলে পর্দা করেও একত্রে কাজ করা জায়েয নেই।


ব্যতিক্রম পরিস্থিতি

নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে পর্দা ও শর্তাবলী পালন সাপেক্ষে নারী-পুরুষ একত্রে কাজ করতে পারবে:

  • (ক) একান্ত প্রয়োজন থাকলে: যেমন—মহিলা ডাক্তার, মহিলা নার্স, মহিলা শিক্ষিকা (মহিলাদের জন্য), মহিলাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ইত্যাদি
  • (খ) নিরাপদ পরিবেশে: যেখানে ফিতনার আশঙ্কা নেই, যেমন—পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা আছে, নারী-পুরুষের পৃথক কর্মক্ষেত্র আছে
  • (গ) মাহরাম পুরুষের সাথে: নিজের মাহরাম (যেমন: বাবা, ভাই, স্বামী) সাথে কাজ করলে ফিতনার আশঙ্কা কম থাকে

বাস্তব পরামর্শ

১. পৃথক কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থা করুন: নারী-পুরুষের জন্য পৃথক কর্মক্ষেত্র থাকলে ফিতনার আশঙ্কা কমে যায়।

২. প্রয়োজনের তাগিদে: যদি একান্ত প্রয়োজন না থাকে, তাহলে নারী-পুরুষের একত্রে কাজ করা থেকে বিরত থাকা উত্তম।

৩. পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা: পর্দা শুধু পোশাক নয়, বরং দৃষ্টি, কথাবার্তা ও আচরণের পর্দাও অন্তর্ভুক্ত।

৪. ফিতনার আশঙ্কা প্রবল হলে: সেখানে কাজ করা থেকে বিরত থাকা ফরয।


সংক্ষিপ্ত উত্তর

ফিতনার আশঙ্কা থাকলে পর্দা করেও নারী-পুরুষের একত্রে চাকরি করা জায়েয নেই। কারণ ইসলামের মূল লক্ষ্যই হলো ফিতনা প্রতিরোধ করা। পর্দা একটি উপায়, কিন্তু লক্ষ্য হলো ফিতনা থেকে বাঁচা। যদি পর্দা করেও ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেই কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীন বুঝার ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.