পর্দার বিধান মেনে চাকরী করা

Business and Job · Hanafi

Question No: 3994
Questioner: Fahima Akhter
Question Asked: 15 Aug 2026, 12:53 PM
Reviewed & Published: 15 Aug 2026, 01:04 PM
Views: 22
Tokens: 4,531
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি একটি বিষয় নিয়ে খুবই দ্বিধায় আছি। আমাদের নবী ﷺ-এর সময় নারীরা বাজারের তদারকি করতেন, কেনাবেচা করতেন এবং ব্যবসাও করতেন। কিন্তু আমাদের সময়ে কেন নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করতে পারবে না, যদিও কোনো নারী পর্দা মেনে পুরুষের সঙ্গে কাজ করেন?

আমাদের দেশ তো ইসলামিক কান্ট্রি নয়। এখানে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা কাজের ব্যবস্থা খুব একটা নেই। কোনো নারী যদি পর্দা মেনে চলে এবং শুধু প্রয়োজনের সময় পুরুষের সঙ্গে কথা বলে, তাহলেও কি নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করতে পারবে না?

আবার কোনো নারী যদি পর্দা মেনে বালেগ ছেলেদের পড়ান এবং পড়ানোর প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে কি সেটাও জায়েজ হবে না?

Answer

وعلیکم السلام ورحمة اللہ وبرکاتہ

উত্তর

আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। নবী ﷺ-এর যামানায় নারীদের বাজারে কেনাবেচা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের যে দৃষ্টান্ত রয়েছে, তা ছিল নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও সীমার মধ্যে। সেসব ক্ষেত্রে নারীরা পর্দার সম্পূর্ণ বিধান মেনে চলতেন এবং ফিতনার আশঙ্কা থেকে দূরে থাকতেন।

নবী ﷺ-এর যুগে নারীদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম

ইতিহাসে আমরা দেখি, নবী ﷺ-এর যুগে নারীরা ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন। যেমন:

  • হযরত খাদিজা (রা.) ব্যবসা করতেন এবং নবী ﷺ-কে তার ব্যবসার প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন।
  • অন্যান্য সাহাবিয়া (রা.)-ও কেনাবেচা করেছেন।

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাদের কার্যক্রম ছিল পর্দার সীমার মধ্যে এবং ফিতনা থেকে মুক্ত। তারা পুরুষদের সাথে অবাধ মেলামেশা করতেন না।

পর্দার বিধান ও নারী-পুরুষের কাজ

ইসলামে নারী-পুরুষের কাজের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো: ১. পর্দার বিধান বজায় রাখা ২. ফিতনার আশঙ্কা না থাকা ৩. প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা

কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ "হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিন নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى "আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করবে না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)

হাদিসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ "আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা আমি রেখে যাইনি।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯৬)

পর্দা মেনে কাজ করার শর্ত

যদি কোনো নারী পর্দা মেনে চলে এবং শুধু প্রয়োজনের সময় পুরুষের সাথে কথা বলে, তাহলে কিছু শর্ত সাপেক্ষে কাজ করা জায়েজ হতে পারে:

১. পর্দার সম্পূর্ণ বিধান পালন - সতর ঢাকা, শরীরের গঠন প্রকাশ না করা, আকর্ষণীয় পোশাক না পরা ২. কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখা - নরম বা আকর্ষণীয়ভাবে কথা না বলা ৩. প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ - শুধু প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ৪. খালওয়াত (একান্ত নির্জনতা) না হওয়া - কোনো অবস্থায় পুরুষের সাথে একান্তে থাকা যাবে না ৫. ফিতনার আশঙ্কা না থাকা

বালেগ ছেলেদের পড়ানোর বিধান

বালেগ ছেলেদের পড়ানোর ক্ষেত্রে বিধান হলো:

  • যদি ছেলেরা বালেগ হয় এবং ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নারীর জন্য তাদের পড়ানো উচিত নয়
  • তবে যদি ছেলেরা নাবালেগ হয় অথবা ফিতনার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে জায়েজ হতে পারে
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নারীর জন্য অপরিচিত পুরুষের সাথে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট

আপনি বলেছেন আমাদের দেশ ইসলামিক কান্ট্রি নয় এবং নারী-পুরুষের জন্য আলাদা কাজের ব্যবস্থা নেই। এটা সত্য যে, আমাদের সমাজে নারীদের জন্য আলাদা কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা কঠিন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ইসলামের বিধান লঙ্ঘন করা যাবে।

ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:

"নারীদের জন্য পুরুষদের সাথে মিশে কাজ করা জায়েজ নয়, যদিও পর্দা করা হয়। কারণ এতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে। তবে যদি কোনো নারীকে জীবিকার প্রয়োজন হয় এবং অন্য কোনো উপায় না থাকে, তাহলে পর্দার সম্পূর্ণ বিধান মেনে এবং ফিতনা থেকে বেঁচে থেকে প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারবে।"

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:

"নারীর জন্য অপরিচিত পুরুষের সাথে কথা বলা জায়েজ, যদি তা প্রয়োজন হয় এবং কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা জায়েজ নয়।"

ইবনে আবেদিন (রহ.)-এর মত

রদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেছেন:

"যখন নারীর প্রয়োজন হয়, তখন সে পর্দার সাথে বের হতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারবে। কিন্তু যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা জায়েজ নয়।"

আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ একসাথে কাজ করার বিধান

আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ একসাথে কাজ করার ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান হলো:

১. যদি কাজটি এমন হয় যেখানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয় - তাহলে তা জায়েজ নয় ২. যদি কাজটি পর্দার সীমার মধ্যে হয় এবং ফিতনার আশঙ্কা না থাকে - তাহলে জায়েজ হতে পারে ৩. যদি কাজটি এমন হয় যেখানে নারীকে পুরুষের সাথে একান্তে থাকতে হয় - তাহলে তা জায়েজ নয়

বাস্তব সমাধান

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কিছু বাস্তব সমাধান:

১. নারীদের জন্য আলাদা কাজের পরিবেশ তৈরি করা ২. নারীদের জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান বা বিভাগ স্থাপন করা ৩. নারীদের জন্য হোম-ভিত্তিক কাজের ব্যবস্থা করা ৪. প্রয়োজনে পর্দার সাথে কাজ করা, তবে ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা

উপসংহার

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো:

পর্দা মেনে চললেও নারী-পুরুষ একসাথে কাজ করা জায়েজ নয় যদি তাতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে। তবে যদি কোনো নারীকে সত্যিই জীবিকার প্রয়োজন হয় এবং অন্য কোনো উপায় না থাকে, তাহলে পর্দার সম্পূর্ণ বিধান মেনে, ফিতনা থেকে বেঁচে থেকে এবং প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে কাজ করা জায়েজ হতে পারে।

বালেগ ছেলেদের পড়ানোর ক্ষেত্রে, যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা জায়েজ নয়। তবে যদি ছেলেরা নাবালেগ হয় অথবা ফিতনার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে জায়েজ হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.