বিয়ে সম্পর্কে ইস্তিখারাহ করা প্রসঙ্গে
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
ইস্তেখারা, স্বপ্ন ও বিবাহ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: একজন মেডিকেল ছাত্রী ইস্তেখারা করার পর স্বপ্নে তার ব্যাচমেটের সাথে বিয়ে দেখেছেন এবং ৮-৯ দিন পর তার বান্ধবীও একই ছেলের সাথে তার বিয়ের স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি জানতে চান—এটা কি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বার্তা নাকি ওয়াসওয়াসা? তার করণীয় কী?
উত্তর
১. ইস্তেখারার স্বপ্ন সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইস্তেখারার ফলাফল স্বপ্নের মাধ্যমে আসা আবশ্যক নয়। ইস্তেখারা মূলত আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করার একটি দোয়া। এর ফলাফল অনেক সময় অন্তরে কোনো বিষয়ের দিকে (ঝোঁক) সৃষ্টির মাধ্যমে আসে, আবার অনেক সময় পরিস্থিতির পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে। স্বপ্ন দেখা ইস্তেখারার শর্ত নয়।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন: "ইস্তেখারার পর যে স্বপ্ন দেখে, সে স্বপ্নের উপর নির্ভর করবে না; বরং অন্তরে যে দিকে ধাবিত হয় তা দেখবে।" (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৭)
২. স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও গুরুত্ব
আপনার স্বপ্ন এবং আপনার বান্ধবীর স্বপ্নের মিল হওয়াটা মিলে যাওয়াটা কাকতালীয় হতে পারে, আবার এর কোনো তাৎপর্যও থাকতে পারে। তবে ইসলামী দৃষ্টিতে:
-
স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় দেখানো, (৩) মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৪৯৯)
-
যেহেতু আপনি নিজেই বলেছেন যে, আপনি কোনো ছেলেকে পছন্দ করেন না বা চিন্তাও করেন না, তাই আপনার স্বপ্নটি সম্ভবত অবচেতন মনের প্রতিফলন নয়। তবে আপনার বান্ধবীর স্বপ্নের ব্যাপারটি ভিন্ন।
-
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ইসলামী স্কলারগণ বলেন, ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখলে সেটা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা উচিত নয়। বরং ইস্তেখারা করার পর যে বিষয়ে ইস্তেখারা করা হয়েছে, সেটির ভালো-মন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
৩. ওয়াসওয়াসা থেকে সতর্কতা
আপনার মনে যে চিন্তা আসছে—"ও কি আমার জন্য কল্যাণকর?"—এটা মূলত শয়তানের পক্ষ থেকে আসা ওয়াসওয়াসা হতে পারে। কারণ:
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "শয়তান আদম সন্তানের রক্তপ্রবাহের মতো শরীরে প্রবাহিত হয়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩২৮১)
আপনি একজন পবিত্রচিত্তা মুসলিম ছাত্রী যিনি দৃষ্টির হেফাজত করেন। শয়তান চায় আপনাকে এই পবিত্রতা থেকে বিচ্যুত করতে। তাই একজন বেগানা পুরুষের চিন্তা মনে আনা শয়তানের কুমন্ত্রণা—এটা আপনার অন্তরের পবিত্রতার প্রমাণ যে আপনি এটা অনুভব করছেন এবং এটা নিয়ে দুশ্চিন্তিত।
৪. করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা
আপনার জন্য উত্তম পন্থা হলো:
১. ইস্তেখারা চালিয়ে যান তবে স্বপ্নের দিকে নয়, বরং আল্লাহর কাছে উত্তম সিদ্ধান্তের জন্য দোয়া করতে থাকুন।
২. বাসা থেকে আসা নতুন প্রস্তাবটি বিবেচনা করুন—দ্বীন, চরিত্র, শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থান দেখে। ইস্তেখারা করার পর সিদ্ধান্ত নিন।
৩. স্বপ্নকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবেন না। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন: "ইস্তেখারার পর স্বপ্ন দেখা জরুরি নয়; বরং অন্তরে যে ধাবিত হয় তা-ই মূল বিবেচ্য।" (আল-আযকার)
৪. ওয়াসওয়াসা দূর করতে বেশি বেশি "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন এবং আল্লাহর জিকির করুন।
৫. বেগানা পুরুষের চিন্তা মনে এলে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং চিন্তা পরিবর্তনের চেষ্টা করুন।
৫. স্বপ্নের মিলের কারণ
দুইজনের স্বপ্নের মিল হওয়ার পেছনে হয়তো আল্লাহর কোনো হিকমত থাকতে পারে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আপনাকে অবশ্যই সেই ছেলের সাথে বিয়ে করতে হবে। ইসলামে বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রীর দ্বীনদারি, চরিত্র ও সামঞ্জস্যতা প্রধান বিবেচ্য। স্বপ্ন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে শান্তি রয়েছে এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রূম: ২১)
৬. চূড়ান্ত পরামর্শ
১. বাসা থেকে আসা নতুন প্রস্তাবটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করুন। দ্বীনদার, চরিত্রবান ও উপযুক্ত পাত্র হলে ইস্তেখারা করে সিদ্ধান্ত নিন।
২. স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না। এটা আপনার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।
৩. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। তিনি যা কল্যাণকর জানেন, তা-ই ঘটাবেন।
৪. অন্তরকে পবিত্র রাখুন। বেগানা পুরুষের চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। এটা শয়তানের কুমন্ত্রণা মাত্র।
৫. দোয়া করুন: "রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিন ওয়াজ'আলনা লিল-মুত্তাক্বীনা ইমামা" (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)
আল্লাহই উত্তম ফয়সালা দানকারী। আপনার জন্য দোয়া রইল যে, আল্লাহ আপনাকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন এবং আপনার অন্তরকে শান্তি দান করুন। আমীন।