কিছু পারস্পরিক দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কিত
Family Life · Hanafi
Question
আমার সমস্যা আমি বিস্তারিত বলতে পারছি না, এত টুকু জানাই শুধু , আমার বিয়ে হয়েছে বেশি বছর হয় নী। আমার হাজবেন্ড এখনও পড়াশোনা করছে, এবং আমিও। তাই কথা হয়েছিল আমাকে পড়াশোনা করিয়ে চাকরি পাইয়ে দেবে আমার বাড়ি থেকে, ততদিন আমাকে তাড়া নিয়েও যাবে না, কোনো খরচ দিতে পারবে না। এটা উচিত কি অনুচিত সেই বিষয়ে যাচ্ছি না। বিয়ে একটা ভালো কাজ, আর ছেলে ভালো ছিল দেখে এর উপর আর কেউ কিছু বলে নাই।
আমাকে তুলে নেই নী তারা, বরং সব খরচ পাতি আমার বাড়ির দিক থেকে হয়েছে, এমনকি আমার হাজবেন্ড যে কয়দিন আসে মাঝে মাঝে আমাদের এখানেই থাকে।
এবার আমার শাশুড়ি তার বড় ছেলের কাছে চলে গেছে কোনো একটা ওয়েস্টার্ন দেশে। আমার শ্বশুর কে নিয়ে যাবে না, সে একা একা আছে। তার খরচ ও পাঠায় না। এই নিয়ে জন্য ঝামেলা করে ওরা ওদের মধ্যেই।
তাদের পরিবারে আর কোনো ছেলে মেয়ে খোঁজ নেয় না, আমার শ্বশুর এখন একা থাকে। প্রায় ই খবর দেবার আমার মা পাঠায়, ডেকে খাওয়ায়। এরপর ও কথা উঠছে যে আমাকে আমার শ্বশুর বাড়ির গ্রামে যেয়ে আমার শ্বশুর কে রান্না করে খাওয়াতে হবে। যেখানে আমি এখনও পড়াশোনা করি আর অন্য শহরে থাকি, ছুটিতে বাড়ি আসি। আর আমার স্বামীও এখানে থাকে না আমার সাথে।
আমার আপাতত সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন,
১) আমার স্বামী আমাকে বাদ দিয়ে ওর বাবা মা ভাই এসবের ঝামেলায় বেশি সময় দিই, সেই সাথে তার পড়াশোনার চাপ আছে, আমার কোনো অর্থ সাহায্য তো করেই না, কথা বলে না, সময় দেয় না, বলে সে অনেক ব্যস্ত।
আমার প্রতি তার কি এরকম আচরণ স্বাভাবিক? এটা কি মেনে নেয়া উচিত?
২) আমাকে তাদের বাড়ির কেউ কিছু দেয় নাই কখনও, উঠিয়ে নিয়ে যায় নী। এমনকি খোঁজ নেয় না কোনোদিন, উল্টা আমার আর আমার স্বামীর মধ্যে ঝামেলা তৈরি করে যাতে আমাদের ছড়াছড়ি হয়ে যায়। আমার শ্বশুর বাড়ি আমার কোনো ঘর নেই, নিয়ে যেয়ে কোনোদিন রাখে নী।
আমার শাশুড়ি থাকে না, আমার স্বামী থাকে না, আমি নিজেও সেখানে কিছু চিনি না জানি না, গ্রামে কখনও থাকি নী সেভাবে, হঠাৎ করে ওইরকম পরিবেশে ফেলে দিয়ে সেখানে রান্না কাজ করতে হবে আমাকে। এটা করতে কি আমি বাধ্য?
নাহলে কি আমি খুব খারাপ? আমার দায়িত্ব এখানে?
যেখানে আমার খাওয়া পরা সহ পড়াশোনার যাবতীয় খরচ এখনো আমার বাবা মা দেয়। এমনকি আমারও সময় নাই অন্য কোনো কাজ করার।
৩) আমাদের প্রতি কি দায়িত্বটি বর্তায় আমার স্বামী বা শ্বশুরের দেখা শোনা খবর দেবার দেয়ার। এমন না তাদের সব খরচ আমরা দেয়। হ্যাঁ খুব মাঝে মাঝেই হয়তো করি। কিন্তু আমার বাবা মায়ের আর্থিক সামর্থ্য একেবারে ভালো না। শুধু মর্যাদা রক্ষার্থে করে। ঋণের বোঝা অনেক। তবুও এগুলা করতেই হয়।
Answer
পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
উত্তর নং ১:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি, দয়া ও দায়িত্ব পালনের সম্পর্ক। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً "আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।" (সূরা আর-রূম: ২১)
আর আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
আপনার স্বামীর আচরণ সম্পর্কে:
আপনার স্বামী যদি আপনাকে অবহেলা করেন, আপনার সাথে কথা না বলেন, সময় না দেন, আপনার প্রতি দৃষ্টি না দেন — এটি ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের প্রতি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)
তবে এখানে একটি বাস্তবতা মনে রাখা জরুরি: আপনার স্বামী এখন পড়াশোনার চাপে আছেন এবং পারিবারিক সমস্যায় জড়িয়ে আছেন। এটি তার দায়িত্ব পালনে অবহেলার বৈধ কারণ নয়, তবে এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি। আপনার উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং সরাসরি কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করা। রাগ বা অভিমান নয়, বরং হিকমতের সাথে কথা বলুন।
ইসলামি দৃষ্টিতে স্বামীর দায়িত্ব:
- স্ত্রীর ভরণপোষণ (নফকা) প্রদান করা — এটি স্বামীর উপর ওয়াজিব। (সূরা আন-নিসা: ৩৪, সূরা আত-তালাক: ৭)
- স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা
- স্ত্রীর প্রতি সময় দেওয়া ও মনোযোগ দেওয়া
উপদেশ: আপনার স্বামী যদি পড়াশোনার কারণে ব্যস্ত থাকেন, তবে তাকে বুঝিয়ে বলুন যে, আপনি তার সময় ও মনোযোগ চান। তবে আপনার পড়াশোনার খরচ আপনার বাবা-মা দিচ্ছেন — এটি আপনার স্বামীর দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। তবে বর্তমানে সে অক্ষম হলে ধৈর্য ধরুন এবং ভবিষ্যতে তা পূরণের প্রতিশ্রুতি নিন।
উত্তর নং ২:
আপনি শ্বশুরের সেবা করতে বাধ্য নন — এটাই ইসলামের স্পষ্ট বিধান।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, স্ত্রীর উপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ওয়াজিব নয়। স্ত্রীর দায়িত্ব হলো স্বামীর প্রতি, এবং স্বামীর দায়িত্ব হলো তার পিতা-মাতার সেবা করা। শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা স্ত্রীর উপর ফরজ বা ওয়াজিব নয় — এটি ইহসান (সদাচরণ) ও নেকির কাজ, যা করলে সওয়াব আছে, কিন্তু না করলে গুনাহ নেই।
দলিল:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাবে সুস্পষ্ট যে, স্ত্রীর উপর শ্বশুর-শাশুড়ির খিদমত করা ওয়াজিব নয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃ. ৫৬৪)
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
আপনার বর্তমান পরিস্থিতি:
- আপনি এখনও পড়াশোনা করছেন
- আপনি অন্য শহরে থাকেন
- আপনার স্বামীও আপনার সাথে থাকেন না
- আপনার নিজের খরচ আপনার বাবা-মা দিচ্ছেন
- আপনি সেখানে কিছুই চেনেন না
এই অবস্থায় আপনাকে জোর করে শ্বশুরের বাড়িতে পাঠিয়ে রান্না-বান্নার কাজ চাপানো ইসলামি দৃষ্টিতে অন্যায় ও জুলুম। আপনি এতে বাধ্য নন।
তবে হ্যাঁ, শ্বশুরের প্রতি সদাচরণ করা, খোঁজ-খবর নেওয়া, সম্ভব হলে সাহায্য করা — এটি ইহসানের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এটি আপনার উপর জোরপূর্বক চাপানো যাবে না, বিশেষত যখন আপনি নিজেই পড়াশোনার চাপে আছেন এবং আপনার স্বামীও আপনার সাথে নেই।
আপনি খারাপ নন। বরং যে পরিবার আপনাকে জোর করে এমন পরিবেশে ফেলতে চাচ্ছে যেখানে আপনার নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হবে — তাদের এই দাবি ইসলামসম্মত নয়।
আপনার দায়িত্ব এখানে:
- নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া
- স্বামীর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করা
- সম্ভব হলে শ্বশুরের খোঁজ-খবর নেওয়া (ফোনে বা মাঝে মাঝে)
- কিন্তু জোরপূর্বক সেখানে গিয়ে থাকা আপনার দায়িত্ব নয়
উত্তর নং ৩:
দায়িত্ব বণ্টন সম্পর্কে ইসলামি বিধান:
১. স্বামীর দায়িত্ব: নিজের পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও সেবা করা। আল্লাহ বলেন:
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "আর পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করো।" (সূরা আল-ইসরা: ২৩)
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি।" (সূরা আল-আনকাবুত: ৮)
২. স্ত্রীর দায়িত্ব: নিজের পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করা, তবে শ্বশুর-শাশুড়ির ভরণপোষণ স্ত্রীর উপর ওয়াজিব নয়।
৩. আপনার স্বামীর ভাই-বোনদের দায়িত্ব: শ্বশুরের সেবা করা সকল সন্তানের দায়িত্ব। শুধু আপনার স্বামী বা আপনি নন — বরং যারা সন্তান, তাদের সবার দায়িত্ব। বিশেষত যারা বিদেশে আছে এবং খরচ পাঠাচ্ছে না — তাদের এই অবহেলা ইসলামি দৃষ্টিতে গুনাহের কাজ।
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ "তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮)
আপনার করণীয়:
১. আপনার স্বামীর সাথে কথা বলুন: তাকে বুঝান যে, তার বাবার সেবার দায়িত্ব তার ও তার ভাই-বোনদের সবার। শুধু আপনার উপর চাপানো ঠিক নয়।
২. আপনার বাবা-মায়ের উপর বোঝা কমান: আপনার বাবা-মা ঋণ করে আপনার শ্বশুরের খরচ দিচ্ছেন — এটি তাদের দায়িত্ব নয়। এটি বন্ধ করা উচিত। আপনার স্বামী ও তার ভাই-বোনদের এই দায়িত্ব নিতে হবে।
৩. সীমা নির্ধারণ করুন: আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করুন, কিন্তু নিজের ও আপনার বাবা-মায়ের উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপাবেন না।
৪. ধৈর্য ও দুআ: আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ বলেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ "আর ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও।" (সূরা আল-বাকারা: ৪৫)
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. স্বামীর অবহেলা কি স্বাভাবিক? | না, ইসলামে এটি নিন্দনীয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও কথাবার্তার মাধ্যমে সমাধান খুঁজুন। | | ২. শ্বশুরের সেবা করতে বাধ্য কি? | না, ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব নয়। জোরপূর্বক চাপানো জুলুম। | | ৩. দায়িত্ব কার? | শ্বশুরের সেবা তার সকল সন্তানের দায়িত্ব। আপনার বাবা-মায়ের উপর এই বোঝা চাপানো ঠিক নয়। |
পরামর্শ: আপনার স্বামীর সাথে বসে খোলামেলা আলোচনা করুন। তাকে বলুন যে, আপনি তার পাশে আছেন, কিন্তু তাকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। আপনার শ্বশুরের সেবার দায়িত্ব তার ও তার ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ করে নিতে হবে। আর আপনার বাবা-মায়ের উপর ঋণের বোঝা চাপানো থেকে বিরত থাকুন।
আল্লাহ তা'আলা আপনার সমস্যার সহজ সমাধান দান করুন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।