ডলারের বদলে টাকা নেওয়ার ইসলামিক নিয়ম
Business and Job · Hanafi
Question
২। একই জাতীয় বা ভিন্ন জাতীয় পণ্য বাকিতে লেনদেন করা সুদ কিভাবে হচ্ছে? আমি সোনার বদলে একই পরিমাণ সোনা নিবো,কিন্তু পরে নিবো। আবার ধানের বদলে গম দিবো,কিন্তু পরে দিলাম,প্রতারণা ছাড়া ঠিক পরিমাণে৷ এখানে সুদ কিভাবে হচ্ছে বুঝছি না।
Answer
বাইয়ে সরফ (মুদ্রা বিনিময়) ও বাকিতে পণ্য লেনদেনের বিধান
প্রশ্ন ১: ডলারের বিনিময়ে টাকা নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি নেওয়া
উত্তর: বাইয়ে সরফ (মুদ্রা বিনিময়) এর ক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়ম হলো—একই জাতীয় মুদ্রা (যেমন: টাকার বদলে টাকা) বিনিময় করলে সমান সমান এবং নগদ হতে হবে। ভিন্ন জাতীয় মুদ্রা (যেমন: ডলারের বদলে টাকা) বিনিময় করলে পরিমাণে তারতম্য জায়েয, তবে নগদে (হাতে হাতে) হতে হবে। বাকি (উভয় পক্ষ বা এক পক্ষ বিলম্ব) করলে তা সুদ হয়ে যাবে।
আপনার প্রশ্নে ১ ডলারের বাজার মূল্য ১২৩.৪৪ টাকা, কিন্তু আপনি ২০০ টাকা নিতে চান—এটি উচিত নয়। কারণ:
১. ডলার ও টাকা ভিন্ন জাতীয় মুদ্রা হলেও এগুলো উভয়ই পূর্ণ মূল্যবান বস্তু (সামান)। ভিন্ন জাতীয় হওয়ায় পরিমাণে তারতম্য জায়েয, তবে তা নগদ লেনদেন হতে হবে। কিন্তু এখানে মূল সমস্যা হলো—বাজারদর থেকে অস্বাভাবিকভাবে বেশি নেওয়া।
২. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, ভিন্ন জাতীয় মুদ্রার বিনিময়ে বাজারদর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নেওয়া মাকরূহে তাহরিমি। কারণ এটি জুলুম হিসেবে গণ্য হয়।
৩. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সোনার বদলে সোনা, রূপার বদলে রূপা, গমের বদলে গম, যবের বদলে যব, খেজুরের বদলে খেজুর, লবণের বদলে লবণ—সমান সমান এবং নগদে। যে বেশি দিল বা বেশি নিল, সে সুদ করল।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৮৪)
যদিও ডলার-টাকা ভিন্ন জাতীয়, তবুও বাজারদর থেকে চরমভাবে বিচ্যুত হওয়া শরীয়তের নিয়মের পরিপন্থী। বাজারদর অনুযায়ী বা সামান্য তারতম্য সহকারে লেনদেন করা উচিত।
সারকথা: ১ ডলারের বদলে ২০০ টাকা নেওয়া ঠিক নয়। এটি জুলুম ও শরীয়তের নিয়মের খেলাফ।
প্রশ্ন ২: বাকিতে পণ্য লেনদেনে সুদ কীভাবে হয়?
আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নে দুটি বিষয় আছে:
(ক) সোনার বদলে সোনা বাকিতে নেওয়া
উত্তর: একই জাতীয় পণ্য (সোনার বদলে সোনা) বাকিতে লেনদেন করা স্পষ্ট সুদ। কারণ:
- একই জাতীয় বস্তুর বিনিময়ে সমান পরিমাণ এবং নগদ হওয়া আবশ্যক।
- যদি সমান পরিমাণও হয় কিন্তু বাকিতে হয়, তবুও তা সুদ। কারণ সময়ের ব্যবধানই এখানে সুদ হিসেবে গণ্য হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সোনার বদলে সোনা সমান সমান এবং নগদে। যে বেশি দিল বা বেশি নিল, সে সুদ করল।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৮৪)
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে বলেন:
"একই জাতীয় বস্তুতে বাকি লেনদেন জায়েয নয়, যদিও পরিমাণ সমান হয়। কারণ সময়ের অতিরিক্তই সুদ।" (রদ্দুল মুহতার: ৫/২১৭)
(খ) ধানের বদলে গম বাকিতে দেওয়া
উত্তর: ধান ও গম ভিন্ন জাতীয় হলেও উভয়ই খাদ্যদ্রব্য (মুকতাত)। খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে বাকিতে লেনদেনের বিধান হলো:
- ভিন্ন জাতীয় খাদ্যদ্রব্য (যেমন: ধানের বদলে গম) বাকিতে লেনদেন করা জায়েয নয়। কারণ হাদীসে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে বাকি লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"খাদ্যদ্রব্য খাদ্যদ্রব্যের বিনিময়ে সমান সমান হবে। আর যে বস্তুতে সমান সমান হওয়া আবশ্যক নয় (ভিন্ন জাতীয়), সেখানে নগদে লেনদেন করো, বাকিতে নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৬)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, খাদ্যদ্রব্য (যব, গম, ধান, খেজুর ইত্যাদি) বাকিতে বিনিময় করা জায়েয নয়, যদিও ভিন্ন জাতীয় হয়। কারণ হাদীসে খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রে বাকি লেনদেন নিষিদ্ধ।
সারকথা:
- সোনার বদলে সোনা বাকিতে নেওয়া—সুদ।
- ধানের বদলে গম বাকিতে দেওয়া—সুদ।
কেন বাকিতে লেনদেন সুদ?
সুদের মূলনীতি হলো: সময়ের বিনিময়ে অতিরিক্ত। যখন আপনি একই জাতীয় বস্তু বাকিতে নেন, তখন সময়ের কারণে যে সুবিধা পাচ্ছেন, সেটিই সুদ। আবার খাদ্যদ্রব্য বাকিতে বিনিময় করলে, এক পক্ষ সময়ের কারণে সুবিধা পায়, যা শরীয়ত নিষিদ্ধ করেছে।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"আল্লাহ তা'আলা বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
| লেনদেনের ধরন | বিধান | |---|---| | ডলারের বদলে টাকা নগদে (বাজার দরে) | জায়েয | | ডলারের বদলে টাকা নগদে (বাজারদর থেকে চরম বিচ্যুত) | ঠিক নয় | | সোনার বদলে সোনা বাকিতে | সুদ, হারাম | | ধানের বদলে গম বাকিতে | সুদ, হারাম | | ধানের বদলে গম নগদে | জায়েয (পরিমাণে তারতম্য সহ) |
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।