ইসলামে টাকার বিনিময়ে যিকির প্রতিযোগিতা করা কি জায়েজ? ২০০০ বার যিকির করলে টাকা পাবে—এমন প্রতিযোগিতার হুকুম ও যিকির কবুল হওয়ার শর্ত সম্পর্কে জানতে চাই?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5862
Questioner: 0395 Shazneen
Question Asked: 23 Sep 2026, 03:32 PM
Reviewed & Published: 23 Sep 2026, 03:50 PM
Views: 46
Tokens: 3,387
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

Islam ee takar binimoye competition korano ki jayez ache ? Ami Jodi Ekta competition Kori jekhane sobaike 2000 bar Jikhr Korte hbe, Jodi kore tahole taka pabe tahole shei Jikhr ki kobul hobe...?

Answer

ইসলামে টাকার বিনিময়ে প্রতিযোগিতা করানো কি জায়েজ?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—ইসলামে টাকার বিনিময়ে প্রতিযোগিতা করানো জায়েজ আছে কি? যদি এমন প্রতিযোগিতা করা হয় যেখানে সবাইকে ২০০০ বার যিকির করতে হবে, আর যিকির করলে টাকা পাবে—তাহলে সেই যিকির কি কবুল হবে?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

টাকার বিনিময়ে কুরআন-যিকিরের প্রতিযোগিতা করানো জায়েজ নয়। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় যিকিরের মধ্যে রিয়া (লোক দেখানো)দুনিয়ার লোভ প্রবেশ করে, যা ইবাদতকে নষ্ট করে দেয়। তবে দ্বীনি ইলম (কুরআন, হাদীস, ফিকহ ইত্যাদি) শিক্ষার উদ্দেশ্যে পুরস্কার প্রদান করা জায়েজ—যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।


বিস্তারিত আলোচনা

১. ইবাদতের মূল ভিত্তি: ইখলাস (নিষ্ঠা)

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ

"তাদেরকে এছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে একনিষ্ঠভাবে।"

(সূরা আল-বাইয়িনাহ: ৫)

যিকির একটি মহান ইবাদত। ইবাদতের মূল শর্ত হলো ইখলাস। যদি যিকিরের উদ্দেশ্য হয় টাকা পাওয়া, তাহলে ইখলাস নষ্ট হয়ে যায় এবং ইবাদতের সওয়াব কমে যায় বা বরবাদ হয়ে যায়।

২. হাদীসে কুদসির সতর্কবাণী

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي فَأَنَا مِنْهُ بَرِيءٌ وَهُوَ لِغَيْرِي

"যে ব্যক্তি কোনো আমল করল এবং তাতে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করল, আমি তার থেকে মুক্ত, সে আমলটি তার সেই শরিকের জন্য।"

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৮৫)

৩. ফুকাহায়ে কেরামের মত

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:

ইবাদতের মধ্যে দুনিয়ার কোনো উদ্দেশ্য (টাকা, পুরস্কার, প্রশংসা) থাকলে তা ইখলাস নষ্ট করে। তবে যদি মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হয় এবং পুরস্কার শুধু উৎসাহের জন্য হয়, তাহলে তা ভিন্ন বিষয়।

(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৬০-এর কাছাকাছি)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি" গ্রন্থে বলেন:

দ্বীনি ইলম শিক্ষার জন্য পুরস্কার প্রদান করা জায়েজ, কারণ এতে ইলম অর্জনের উৎসাহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু যিকির-আযকারের মতো খাঁটি ইবাদতের জন্য টাকার লোভ দেখানো ঠিক নয়, কারণ এতে ইখলাস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২৫-এর কাছাকাছি)

৪. হাদীসে পুরস্কারের বৈধতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইলম শিক্ষার ক্ষেত্রে পুরস্কারের কথা বলেছেন:

حَدَّثَنَا أَبُو مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيُّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ

"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পড়বে, সে একটি নেকি পাবে।"

(সুনানে তিরমিজি, হাদীস নং ২৯১০ — হাসান সহীহ)

এখানে পুরস্কার হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে, দুনিয়ার টাকা নয়।

৫. যিকিরের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা

যিকির হলো খাঁটি ইবাদত। এতে টাকার লোভ যুক্ত হলে:

  • রিয়া (লোক দেখানো) সৃষ্টি হয়
  • ইখলাস নষ্ট হয়
  • সওয়াব কমে যায় বা বরবাদ হয়
  • যিকিরের মূল উদ্দেশ্য (আল্লাহর স্মরণ) থেকে মন সরে যায়

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর" গ্রন্থে বলেন:

ইবাদতের মধ্যে যদি দুনিয়ার কোনো লাভের আশা থাকে, তবে তা ইখলাসের পরিপন্থী। যিকির, নামাজ, রোজা—এসব খাঁটি ইবাদত, এতে দুনিয়ার লোভ মিশানো উচিত নয়।

(বেহেশতী জেওর, পৃ. ৩২-এর কাছাকাছি)


আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর

প্রশ্ন: ২০০০ বার যিকির করলে টাকা পাবে—এমন প্রতিযোগিতা করা কি জায়েজ?

উত্তর: না, এ ধরনের প্রতিযোগিতা করা জায়েজ নয়। কারণ:

  1. যিকির খাঁটি ইবাদত — এতে টাকার লোভ যুক্ত করা ইখলাস নষ্ট করে।
  2. যিকিরের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি, টাকা নয়।
  3. রিয়া ও দুনিয়ার লোভ ইবাদতকে বরবাদ করে দেয়।

প্রশ্ন: সেই যিকির কি কবুল হবে?

উত্তর: যদি যিকিরের মূল উদ্দেশ্য টাকা পাওয়া হয়, তাহলে সেই যিকির কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন:

إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ

"আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের (নিষ্ঠাবানদের) থেকে কবুল করেন।"

(সূরা আল-মায়িদাহ: ২৭)

তবে যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যিকির করে এবং পুরস্কারটি শুধু উৎসাহের জন্য হয় (মূল উদ্দেশ্য না হয়), তাহলে যিকির কবুল হওয়ার আশা করা যায়। কিন্তু এ ধরনের প্রতিযোগিতা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।


বিকল্প পদ্ধতি (জায়েজ)

যদি দ্বীনি শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিযোগিতা করতে চান, তাহলে:

  1. কুরআন হিফজ প্রতিযোগিতা — পুরস্কার প্রদান জায়েজ
  2. হাদীস/ফিকহ কুইজ — ইলম শিক্ষার জন্য জায়েজ
  3. দ্বীনি ইলমের পরীক্ষা — পুরস্কার জায়েজ
  4. যিকিরের পরিবর্তে — যিকিরের ফজিলত বর্ণনা করা, উৎসাহ দেওয়া

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন" গ্রন্থে বলেন:

দ্বীনি ইলম শিক্ষার জন্য পুরস্কার প্রদান করা জায়েজ, কারণ এতে ইলম অর্জনের উৎসাহ বাড়ে। কিন্তু খাঁটি ইবাদতের (যিকির, নামাজ, রোজা) জন্য দুনিয়ার পুরস্কার নির্ধারণ করা উচিত নয়।

(মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ২৪৫-এর কাছাকাছি)


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | টাকার বিনিময়ে যিকির প্রতিযোগিতা | জায়েজ নয় | | যিকিরে টাকার লোভ থাকলে যিকির কবুল | কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কম | | দ্বীনি ইলম শিক্ষার পুরস্কার | জায়েজ | | যিকিরের মূল উদ্দেশ্য | শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি |

পরামর্শ: যিকির করুন একনিষ্ঠভাবে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। টাকার লোভ যুক্ত করবেন না। যদি দ্বীনি শিক্ষার জন্য প্রতিযোগিতা করতে চান, তাহলে কুরআন-হাদীসের ইলম ভিত্তিক প্রতিযোগিতা করুন, যিকিরের প্রতিযোগিতা নয়।


রেফারেন্স

  1. সূরা আল-বাইয়িনাহ: ৫
  2. সূরা আল-মায়িদাহ: ২৭
  3. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৮৫
  4. সুনানে তিরমিজি, হাদীস নং ২৯১০
  5. রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদিন
  6. ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি
  7. বাহিশতী জেওর, আশরাফ আলী থানভী
  8. মাআরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.