সূরা কাসাসের আমল
Business and Job · Hanafi
Question
সঠিক আয়াত সংখ্যাটা বলতে পারছি না। সূরা সঠিক আয়াত যে কোন একটা হবে।
প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ১১ বা ০৭ বার পড়লে সৌভাগ্যবান দের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং
০৫ টি নেয়ামত দেয়া হয়
১৷ উত্তম স্ত্রী
২। উত্তম সাওয়ারি
৩। উত্তম বাসা
৪। উত্তম প্রতিবেশী
৫। উত্তম রিজিক
সঠিক আমলটা রেফারেন্সসহ বিস্তারিত ভাবে বলা যাবে?
Answer
সূরা কাসাসের আয়াত ও সংশ্লিষ্ট আমল সম্পর্কে বিস্তারিত
প্রশ্নের উত্তর
আপনি যে আমলটির কথা উল্লেখ করেছেন, তা সূরা কাসাসের ২৩, ২৪, ২৫ বা ২৬ নম্বর আয়াতের সাথে সম্পর্কিত। আসুন আমরা সঠিক আয়াত ও আমলটি বিশ্লেষণ করি।
সূরা কাসাসের প্রাসঙ্গিক আয়াতসমূহ
সূরা কাসাস, আয়াত ২৩-২৬:
আয়াত ২৩: وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مِنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِنْ دُونِهِمُ امْرَأَتَيْنِ تَذُودَانِ ۖ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا ۖ قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّىٰ يُصْدِرَ الرِّعَاءُ ۖ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ
"আর যখন তিনি মাদইয়ানের পানির কূপের নিকট পৌঁছলেন, তখন তিনি দেখলেন একদল লোক পানি পান করাচ্ছে এবং তাদের পাশে দুইজন নারী নিজেদের পশুদের আটকে রেখেছে। তিনি বললেন, 'তোমাদের কী ব্যাপার?' তারা বলল, 'আমরা পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ না মেষপালকরা ফিরে যায়। আমাদের পিতা অতি বৃদ্ধ।'"
আয়াত ২৪: فَسَقَىٰ لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّىٰ إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
"অতঃপর তিনি তাদের উভয়ের জন্য পানি পান করালেন, তারপর ছায়ার দিকে ফিরে গেলেন এবং বললেন, 'হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যা কিছু কল্যাণ নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।'"
আয়াত ২৫: فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاءٍ ۖ قَالَتْ إِنَّ أَبِي يَدْعُوكَ لِيَجْزِيَكَ أَجْرَ مَا سَقَيْتَ لَنَا ۖ فَلَمَّا جَاءَهُ وَقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ قَالَ لَا تَخَفْ ۖ نَجَوْتَ مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
"অতঃপর তাদের একজন লজ্জার সাথে ধীরে ধীরে তার কাছে এল। সে বলল, 'আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন, যাতে আপনি আমাদের জন্য পানি পান করানোর পারিশ্রমিক প্রদান করেন।' অতঃপর যখন তিনি তার কাছে এলেন এবং তার কাছে ঘটনা বর্ণনা করলেন, তখন তিনি বললেন, 'ভয় করো না, তুমি জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি পেয়েছ।'"
আয়াত ২৬: قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ ۖ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ
"তাদের একজন বলল, 'হে আমার পিতা! আপনি তাকে মজুর নিয়োগ করুন। নিশ্চয়ই সর্বোত্তম ব্যক্তি যাকে আপনি মজুর নিয়োগ করবেন, সে হলো শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।'"
প্রশ্নে উল্লেখিত আমল সম্পর্কে
আপনি যে আমলটি উল্লেখ করেছেন—প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ১১ বা ৭ বার সূরা কাসাসের নির্দিষ্ট আয়াত পড়া এবং এর ফলে ৫টি নেয়ামত লাভের কথা—এটি কোনো সহিহ হাদিস বা নির্ভরযোগ্য ইসলামি গ্রন্থে পাওয়া যায় না।
হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ
আমরা হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ (ফতোয়ায়ে উসমানি, ইমদাদুল ফতোয়া, রদ্দুল মুহতার, বেহেশতি জেওর, ফতোয়ায়ে আলমগীরি) অনুসন্ধান করেছি। এই গ্রন্থসমূহে উক্ত আমল সম্পর্কে কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা
১. বিদ'আত সম্পর্কে সতর্কতা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন বিষয় উদ্ভাবন করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)
২. কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত: কুরআন তিলাওয়াতের সাধারণ ফজিলত অনেক। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যায় নির্দিষ্ট আয়াত পড়ার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সহিহ দলিল ছাড়া বলা যাবে না।
৩. দ্বীনি কাজে সতর্কতা: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ইমামগণ দ্বীনের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো আমল সম্পর্কে সহিহ দলিল না থাকলে তা করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি
১. সূরা কাসাসের আয়াত ২৪ হলো মুসা (আ.)-এর দু'আ: "رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ" (হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যা কিছু কল্যাণ নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।) — এই দু'আটি যেকোনো সময় পড়া যেতে পারে।
২. সূরা কাসাসের আয়াত ২৬-এ বর্ণিত "الْقَوِيُّ الْأَمِينُ" (শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত) — এটি একটি প্রশংসনীয় গুণ।
৩. সাধারণ নিয়ম: কুরআনের যেকোনো আয়াত তিলাওয়াত করা সওয়াবের কাজ। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট সময়ে পড়ার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সহিহ দলিল থাকা প্রয়োজন।
উপসংহার ও পরামর্শ
১. প্রশ্নে উল্লেখিত আমলটি (প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ১১ বা ৭ বার সূরা কাসাসের নির্দিষ্ট আয়াত পড়া) সম্পর্কে কোনো সহিহ দলিল পাওয়া যায় না।
২. এই ধরনের আমল সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত, কারণ এটি বিদ'আতের পর্যায়ে পড়তে পারে।
৩. বিকল্প পরামর্শ: আপনি সূরা কাসাসের আয়াত ২৪-এর দু'আটি (رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ) যেকোনো সময় পড়তে পারেন। এটি মুসা (আ.)-এর দু'আ, যা কুরআনে বর্ণিত।
৪. সঠিক পন্থা: উত্তম স্ত্রী, উত্তম সাওয়ারি, উত্তম বাসা, উত্তম প্রতিবেশী ও উত্তম রিজিক লাভের জন্য কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত দু'আ ও আমলগুলো করা উচিত। যেমন:
- রিজিকের জন্য: "اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ" (তিরমিজি: ৩৫৬৩)
- উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য: দু'আ ও ইস্তিখারা করা
৫. মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন, দ্বীনের ব্যাপারে কোনো আমল করার আগে তার দলিল যাচাই করা জরুরি। দলিলবিহীন আমল করা বিদ'আতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।