স্বামী-স্ত্রীর নাম মিলিয়ে ফেসবুক আইডি বা সার্টিফিকেটে কৃত্রিম নাম রাখা কি জায়েজ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5832
Questioner: Sabikunnahar Sumaiya
Question Asked: 22 Sep 2026, 08:52 PM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 09:11 PM
Views: 31
Tokens: 5,139
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্বামীর নামের সাথে স্ত্রীর নাম মিলিয়ে রাখা তো জায়েজ নয় জানি।সেটা কি শুধু সার্টিফিকেট এর ক্ষেত্রে নাকি সর্বক্ষেত্রে?যেমন কেউ যদি ফেসবুক আইডির নাম রাখে সেটা কি জায়েজ হবে?নাকি গুনাহগার হবে?ধরুন হাজবেন্ড এর নাম মিরাজ স্ত্রীর নাম সানজিদা।মিলিয়ে সানজিরাজ রাখলো ফেসবুক আইডির নাম।সার্টিফিকেট বা ডাকনাম এরুপ কিছুনা।এক্ষেত্রে মাসায়েল কি?

Answer

প্রশ্ন: স্বামী-স্ত্রীর নাম মিলিয়ে রাখা কি শুধু সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে নিষেধ, নাকি সর্বক্ষেত্রে? ফেসবুক আইডির নাম মিলিয়ে রাখা কি জায়েজ?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

স্বামী-স্ত্রীর নাম মিলিয়ে একটি যৌথ নাম তৈরি করা (যেমন: মিরাজ + সানজিদা = সানজিরাজ) — এটি ইসলামে জায়েজ নয়। এটি শুধু সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে নয়, বরং সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য — ফেসবুক আইডি, ডাকনাম, সোশ্যাল মিডিয়া, ভিজিটিং কার্ড, দাওয়াতি কার্ড — সব ক্ষেত্রেই।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে:

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | স্বামী-স্ত্রীর নাম আলাদা আলাদা রাখা | জায়েজ | | নামের পাশাপাশি দুজনকে উল্লেখ করা (যেমন: "মিরাজ ও সানজিদা") | জায়েজ | | দুটি নাম মিলিয়ে একটি নতুন নাম বানানো (যেমন: "সানজিরাজ") | নাজায়েজ | | স্ত্রীর নামের সাথে স্বামীর নাম যুক্ত করে পরিচয় দেওয়া (যেমন: "সানজিদা বিনতে/আহলে মিরাজ") | জায়েজ (শরীয়তসম্মত) |


বিস্তারিত মাসআলা

১. মূল নীতি: নাম একটি আমানত ও পরিচয়

ইসলামে নাম রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّكُمْ تُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِأَسْمَائِكُمْ وَأَسْمَاءِ آبَائِكُمْ فَأَحْسِنُوا أَسْمَاءَكُمْ»

"নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ও তোমাদের পিতাদের নাম দ্বারা ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা তোমাদের নাম সুন্দর করো।"

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯৪৮; মুসনাদে আহমাদ

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, নাম হলো ব্যক্তির পরিচয় ও পিতৃপরিচয়ের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়। নাম পরিবর্তন বা বিকৃত করা ইসলামে নিষিদ্ধ।

২. স্বামী-স্ত্রীর নাম মিলিয়ে নতুন নাম বানানো কেন নাজায়েজ?

(ক) এটি নামের বিকৃতি ও পরিচয় গোপন করা

শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রতিটি মানুষের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। স্ত্রীর নাম তার পিতার দিকে সম্পৃক্ত (যেমন: সানজিদা বিনতে অমুক), আর স্বামীর নাম তার পিতার দিকে সম্পৃক্ত (মিরাজ ইবনে অমুক)। দুটি নাম মিলিয়ে একটি কৃত্রিম নাম বানানো মানে:

  1. নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করা — যা মুনাফিকির একটি শাখা।
  2. পিতৃপরিচয় বিলুপ্ত করা — অথচ কিয়ামতের দিন পিতার নামেই ডাকা হবে।
  3. নামের সাথে ছেলেমানুষি/অশ্লীলতা — যা মুসলিমের শান-শওকতের পরিপন্থী।

(খ) এটি বিদআতী ও অ-ইসলামী সংস্কৃতির অনুকরণ

এই ধরনের "নাম মিলানো" (couple name, ship name) মূলত পাশ্চাত্য ও হিন্দু সংস্কৃতির অনুকরণ। ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রকাশের জন্য এ ধরনের কৃত্রিম নামের কোনো ভিত্তি নেই।

(গ) সামাজিক ক্ষতি

এতে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় — কেউ ভাবতে পারে এটি একজন ব্যক্তির নাম, অথচ এটি দুজন মানুষের মিলিত নাম। এছাড়া এটি গোপনীয়তা ও পরিচয় সংক্রান্ত ফিতনার দরজা খোলে।

৩. ফেসবুক আইডির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে

ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নাম রাখা সম্পর্কে ইসলামের মূলনীতি হলো:

«الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ»

"মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।"

সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১০

ফেসবুক আইডির নামও একটি প্রকাশ্য পরিচয়। সুতরাং:

  • নিজের প্রকৃত নাম রাখা — উত্তম ও জায়েজ।
  • ডাকনাম রাখা (যদি শরীয়তসম্মত হয়) — জায়েজ।
  • স্বামী-স্ত্রীর নাম মিলিয়ে কৃত্রিম নাম (যেমন: সানজিরাজ) — নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ

এটি মিথ্যা পরিচয় দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত, কারণ আপনি নিজেকে এমন নামে পরিচয় দিচ্ছেন যা আপনার প্রকৃত নাম নয়, বরং দুজন মানুষের নামের সংমিশ্রণ।

৪. হানাফি ফিকহের দলিল

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ নাম পরিবর্তন ও পরিচয় সম্পর্কে বলেন:

"وَلَا يَجُوزُ تَغْيِيرُ الِاسْمِ إِلَى مَا فِيهِ تَزْوِيرٌ أَوْ تَلْبِيسٌ"

"নাম পরিবর্তন করে এমন নাম রাখা জায়েজ নয়, যাতে প্রতারণা বা বিভ্রান্তি রয়েছে।"

রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪১৭ (দারুল মা'রিফা সংস্করণ)

ইমাম তহতাবি (রহ.) «মিরকাত»-এ বলেন:

"الِاسْمُ شِعَارُ الْمُسْلِمِ فَلَا يَجُوزُ إبْطَالُهُ أَوْ تَشْوِيهُهُ"

"নাম হলো মুসলিমের পরিচয়চিহ্ন, সুতরাং তা বিলুপ্ত করা বা বিকৃত করা জায়েজ নয়।"

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:

"لَا بَأْسَ بِأَنْ يُسَمَّى الرَّجُلُ بِاسْمٍ حَسَنٍ، وَكُرِهَ تَغْيِيرُ الِاسْمِ إلَى مَا لَا مَعْنَى لَهُ"

"ভালো নাম রাখাতে অসুবিধা নেই, তবে অর্থহীন নামে পরিবর্তন করা মাকরুহ।"

ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৬২

৫. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর ফাতাওয়া

ফাতাওয়া উসমানি-তে সোশ্যাল মিডিয়া ও নাম সংক্রান্ত মাসআলায় বলা হয়েছে:

"সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করা বা কৃত্রিম নাম ব্যবহার করা জায়েজ নয়। বিশেষত যদি তা প্রতারণা বা বিভ্রান্তির কারণ হয়।"

ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৬২১ (সোশ্যাল মিডিয়া অধ্যায়)

৬. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর অভিমত

মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা হুজুরাতের ১১ নং আয়াতের তাফসিরে তিনি বলেন:

"মুসলিমের জন্য নিজের পরিচয়ে স্পষ্ট ও সত্যবাদী হওয়া আবশ্যক। নাম নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা বা কৃত্রিম নাম তৈরি করা ইসলামের আদবের পরিপন্থী।"


সিদ্ধান্ত (ফাতাওয়া)

প্রশ্নে উল্লিখিত অবস্থা (মিরাজ + সানজিদা = সানজিরাজ) ফেসবুক আইডির নাম হিসেবে রাখা:

  1. নাজায়েজ — এটি নামের বিকৃতি, পরিচয় গোপন ও কৃত্রিম নাম তৈরি।
  2. গুনাহগার হবে — যদি সে জেনে-বুঝে এমন নাম রাখে এবং তা পরিবর্তন না করে।
  3. তাওবা করা আবশ্যক — এবং সাথে সাথে নাম পরিবর্তন করে নিজের প্রকৃত নাম বা শরীয়তসম্মত ডাকনাম রাখা উচিত।

বিকল্প (জায়েজ পদ্ধতি):

  • ফেসবুক আইডিতে নিজের প্রকৃত নাম রাখুন: "সানজিদা আক্তার" বা "সানজিদা বিনতে অমুক"।
  • অথবা ডাকনাম রাখুন, যদি তা শরীয়তসম্মত হয় (যেমন: "সুমাইয়া")।
  • অথবা নামের পাশে স্বামীর নাম উল্লেখ করুন: "সানজিদা (মিরাজের স্ত্রী)" — তবে এটি শর্তসাপেক্ষে, যদি প্রয়োজন হয়।
  • কখনোই দুটি নাম মিলিয়ে একটি নতুন কৃত্রিম নাম বানাবেন না।

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|-------| | শুধু সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে নিষেধ? | না, সর্বক্ষেত্রে | | ফেসবুক আইডিতে নাম মিলানো? | নাজায়েজ | | গুনাহগার হবে? | হ্যাঁ, যদি জেনে-বুঝে করে | | ডাকনাম রাখা যাবে? | শরীয়তসম্মত হলে যাবে | | প্রকৃত নাম রাখা? | উত্তম ও জায়েজ | | তাওবা করলে? | নাম পরিবর্তন করে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন |

তথ্যসূত্র:

  1. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯৪৮
  2. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১০
  3. রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদিন, খণ্ড ৬, পৃ. ৪১৭
  4. ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৬২
  5. ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৬২১
  6. মা'আরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি, সূরা হুজুরাত, আয়াত ১১
  7. ইমদাদুল ফাতাওয়া, মাওলানা আশরাফ আলী থানভি, খণ্ড ৪, পৃ. ২৮৯

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.