কুফু মেলানোর সঠিক ইসলামি নিয়ম কী? ছেলের ইনকাম নাকি বাবার ইনকাম দেখতে হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
কুফু মেলানোর ক্ষেত্রে এতদিন জানতাম যে, মেয়ের বাবা মাসিক যা আয় করে তা সমপরিমাণ কিংবা বেশি আয় যদি ছেলের / ছেলের পরিবারের হয়ে থাকে তাহলে সবদিক ঠিক থাকলে বিয়ে আগানো যাবে।
কিন্তু গতকাল ফেসবুকে পরিচিত একজন বিয়ে বিষয়ক ব্লগার ( আলেম/ মুহাদ্দিস না) কুফু ব্যাপারটা অন্যভাবে বুঝিয়ে বললেন।এরপর আমি কনফিউজড।
তিনি বললেন - "" ধরেন কোনো মেয়ের বাবা মাসিক আয় ৯০ হাজার,মেয়েরা ৩ ভাই-বোন এবং অন্যান্য দিক ঠিক আছে কিন্তু খুব বেশি ধার্মিক ফ্যামিলি না।ঐ মেয়ের যে ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হলো তার ইনকাম ৪০ হাজার, তারা ২ ভাই এবং ধার্মিক। এখানে স্বাভাবিকভাবেই সমাজের যে কেউ বলবে কুফু মেলে না।
এখন মেয়ের বাবার ৯০ হাজার টাকা বেতন হলেও ৩ ভাই-বোন হিসাবে ঐ মেয়ের ভাগে ৩০ হাজার টাকা কিন্তু ছেলের তো ৪০ হাজার টাকাই থাকছে।তাহলে তো কুফু ঠিকই আছে।উনি ছেলের আয়কে বিভক্ত করেনি।
এছাড়াও উনি অন্যান্য ব্যাপার ও তুলনা করেছে কিন্তু আমি এখানে আয়ের ব্যাপারটা তুলনা করলাম"" "
এই যে উনি মেয়ের বাবার আয় ভাগ করে হিসাব করলেন। ছেলের বাবার আয় কথা বলেনি। এক্ষেত্রে পরিষ্কার না যে, ছেলের পরিবারে বাবার টাকার অবদান আছে কি না। কিন্তু ছেলের তো পারিবারিক খরচ থাকার কথা। কোনো ছেলে মাসে ৩০ -৪০ হাজার টাকা ইনকাম করে বাসায় দেয় না এইটা তো হতেই পারে না।এভাবে কি ইসলামে কুফু মেলানো হয়?
**কুফু মেলানোর ক্ষেত্রে কী শুধু ছেলের ইনকাম দেখতে হয় নাকি ছেলের বাবার নাকি উভয়ের?
***কুফু মেলানোর ইসলামিক উপায় উদাহরণ সহ বলবেন।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান সমাজে বহুল আলোচিত। কুফু (كفاءة) বা সমকক্ষতা/সামঞ্জস্যতা ইসলামী বিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে এটি নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। আপনার কনফিউশনটি স্বাভাবিক, কারণ ফেসবুকের অ-আলেম ব্লগারদের অনেক বিশ্লেষণই শরিয়তের মূলনীতি থেকে বিচ্যুত।
আসুন, আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝে নিই।
কুফু (كفاءة) এর সংজ্ঞা ও মূলনীতি
ইসলামি পরিভাষায় কুফু হলো বর-কনের মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্যতা। এটি বিবাহের শুদ্ধতার (সহিহ হওয়ার) শর্ত নয়, বরং এটি একটি সুপারিশকৃত (মুস্তাহাব) বিষয়। অর্থাৎ, কুফু না মিললেও বিবাহ শুদ্ধ হবে, তবে সমাজে বিবাদ এড়াতে এবং দাম্পত্য জীবন সুখময় করতে কুফু বিবেচনা করা হয়।
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়াহ এবং রদ্দুল মুহতার (শামি) -এ কুফু বিবেচনার যে বিষয়গুলো উল্লেখ আছে, তা হলো:
- নসব (বংশ): পিতৃপুরুষের দিক থেকে বংশের সম্মান ও মর্যাদা।
- দ্বীন (ধর্মপরায়ণতা): চরিত্র, নামাজ-রোজা পালন, গুনাহ থেকে বিরত থাকা।
- হিরফাহ (পেশা): বর ও কনের পরিবারের পেশার মধ্যে সামঞ্জস্যতা (যেমন: উচ্চপদস্থ চাকরিজীবীর মেয়ের সাথে দিনমজুরের বিয়ে কুফু নয়)।
- হুররিয়াত (স্বাধীনতা): দাস-দাসীর বিষয়, যা বর্তমানে প্রযোজ্য নয়।
- ইয়াসার (আর্থিক সচ্ছলতা): মোহরানা ও ভরণপোষণের (নাফাকা) সামর্থ্য থাকা।
আর্থিক দিকটি (ইয়াসার) কীভাবে বিবেচিত হবে?
এখানেই মূল প্রশ্ন। ফিকহের কিতাবগুলোতে বলা হয়েছে, কুফুর জন্য মেয়ের পক্ষ থেকে দেনমোহর (মাহর) এবং ভরণপোষণের (নাফাকা) সামর্থ্যের দিকে খেয়াল করা হয়। অর্থাৎ, ছেলেকে (বরকে) নিজে থেকে মোহরানা আদায় করার এবং স্ত্রীর খরচ বহন করার সক্ষমতা থাকতে হবে। ছেলের বাবার আয় বা পারিবারিক সম্পদ প্রাথমিকভাবে কুফুর শর্ত নয়, যদিও পরিবারের আভিজাত্য একটি পৃথক বিষয়।
আপনার প্রশ্নের উত্তর
১. মেয়ের বাবার আয় ভাগ করে হিসাব করা কি সঠিক?
না, এটি সম্পূর্ণ ভুল এবং অজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্লেষণ। ইসলামি ফিকহে কুফু নির্ণয়ে মেয়ের বাবার আয়কে তার সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে হিসাব করার কোনো বিধান নেই। মেয়ের বাবার আয় তার নিজের সম্পদ, যা দিয়ে তিনি তার পরিবারের ভরণপোষণ করেন। কুফুর ক্ষেত্রে মেয়ের পক্ষ থেকে শুধু এতটুকু দেখা হয় যে, সে (মেয়ে) কোনো দোষণীয় ত্রুটি (যেমন: দাসত্ব) থেকে মুক্ত কিনা এবং তার পরিবার সম্মানিত কিনা। বাবার আয়ের পরিমাণ কুফুর মানদণ্ড নয়।
২. কুফু মেলানোর ক্ষেত্রে কী শুধু ছেলের ইনকাম দেখতে হয় নাকি ছেলের বাবার নাকি উভয়ের?
কুফুর জন্য শুধু ছেলের (বরের) নিজস্ব আয় ও সামর্থ্য দেখতে হবে। কারণ, স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব শরিয়তে স্বামীর ওপর। ছেলের বাবার আয় তার নিজের, যা দিয়ে তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের খরচ চালান। ছেলের বাবার সম্পদ কুফুর মানদণ্ড নয়। তবে, যদি ছেলে নিজে অক্ষম হয় এবং তার বাবার সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে বিচারক (কাজী) বা অভিভাবকদের দেখতে হবে যে, ছেলেটি ভবিষ্যতে স্ত্রীর খরচ বহনে সক্ষম কিনা। কিন্তু এটি কুফুর শর্ত নয়, বরং নাফাকা (ভরণপোষণ) এর শর্ত।
৩. কুফু মেলানোর ইসলামিক উপায় উদাহরণ সহ:
ধরুন, জনাব 'ক' সাহেব একজন সৎ ও ধার্মিক মানুষ, তিনি একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন এবং তার মাসিক বেতন ৪০,০০০ টাকা। তিনি একটি ধার্মিক পরিবারের মেয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। মেয়েটির বাবা একজন ব্যবসায়ী, তার মাসিক আয় ৯০,০০০ টাকা এবং তার পরিবার ধর্মীয়ভাবে সাধারণ মানের।
এখন ইসলামি নিয়মে কুফু মেলানো হবে কিনা তা এভাবে দেখবেন:
- দ্বীন (ধর্মপরায়ণতা): ছেলেটি ধার্মিক এবং মেয়েটির পরিবার "খুব বেশি ধার্মিক না" হলেও তারা যদি মৌলিক ইসলামি বিধান (নামাজ, রোজা) পালন করে এবং প্রকাশ্য গুনাহে লিপ্ত না হয়, তাহলে দ্বীনের দিক থেকে কুফু মেলানো যাবে। কারণ, কুফুর জন্য ন্যূনতম ধর্মীয় অবস্থা (ফাসিক না হওয়া) শর্ত।
- পেশা (হিরফাহ): ছেলেটি চাকরিজীবী, মেয়ের বাবা ব্যবসায়ী। সমাজে উভয় পেশাই সম্মানজনক। তাই পেশার দিক থেকেও কুফু মেলবে।
- আর্থিক সক্ষমতা (ইয়াসার): ছেলেটির নিজস্ব আয় ৪০,০০০ টাকা। সে যদি এই আয় থেকে মোহরানা আদায় করতে এবং স্ত্রীর খরচ বহন করতে সক্ষম হয়, তাহলে আর্থিক দিক থেকেও কুফু মেলবে। মেয়ের বাবার ৯০,০০০ টাকা আয়কে ৩ ভাই-বোনে ভাগ করে ৩০,০০০ টাকার সাথে ছেলের ৪০,০০০ টাকা তুলনা করার কোনো সুযোগই ইসলামে নেই। কারণ, মেয়ের বাবার আয় মেয়ের ওপর স্বামীর খরচের দায়িত্বকে কমিয়ে দেয় না।
সুতরাং, আপনার উল্লেখিত উদাহরণে ইসলামি নিয়মে কুফু ঠিকই আছে। ফেসবুক ব্লগারের বিশ্লেষণটি সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
গুরুত্বপূর্ণ নস (References):
১. কুরআন: আল্লাহ তায়ালা বলেন, "তোমাদের মধ্যে যে ঈমানদার ও সৎকর্মপরায়ণ দাস-দাসী আছে, তাদের সাথে বিয়ে করো।" (সূরা আন-নূর: ৩২)। এই আয়াতে দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ২. হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ করো, তখন তাকে বিয়ে দাও।" (তিরমিজি: ১০৮৪)। এই হাদিসে বংশ ও অর্থের চেয়ে দ্বীনদারিকে প্রধান মানদণ্ড বলা হয়েছে। ৩. হানাফি ফিকহ (রদ্দুল মুহতার): ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেন, "কুফু বিবেচনার মূল বিষয় হলো দ্বীন, বংশ, পেশা ও স্বাধীনতা। আর আর্থিক সক্ষমতা (ইয়াসার) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মোহরানা ও নাফাকার (ভরণপোষণের) সামর্থ্য।" (রদ্দুল মুহতার, ৪র্থ খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়)। ৪. ফতোয়ায়ে উসমানি: মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম লিখেছেন, "কুফুর জন্য বরের নিজের আর্থিক সক্ষমতা দেখা জরুরি, পিতার সম্পদ দেখার প্রয়োজন নেই। তবে পিতার সম্পদ থাকলে তা ভবিষ্যতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা কুফুর শর্ত নয়।"
উপসংহার ও পরামর্শ
আপনি কনফিউজড হওয়ার কোনো কারণ নেই। ফেসবুকের অ-দায়িত্বশীল ব্লগারদের বিশ্লেষণ এড়িয়ে চলুন। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্থানীয় কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির কাছে সরাসরি প্রশ্ন করুন।
মনে রাখবেন: ইসলামে বিয়ের মূল ভিত্তি হলো দ্বীনদারি ও চরিত্র। অর্থ-বিত্ত বা সামাজিক মর্যাদা গৌণ বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজে একজন সাধারণ ও সৎ চরিত্রের মানুষ ছিলেন, যিনি ধনী মহিলা খাদিজা (রাঃ)-এর সাথে বিয়ে করেছিলেন। তাই, ছেলের চরিত্র, নামাজ-রোজা পালন এবং নিজের আয়ে সংসার চালানোর সক্ষমতা থাকলেই তাকে কুফু ধরা হবে। মেয়ের বাবার আয় দিয়ে হিসাব করার কোনো সুযোগ নেই।