প্রতিবেশীর জুলুম, গোবরের স্তূপ, গাছের ডাল-পাতা, দুর্গন্ধ ও ঝগড়ার শরিয়াহভিত্তিক সমাধান জানতে চাই?
Family Life · Hanafi
Question
নিম্নোক্ত প্রশ্নটি আমি কিছুদিন আগে করেছিলাম। এটার একটা আপডেট জানাতে চাই। আমি সেই চাচি কে সরাসরি সালাম দিয়ে বলি যে আমি চাই আমাদের এতোদিনের ঝগড়ার সমাপ্তি হোক। এবং আপনারা দয়া করে আমার ঘরের উপরে থাকা সমস্ত গাছ কেটে নেন। তাহলে আমাদের সাথে আর কোনো ঝগড়া হবে না। কিছুদিন পরে আসার বড়ো আম্মাকে তাদের বাসায় পাঠাই। এই একই আহব্বান নিয়ে। কিন্তু সেই জালিম চাচি উত্তর দেয় তাদের কে গাছের ডাল বা পাতা দিয়ে কষ্ট পৌছে সেটা সহ্য করতে হবে। আমরা তাদের কথাতে গাছ কাটবো না। আর তারা নাকি তাদের ইচ্ছা মতো যখন ইচ্ছা তখন কাটবে।
আমাদের নতুন ঘরের উপরে তাদের দুইটা গাছের ডাল এসেছে যেটা কিছু আগে তাদের দুই বার বলেছিলাম কেটে নিতে তারা নেই নি। সেটা কাল আমরা কেটে দেয়াই তারা আজ সকালে আমাদের জঘন্য ভাষায় আমার আব্বাকে গালি দেয়। আসার মৃত মায়ের মৃত্যুকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করে। প্রতি উত্তরে আব্বা গেলে ব্যাস বিশাল ঝগড়া বেধে যায়। আর ঐ চাচা আব্বার দিকে ইট ছুড়ে মারে। তখন আব্বা ও আসার ছোট ভাই আরো ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। আমি কোনো মতে তাদের থামাই।
এমতাবস্থায় শরিয়ার আলোকে আমরা কিভাবে সমাধানের দিকে আগাতে পারি? দয়া করে জানাবেন।
আর আমরা তাগুতি সরকারি আইনের থেকে কোনো মামলা করতে চাই না। অন্য শরিয়া ভিত্তিক কোন সমাধানটি আমাদের জন্য উপযুক্ত সেটি জানালে অনেক খুশি হবো ইনশাআল্লাহ।
শ্রদ্ধেয় মুক্তি সাহেবগণ,
আমাদের বাসার সাথেই লাগানো বাসা আমাদের আক্তার চাচার। যনি আমার বাবার আপন চাচাতো ভাই হন।
তিনাদের সাথে আমাদের পারিবারিক দন্দের/কলহের সময়কাল দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরের উপরে। তিনারা বিভিন্ন ভাবে আমাদের উপরে জুলুম করেন।
যেমন, আমাদের ঘরের জানালার পাশেই তারা গরুর গোবর রাখার স্তুপ করেছেন সেই প্রায় ১ যুগ আগে। আমার আব্বা যখন তিনাদের কে এটা সরাতে বলেন এবং বলেন যে এর দুর্গন্ধ আমাদের রুমে যাচ্ছে যেটা আমাদের জন্য কষ্টের কারণ হচ্ছে, তখন তিনারা ঝগড়ায় লিপ্ত হন আমার বাবার সাথে।
অনেকবার চেয়ারম্যান মেম্বার এর মাধ্যমে তাদেরকে জানানো হয়েছে এবং বসা হয়েছে কথা হয়েছে এবং তারা কথা দিয়েছিলো কিন্তু তারা সেটা আজ পর্যন্ত সরায়নি।
আমার বাবা এবং সেই চাচা একই অফিসে চাকরি করতেন সেটা ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টে। সেখান থেকে জজ সাহেব কিছু লোককে পাঠিয়ে দেন এটা সমাধানের জন্য এবারও তারা প্রতিশ্রুতি দেন যে যেটা সরাবেন কিন্তু ৮-১০ বছর আগে হলেও আজও তারা সেটা সরায় নি।
সেই চাচার স্ত্রী রেহানা চাচি হলেন খুবই হিংসুক ও জুলুম ক্বারি। তিনার বক্তব্য হলো তিনি কোনো ভাবেই এই গোবরের স্তুপ সরাবেন না।
দিতীয়ত তিনাদের গাছ আমাদের ঘরের উপরে ডাল পালা ছড়িয়েছে। আমরা এসব কেটে দিতে বললে তারা কর্ণপাত করে না। তখন আমরা ইউনিয়ন পরিষদে বিচার দিলে সেখান থেকে চৌকিদার এসে সেগুলি কেটে দিলে সেই চাচা চাচি আবার ঝগড়া বাধিয়ে দেন। গালাগালি করেন। তখন আমার বাবাও ঝগড়ায় শরিক হন। তিনাদের কথা হল আমরা এই জায়গায় জমি আগে কিনেছি আগে বাড়ি করেছি সুতরাং তোমাদের টিনের উপরে যদি কোন কিছুর ক্ষতি হয় তাহলে তোমরা ঘর ভেঙে সরিয়ে নাও তাও আমরা গাছ কাটবো না।
কিছুদিন আগেই তাদের এক গাছের বড় ডাল আমাদের ঘরের উপর দিয়ে আমাদের জসিতে পড়ে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে তিনি হেফাজত করেছেন ঘড়ের উপরে ডাইরেক্ট পড়া থেকে।
তাদের সেই গাছের পাতা নিয়মিত আমাদের টিনের উপরে পড়ে জমাট লেগে যাওয়ার কারণে বৃষ্টির পানি ঠিক মতো নামতে না পারায় পানি ওভার ফ্লো হয়ে আমাদের বারান্দায় পড়তে থাকে। যেটা আমাদের জন্য কষ্টকর।
তাদের গাছে যখন জাম ধরে তখন আমাদের টিনের উপরে পরে ঠাস ঠাস শব্দ হয় সেটা আমাদের ঘুমের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটায়।
এবং দুজনের বাড়ির সীমানা যেহেতু কাছাকাছি তারা সীমানার মধ্যেই তাদের ঘরুর ঘরের প্রসাবের কোনো লাইন তৈরী করেনি। যেটা পরিবেশের জন্য বা প্রতিবেশীর জন্য সুবিধার কারণ হয়। বরং তাদের গরুর প্রসাব সেখানে জমা হয়ে থাকে আর দুর্গন্ধ ছড়ায়। এর কারণে আমরা আমাদের অন্য এক রুমের জানালা পর্যন্ত করতে পারিনা এই দুর্গন্ধের কারণে।
এই সমস্ত জুলুমগুলি হয়ে আসতেছে গত ৩০ বছর যাবত! তো এখন এমতাবস্থায় আমরা কি করতে পারি?
যখন তাদেরকে ভালো ভাবে এই জুলুম বন্ধ করতে বলি তখন তারা ঝগড়া শুরু করে দেয় তখন আমার বাবা-মাও ঝগড়ায় শরীক হয়ে যেতেন। যদিও আমি সব সময় তাদের ঝগড়া থেকে দূরে থাকতে বলি।
আমার আম্মাজান ইন্তেকাল করেছেন গত দুই বছর আগে আম্মার ইন্তেকালের দিন আমি তাদের কাছ থেকে আম্মার পক্ষ হয়ে ক্ষমা চেয়ে আসি। এখন আমার বাবা জীবিত আছেন এবং বাবা এই জুলুমগুলির বিষয়ে অনেক কষ্টে থাকেন। আমি ভবিষ্যতের সব সমস্ত ঝগড়া এড়ানোর জন্য আমি বলি আপনি ধৈর্য ধরেন আমরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে এই বিচার পেশ করবো এবং আমি তাদেরকে যতদূর সম্ভব বুঝাবো তারা যেন এই জুলুম বন্ধ করেন।
আমি একজন তালিবুল ইলম। আমার মন মাঝে মাঝে মন চায় তাদেরকে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেই এবং প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে আল্লাহ রাসুলের হাদিস তাদেরকে মনে করিয়ে দিই। কিন্তু মনে অনেক কষ্ট জাগে এবং মনে হয় আল্লাহর রাসুল যে বলেছেন طلب العلم فريضه على كل مسلم
এটা কি তাদের উপর বর্তায় না? তাদের কি এটা বোধ হয় না যে আল্লাহর রাসূল প্রতিবেশীদের সম্পর্কে কি বলেছেন? বা কি করা উচিৎ?
আমি আপনাদের কাছ থেকে জানতে চাই এমতাবস্থায় উপরিরুক্ত বর্ণনা মতে আমরা কি করতে পারি আমাদের কি করার আছে? এমন জঘন্য জুলুমের জন্য কোনআন হাদিসের আলোকে কি করতে পারি?
দয়া করে জানাবেন প্লিজ।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
প্রিয় ভাই, আপনার দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক প্রশ্নটি পড়লাম। আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারকে সবর ও হিকমত দান করুন এবং এই দীর্ঘ ৩০ বছরের জুলুমের সমাধান করুন। আমিন।
আপনার প্রশ্নের উত্তর কয়েকটি অংশে দিচ্ছি:
১. প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি: প্রতিবেশীর হক
ইসলামে প্রতিবেশীর হক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ
"আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, পাশে বসা সঙ্গী..." (সূরা নিসা: ৩৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ
"জিবরীল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন যে, আমার ধারণা হলো তিনি তাকে ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৪, সহীহ মুসলিম: ২৬২৪)
আরেক হাদিসে:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُؤْذِ جَارَهُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৮)
সুতরাং আপনার চাচা-চাচি স্পষ্টভাবে গুনাহ করছেন। গোবরের স্তূপ, গাছের ডাল-পাতা, দুর্গন্ধ, প্রস্রাবের ব্যবস্থা—এসব প্রতিবেশীর উপর জুলুম। এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
২. আপনার করণীয়: ধাপে ধাপে শরিয়াহভিত্তিক সমাধান
(ক) সবর ও ধৈর্য — প্রথম অস্ত্র
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"তোমরা ধৈর্য ধরো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আনফাল: ৪৬)
وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَٰلِكَ لَمِن عَزْمِ الْأُمُورِ
"যে ধৈর্য ধরে ও ক্ষমা করে, নিশ্চয়ই এটি বড় সাহসিকতার কাজ।" (সূরা শূরা: ৪৩)
আপনি ঠিকই বলেছেন—কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে বিচার পেশ করবেন। এটি ঈমানের দাবি। তবে শুধু সবর করলেই হবে না; নিজের হক আদায়ের শরিয়াহসম্মত পথও অবলম্বন করতে হবে।
(খ) নিজের সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ — শরিয়াহর অনুমতি
গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা: আপনার ঘরের উপর তাদের গাছের ডাল এসে পড়লে—যা আপনার সম্পত্তির উপর হস্তক্ষেপ—সেটি কেটে ফেলার শরিয়াহসম্মত অধিকার আপনার আছে, তবে আগে তাদের অনুমতি নেওয়া বা জানানো উত্তম।
ফিকহের কিতাবে আছে:
وَلَيْسَ لِأَحَدٍ أَنْ يَتَصَرَّفَ فِي مِلْكِ غَيْرِهِ بِغَيْرِ إِذْنِهِ
"কেউ অন্যের সম্পত্তিতে তার অনুমতি ছাড়া হস্তক্ষেপ করতে পারে না।" (রাদ্দুল মুহতার, ৫/২৯৮)
আপনার ঘরের উপর তাদের গাছের ডাল পড়া মানে আপনার সম্পত্তিতে তাদের গাছের হস্তক্ষেপ। আপনি তাদের বারবার বলেছেন, তারা মানেনি। এমতাবস্থায় আপনি নিজেই সেই ডাল কেটে ফেলতে পারেন, কারণ এটি আপনার সম্পত্তির ক্ষতি রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাবে:
إِذَا كَانَ لِأَحَدٍ شَجَرَةٌ فِي أَرْضِ غَيْرِهِ وَلَمْ يَأْذَنْ لَهُ صَاحِبُ الْأَرْضِ فَلَهُ أَنْ يَقْطَعَهَا
"যদি কারো গাছ অন্যের জমিতে থাকে এবং জমির মালিক অনুমতি না দেয়, তবে সে তা কেটে ফেলতে পারে।" (আল-হিদায়া, কিতাবুল গাসব)
তবে সরাসরি ঝগড়া না করে, সাক্ষী রেখে, ইউনিয়ন পরিষদ বা স্থানীয় মুরুব্বিদের উপস্থিতিতে কাটা উত্তম।
(গ) গোবরের স্তূপ ও দুর্গন্ধ — প্রতিবেশীর হক লঙ্ঘন
গোবরের স্তূপ রাখা, দুর্গন্ধ ছড়ানো, প্রস্রাবের ব্যবস্থা না করা—এসব প্রতিবেশীর উপর জুলুম। ইসলামে এটি নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
"ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতির বদলে ক্ষতিও করা যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১, মুসনাদে আহমাদ: ২৮৬৫)
আপনার করণীয়:
- প্রথমে সরাসরি ভালোভাবে বলুন (আপনি করেছেন)।
- স্থানীয় মসজিদের ইমাম, মুরুব্বি, চেয়ারম্যান-মেম্বারকে মধ্যস্থতা করতে বলুন।
- ইউনিয়ন পরিষদের বিচার (আপনি করেছেন)।
- শেষ উপায়: প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া—যা শরিয়াহসম্মত, কারণ এটি আপনার হক আদায়ের জন্য।
৩. "তাগুতি সরকারি আইন" প্রসঙ্গে
আপনি বলেছেন—"তাগুতি সরকারি আইনের থেকে মামলা করতে চাই না।" এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার:
ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, নিজের হক আদায়ের জন্য বিচারকের কাছে যাওয়া জায়েজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে বিচারক নিয়োগ করেছেন, সাহাবায়ে কেরাম বিচারকের কাছে মামলা করেছেন।
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানতদারদের আমানত ফিরিয়ে দিতে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করো, ইনসাফের সাথে করো।" (সূরা নিসা: ৫৮)
"তাগুতি" বলা হয় সেই বিচারব্যবস্থাকে, যা আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে ফয়সালা দেয়। কিন্তু যদি সরকারি আদালত ইনসাফ করে এবং আপনার হক ফিরিয়ে দেয়, তবে সেখানে যাওয়া জায়েজ—বরং কখনো কখনো প্রয়োজনীয়।
তবে হ্যাঁ, যদি আপনি মনে করেন যে মামলা করলে আরও বড় ফিতনা, রক্তারক্তি, বা পরিবারের মধ্যে ভয়ানক বিভেদ সৃষ্টি হবে—তাহলে সবর করা উত্তম। এটি আপনার ইজতিহাদ ও পরিস্থিতির বিবেচনা।
৪. আপনার চাচা-চাচিকে দাওয়াত দেওয়া প্রসঙ্গে
আপনি তালিবুল ইলম। আপনি তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতে চান। এটি মহৎ উদ্দেশ্য। কিন্তু হিকমতের সাথে করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
"তোমরা হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে তোমার রবের পথে দাওয়াত দাও এবং তাদের সাথে উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করো।" (সূরা নাহল: ১২৫)
কিন্তু মনে রাখবেন:
- দাওয়াত দেওয়া ফরজে কিফায়া, তবে সবার উপর ফরজ নয়।
- আপনার চাচা-চাচি যদি দাওয়াত না মানেন, তাদের জবাবদিহি আল্লাহর কাছে।
- আপনি তাদের জন্য দুআ করুন, হেদায়েতের জন্য।
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ
"নিশ্চয়ই আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হেদায়েত করতে পারেন না, বরং আল্লাহ যাকে চান হেদায়েত করেন।" (সূরা কাসাস: ৫৬)
"طلب العلم فريضة على كل مسلم" —এই হাদিসটি ইলম অর্জনের ফরজ সম্পর্কে, প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে নয়। প্রতিবেশীর হক সম্পর্কে হাদিস হলো: "فَلَا يُؤْذِ جَارَهُ" —সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।
৫. আপনার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ
(১) নিজের ঘরের উপর গাছের ডাল কাটা
- সাক্ষী রেখে, ইউনিয়ন পরিষদকে জানিয়ে, নিজের সম্পত্তির উপর আসা ডাল কেটে ফেলুন। এটি আপনার শরিয়াহসম্মত হক।
(২) গোবরের স্তূপ
- ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগ দিন।
- স্বাস্থ্য বিভাগ বা প্রশাসনের সহায়তা নিন—এটি শরিয়াহসম্মত, কারণ এটি জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি।
(৩) ঝগড়া এড়ানো
- আপনার বাবা-মাকে বোঝান—ঝগড়ায় শরিক না হতে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَا يَكُونُ لَعَّانًا وَلَا طَعَّانًا وَلَا فَاحِشًا وَلَا بَذِيئًا
"মুমিন কখনো অভিশাপকারী, দোষারোপকারী, অশ্লীল বা গালিগালাজকারী হয় না।" (সুনানে তিরমিজি: ১৯৭৭)
- গালি দেওয়া, মৃত মায়ের মৃত্যু নিয়ে তাচ্ছিল্য করা—এসব কবিরা গুনাহ। আপনার বাবা যেন ধৈর্য ধরেন।
(৪) দুআ
- সকাল-সন্ধ্যা এই দুআ পড়ুন:
اللَّهُمَّ اكْفِنِيهِمْ بِمَا شِئْتَ
"হে আল্লাহ! আপনি যেভাবে চান তাদের থেকে আমাকে রক্ষা করুন।"
- সূরা ফীল, সূরা কাফিরুন, আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পড়ুন।
(৫) পরিবারকে নিয়ে আলাদা থাকার চিন্তা
- যদি সম্ভব হয়, আলাদা বাসায় চলে যাওয়া—এটি সবচেয়ে বড় সমাধান হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
خَيْرُ الْجِيرَانِ عِنْدَ اللَّهِ الْجَارُ الصَّالِحُ
"আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিবেশী হলো সৎ প্রতিবেশী।" (সুনানে তিরমিজি: ১৯৪৪)
৬. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
প্রশ্ন: প্রতিবেশী ৩০ বছর ধরে গোবরের স্তূপ, গাছের ডাল-পাতা, দুর্গন্ধ, প্রস্রাবের ব্যবস্থা না করে জুলুম করছে। আমরা কী করব?
উত্তর:
- সবর ও দুআ করুন—এটি প্রথম কর্তব্য।
- নিজের সম্পত্তির উপর আসা গাছের ডাল কেটে ফেলার অধিকার আপনার আছে (আল-হিদায়া, রাদ্দুল মুহতার)।
- গোবরের স্তূপ ও দুর্গন্ধের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদ, প্রশাসন বা আদালতের সহায়তা নেওয়া শরিয়াহসম্মত—এটি "তাগুতি" নয়, বরং হক আদায়ের বৈধ পথ।
- ঝগড়া, গালি, মৃতকে তাচ্ছিল্য—এসব হারাম। আপনার পরিবারকে ধৈর্য ধরতে বলুন।
- সম্ভব হলে আলাদা বাসায় চলে যান—এটি সর্বোত্তম সমাধান।
- দাওয়াত দিন হিকমতের সাথে, কিন্তু হেদায়েতের মালিক আল্লাহ।
৭. আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
আপনি তালিবুল ইলম। আপনার উচিত স্থানীয় মুফতি বা দারুল ইফতার সাথে সরাসরি পরামর্শ করা। কারণ আপনার পরিস্থিতি জটিল এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে দারুল ইফতা দারুল উলূম দেওবন্দ বা হাটহাজারী মাদ্রাসার ফতোয়া বিভাগ বা বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া-এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।