পিতামাতাকে না জানিয়ে বিয়েতে রাজি হওয়া যাবে কি না?

Family Life · Hanafi

Question No: 5730
Questioner: biswas pstucse
Question Asked: 20 Sep 2026, 04:15 PM
Reviewed & Published: 20 Sep 2026, 05:25 PM
Views: 39
Tokens: 9,903
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

পিতা মাতার একমাত্র সন্তান, মেয়ে।
পিতা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী। মাতা গৃহিনী। আমি আলিয়া মাদ্রাসার প্রভাষক।

পিতার উপার্জন (কিছু কমবেশি হতে পারে):
পেনশন ষোলো হাজার টাকা (মাসিক),
ইমামতি তিন হাজার টাকা (মাসিক),
জমি ত্রিশ হাজার টাকা (বাৎসরিক),
মাহফিলে বক্তা হিসেবে অল্প কিছু উপার্জন রয়েছে তবে পরিমান জানিনা। পিতার জমির পরিমান সোয়া এক কানির বেশি তবে দের কানির কম। পিতার মতে তার সমস্ত কিছু মিলিয়ে মোট সম্পত্তি/ সম্পদের পরিমান আনুমানিক দুই কোটি হবে।

পিতা, মাতা ও আমার নামে ব্যাংকে আলাদা করে টাকা জমা ও বিনিয়োগ করা আছে যেখান থেকে লাভ হিসেবে দেয়া হয়। এই টাকা ব্যাংকে জমাই থাকে। এই টাকা থেকেই বাৎসরিক যাকাত দেয়া হয়। মা এর দশ লক্ষ, আমার আনুমানিক তেইশ লক্ষ, পিতার আনুমানিক আমাদের দুজনের সমপরিমান।

মা এর ঔষধের খরচ বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। পিতার দুই থেকে তিন হাজার টাকা হতে পারে।

আমি মহিলা আলিয়া মাদ্রাসার প্রভাষক, জেনারেল সাবজেক্ট। পরিবারের চাপে চাকরিটি করছি। পিতামাতার মতে এই চাকরিটি তাদের ও আমার বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন। যদিও আমার দৃষ্টিতে তাদের যথেষ্ট সম্পত্তি রয়েছে। যেহেতু বৃদ্ধ বয়সে তাদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব আমার। আমার বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো পাত্র যদি বলে চাকরি ছাড়তে হবে সেখানে আমার পিতামাতা রাজি হন না। কোনো পাত্র যদি আমার কাছে চাকরি ছেড়ে দেয়ার বিষয় বলে আমি আমার পিতামাতাকে চাকরি ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি না জানিয়ে পাত্রের এই শর্তে রাজি হতে পারবো? বাকি সব বিষয় পিতামাতা জানবে, পারিবারিক বিয়ে। আমি এবং পিতা দুজন মিলে বর্তমানে মা এর ঔষধের টাকা দেই। কখনও পিতা ঔষধ কিনে, কখনও আমি কিনি। চাইলে পিতা পুরোটাই বহন করতে পারে। আমি চাকরি ছেড়ে দিলে কি পিতামাতার উপরে অবিচার করা হবে? পিতা যদি কখনও মা এর চিকিৎসায় অবহেলা করে? সম্ভাবনা আছে। অথবা তাদের বৃদ্ধাবস্থায় যদি আমি তাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারি? চাকরি ছেড়ে দেয়ার বেপারে তারা কখনো রাজি না।

আমি কি পাত্রের চাকরি ছেড়ে দেয়ার শর্তে রাজি হবো পিতামাতাকে না জানিয়ে? পাত্রের সব দিক ভালো মনে হচ্ছে, ধার্মিক মনে হচ্ছে।

Answer

প্রশ্ন: পিতামাতাকে না জানিয়ে পাত্রের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার শর্তে রাজি হওয়া যাবে কি না?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, পিতামাতাকে না জানিয়ে পাত্রের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার শর্তে রাজি হওয়া ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। এটি পিতামাতার সাথে প্রতারণা ও অবাধ্যতার (আক-ই-ওয়ালিদাইন-এর খিলাফ) অন্তর্ভুক্ত হবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে চাকরি ছাড়ার এমন শর্তে রাজি হওয়া নিজের ও পিতামাতার হক নষ্ট করার সমতুল্য, যা শরীয়তে নিষিদ্ধ।


বিস্তারিত উত্তর

১. পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার ও পরামর্শের বিধান

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا "আমি মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" — (সূরা আনকাবুত: ৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ "প্রভুর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে নিহিত।" — (তিরমিযী: ১৮৯৯, সহীহ)

ফাতহুল বারীরাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে যে, পিতামাতার সাথে পরামর্শ না করে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যা তাদের উপর প্রভাব ফেলে, তা মাকরূহ তাহরীমী। (রাদ্দুল মুহতার: ৯/৬৮৮)

২. চাকরি ছাড়ার শর্তে রাজি হওয়ার শরীয়তগত বিধান

আপনার প্রশ্নের কয়েকটি দিক রয়েছে:

(ক) পিতামাতাকে না জানিয়ে রাজি হওয়া

এটি জায়েয নয়। কারণ:

  1. প্রতারণা (গিশ) — পিতামাতা মনে করবেন আপনি চাকরি করছেন, অথচ আপনি গোপনে এমন শর্তে রাজি হয়েছেন যা ভবিষ্যতে চাকরি ছাড়ার দিকে নিয়ে যাবে। এটি তাদের সাথে প্রতারণা।

  2. আকদে নিকাহ-এর শর্ত — নিকাহর সময় এমন শর্ত দেওয়া যা শরীয়তসম্মত নয় বা পিতামাতার হক নষ্ট করে, তা শর্তে ফাসিদ (বাতিল শর্ত)। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নিকাহতে এমন শর্ত যা কুরআন-সুন্নাহর খিলাফ, তা বাতিল। (আল-হিদায়া: ২/৩০৬)

  3. পিতামাতার হক নষ্ট — পিতামাতার দেখাশোনা করা সন্তানের উপর ওয়াজিব। যদি চাকরি ছাড়ার কারণে তাদের দেখাশোনা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, তবে তা আক-ই-ওয়ালিদাইন (পিতামাতার অবাধ্যতা)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে, যা কবীরা গুনাহ।

(খ) পাত্রের শর্ত মানা কি জায়েয?

পাত্র যদি বলে "চাকরি ছাড়তে হবে", তবে:

  • যদি চাকরি ছাড়া আপনার পিতামাতার দেখাশোনা ও ভরণপোষণ নিশ্চিত হয় এবং পিতামাতা রাজি হন, তবে শর্তটি মানা যেতে পারে।
  • কিন্তু পিতামাতা রাজি না হলে এবং চাকরি ছাড়লে তাদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, শর্তটি মানা জায়েয নয়। বরং পাত্রকে বোঝানো উচিত যে, চাকরি ছাড়া সম্ভব নয়।

ফাতাওয়া উসমানী-তে উল্লেখ আছে:

"স্ত্রীর চাকরি ছাড়ার শর্ত দেওয়া যদি তার পিতামাতার হক নষ্ট করে, তবে তা শরীয়তসম্মত নয়। আর যদি পিতামাতার হক নষ্ট না হয় এবং উভয় পক্ষের সম্মতিতে হয়, তবে জায়েয।" — (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩০)

(গ) পিতামাতার সম্পত্তি থাকলেও সন্তানের দায়িত্ব

আপনি বলেছেন পিতামাতার যথেষ্ট সম্পত্তি রয়েছে। কিন্তু সম্পত্তি থাকা সন্তানের দায়িত্ব পালন থেকে মুক্ত করে না। কারণ:

  • পিতামাতার সম্পত্তি তাদের নিজেদের; সন্তানের তা ভোগ করার অধিকার নেই তাদের অনুমতি ছাড়া।
  • বৃদ্ধ বয়সে পিতামাতার সেবা করা সন্তানের নৈতিক ও শরীয়তগত দায়িত্ব
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে: "সন্তান যদি পিতামাতার সেবা না করে, অথচ সামর্থ্য রাখে, তবে সে গুনাহগার হবে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৪৫)

৩. আপনার করণীয়

  1. পিতামাতাকে জানিয়ে পরামর্শ করুন — পাত্রের প্রস্তাব ও শর্ত সম্পর্কে পিতামাতাকে অবহিত করুন। তাদের মতামত নিন।

  2. পাত্রকে বোঝান — পাত্রকে বলুন যে, চাকরি ছাড়া আপনার পিতামাতার দেখাশোনা ও ভরণপোষণ ব্যাহত হবে। যদি পাত্র ধার্মিক হন, তিনি বুঝবেন।

  3. শর্তটি লিখিতভাবে নেবেন না — যদি পাত্র চাকরি ছাড়ার শর্ত দেয়, তবে তা নিকাহনামায় লিখবেন না। মুখে বলা শর্তও যদি পিতামাতার হক নষ্ট করে, তবে তা মানা জায়েয নয়।

  4. ইস্তিখারা করুন — সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সালাতুল ইস্তিখারা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে হেদায়াত চান।

  5. মুফতির পরামর্শ নিন — স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

৪. বিশেষ সতর্কতা

  • পিতামাতাকে না জানিয়ে বিয়ে করা — ইসলামে পিতামাতার সম্মতি ছাড়া বিয়ে করা জায়েয নয় (বিশেষত হানাফী মাযহাবে)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি পিতামাতার অবাধ্য হয়ে বিয়ে করে, তার বিয়ে বরকতহীন।" (মুসনাদে আহমাদ: ২/১৮২)
  • চাকরি ছাড়ার শর্ত — যদি পাত্র বলে "চাকরি ছাড়লে তবেই বিয়ে করব", তবে এটি শর্তে ফাসিদ। তবে নিকাহ হয়ে গেলে শর্তটি বাতিল হয়ে যাবে, কিন্তু পাত্রের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হবে।
  • পিতামাতার চিকিৎসা — আপনি ও আপনার পিতা মিলে মায়ের চিকিৎসার খরচ দেন। আপনি চাকরি ছাড়লে যদি পিতা একা বহন করতে না পারেন, তবে তা আক-ই-ওয়ালিদাইন হবে।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|--------| | পিতামাতাকে না জানিয়ে চাকরি ছাড়ার শর্তে রাজি হওয়া | নাজায়েয (প্রতারণা ও অবাধ্যতা) | | পিতামাতার সম্মতিতে চাকরি ছাড়ার শর্ত মানা | জায়েয (যদি তাদের হক নষ্ট না হয়) | | পিতামাতার হক নষ্ট করে চাকরি ছাড়া | হারাম (আক-ই-ওয়ালিদাইন) | | পাত্রের শর্ত নিকাহনামায় লেখা | শর্তে ফাসিদ (বাতিল) | | পিতামাতার সম্পত্তি থাকলে সন্তানের দায়িত্ব | তবুও দায়িত্ব বহাল |

পরামর্শ: পাত্রকে মাহরামের মাধ্যমে বোঝান যে, চাকরি ছাড়া আপনার পিতামাতার দেখাশোনা সম্ভব নয়। যদি তিনি সত্যিই ধার্মিক হন, তিনি বুঝবেন। আর যদি তিনি না বোঝেন, তবে এই বিয়ে আপনার জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। আল্লাহ তা'আলা আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.