তালাক হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে ও না হলে করণীয় কী: চ্যাটের প্রমাণসহ ফতোয়া চাই
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
পড়ার নিয়ম: চ্যাটে আমার নাম "Alone", স্ত্রীর নাম "NB Foyez"। বার্তাগুলো চ্যাটে ইংরেজি হরফে লেখা বাংলা ছিল, এখানে বাংলা হরফে লিখেছি, শব্দ যেমন ছিল তেমনই রেখেছি। ★ চিহ্নিত লাইনগুলো তালাক-সংক্রান্ত। গালিগালাজের অংশ বাদ দিয়ে শুধু প্রাসঙ্গিক অংশ রাখা হয়েছে, দরকার হলে পুরো চ্যাট দেখানো যাবে।
১. প্রেক্ষাপট (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
সন্ধ্যা ৬:৪২, আমি: আর এই সম্পর্ক বেশি দিন যাবে না, লিখে দিলাম।
সন্ধ্যা ৬:৪৬, স্ত্রী: যদি মনে হয় আমাকে তালাক দিয়ে সুখী, তাহলে সেটাই করেন।
২. ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (রাত ১২টার পর)
রাত ১২:১১, আমি: অতটুকু তাওফিক দিক তোকে তালাক দেয়ার। (আল্লাহর কাছে দোয়া/ইচ্ছার কথা, "দিলাম" বলা হয়নি)
রাত ১২:১১, স্ত্রী: কাল রেডি থাকবেন প্লিজ।
রাত ১২:১৩, স্ত্রী: কাল অফিসিয়ালি ক্লোজ করে দিবো আমি।
রাত ১২:১৩, আমি: দেস।
রাত ১২:১৪, আমি: তুই যদি এক বাপের হোস দিস।
রাত ১২:১৫, আমি: এক বাপের হলে দিয়া দেস।
৩. ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মূল ঘটনা
রাত ৮:২২, স্ত্রী: আমি এই দিনগুলা কোনোদিন ভুলবো না জনাব ফয়জুল্লাহ।
রাত ৮:২২, স্ত্রী: কোনো দিন ভুলবো না।
রাত ৮:২২, আমি: গেট আউট।
রাত ৮:২২, স্ত্রী: সব হিসাবের খাতায় তোলা রইলো।
রাত ৮:২২, স্ত্রী: যাবো না।
রাত ৮:২২, আমি: গেট আউট।
রাত ৮:২২, স্ত্রী: পারলে আমাকে গেট আউট করে দেখান।
রাত ৮:২২, আমি: বাসায় চাবি দিয়া চলে যাবি।
রাত ৮:২৩, স্ত্রী: দেখি কার মায়ের দুধের ক্ষমতা কতদূর।
রাত ৮:২৩, আমি: আমি যেন চেহারা না দেখি।
রাত ৮:২৩, স্ত্রী: ওপেনলি কইলাম পারলে আমাকে শেষ করে দেখা।
রাত ৮:২৩, আমি: ৬ লাখ আমার মনে থাকবে।
রাত ৮:২৩, স্ত্রী: মনে নাই চাইলে অন্ধ হইয়া যান।
★ রাত ৮:২৩, আমি: ১ তালাক দিলাম..
রাত ৮:২৩, স্ত্রী: টাকার উপরে মুতি আমি।
রাত ৮:২৪, স্ত্রী: তোরে ভিক্ষা দিলাম।
রাত ৮:২৪, স্ত্রী: ভয় পাইসে আমি।
রাত ৮:২৫, স্ত্রী: তোর ক্ষমতা আমার জানা আছে।
★ রাত ৮:২৫, স্ত্রী: এমন ১ তালাক অনেক দিসোস।
রাত ৮:২৫, স্ত্রী: অফলাইন হলি কেন।
রাত ৮:২৬, স্ত্রী: তুই আমার জামাই নাকি অনেক আগে ওই ছাইড়া রাখসোত।
রাত ৮:২৯, স্ত্রী: গেট আউট ফ্রম মাই লাইফ।
রাত ৮:৩০, আমি: গেট আউট।
★ রাত ৮:৩০, আমি: ২ তালাক
★ রাত ৮:৩০, স্ত্রী: বাকি ২ টা দে।
★ রাত ৮:৩০, স্ত্রী: লাস্ট এর টা।
রাত ৮:৩০, আমি: আমি টাকা পরিশোধ করে সব হিসাব নিবো..
রাত ৮:৩০, স্ত্রী: না।
(মাঝের বার্তা বাদ, ৮:৩১ থেকে ৮:৩৮, ঝগড়া ও গালিগালাজ চলছিল)
রাত ৮:৩৯, স্ত্রী: তালাক শেষ কট / কর।
রাত ৮:৪৩, স্ত্রী: তালাক দে।
রাত ৮:৪৪, স্ত্রী: তুই তালাক শেষ কর।
(মাঝের বার্তা বাদ, ৮:৪৫ থেকে ৮:৫৩। এর মধ্যে ৮:৪৬-এ আমি স্ত্রীকে ব্লক এবং ৮:৪৯-এ আনব্লক করি।)
★ রাত ৮:৫৩, স্ত্রী: ৩ তালাক আমি দিলাম তোরে। (এটি স্ত্রীর লেখা)
রাত ৯:২১, স্ত্রী: তালাক দে আমি আসবো না।
রাত ৯:২১, স্ত্রী: যা কথা দিলাম।
রাত ৯:২২, আমি: সময়ের অপেক্ষা।
★ রাত ৯:২৩, স্ত্রী: আমি নাসিমা আব্দুল মোত্তালিবের মেয়ে আল্লাহর কসম করে বললাম তুই আমার জামাই না আমি ওই বাসাতে ২ মাস থাকবো আমারে তো নক দিবি না আর আমিও তোর কেউ না কারণ তুই তোর দরকারে আমারে ২ তালাক দিসোস।
★ রাত ৯:৩২, স্ত্রী: সেপ্টেম্বর ২০ বিয়ে আর সেপ্টেম্বর ১৭ এ তালাক।
রাত ৯:৩২, স্ত্রী: আমাকে আর দেখতে পাবি না আমাকে আর পেইন দিবি না... আমি এসবের জন্য রেডি ছিলাম না কিন্তু তুই যেহেতু দিসোস আমি এটা নিয়ে কিছু কমো না খালি আমার সাথে কন্টাক্ট করবি না।
৪. ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯:৪২ (আমার লেখা)
★ "একটা কথা বলে রাখা ভালো- আমাদের সম্পর্ক নেই। দক্ষিণগাঁও ৩নং রোড ২ তলায় থাকতে হয়েছিল- ১ টা। গতকাল হলো -২ টা। আশা করি বিষয় গুলো মনে থাকবে। তবুও লানত তোর উপর।"
টীকা: মূল লেখা "Amader Somporko Ney" দুইভাবে পড়া যায়: "আমাদের সম্পর্ক নেই" বা "আমাদের সম্পর্ক নিয়ে"। আর "১ টা / ২ টা" কিসের সংখ্যা এবং দক্ষিণগাঁওয়ের ঘটনা কী, তা আমি মুফতি সাহেবকে সরাসরি জানাব।
৫. ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (রাত ১২:১৯ থেকে ১:৩৮)
রাত ১২:১৯, আমি: এতো তালাক চাওয়া ইসলামে আছে তা আমি জানতাম না।
★ রাত ১২:২০, স্ত্রী: আমি ওইদিন তালাক ইউজ করি নি আম্মাকে আপনি বলেছেন আমাকেও আপনি নিজে তালাক দিসেন পরে আমি বলসি। (বাক্যের অর্থ আংশিক অস্পষ্ট)
রাত ১২:২৮, আমি: আন্দাজে সম্পর্ক শেষ হয়ে সেটায়।
রাত ১২:২৮, স্ত্রী: আমি আমার সব ডকুমেন্টস গুলা ২ মাসের মধ্যে চাই।
রাত ১২:২৯, স্ত্রী: আমার সব বি.বাড়িয়াতে করে দিবেন। আমাদের ডিভোর্স এর পেপার সব।
রাত ১২:৪১, আমি: তুমি যতবার তালাক চাইছো গিনেস বুকে নাম উঠার কথা।
রাত ১:৩৩, স্ত্রী: আমাদের তালাক এর কথা।
রাত ১:৩৫, আমি: এটা বলিস তোর তালাক বেশি দরকার না দেয়া পারলোনা। (অর্থ আংশিক অস্পষ্ট)
রাত ১:৩৮, আমি: মানুষ তালাক না যাইতে দেয় পায়ে পড়ে যায়, আর তুই বলোস আমি ভয় পাইসি।
৬. ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:২৬ থেকে ১২:২৯
স্ত্রী: বাড়ি চলে আসেন। আপনি আপনার রুমে থাকবেন আমি আমার রুমে।
আমি: না আমি আসবো না। আমি কষ্টের বার আর নিতে পারছি না।
স্ত্রী: আপনি আপনার বাড়ি চলে আসেন। আমি কাল বিকালে চলে যাবো বি.বাড়িয়া।
৭. আমার প্রশ্ন
১. ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে আমার লেখা "১ তালাক দিলাম" ও "২ তালাক" (WhatsApp-এ) কি তালাক হিসেবে গণ্য হয়েছে? গণ্য হলে মোট কয়টি? দুটো মেসেজ ৭ মিনিটের ব্যবধানে একই ঝগড়ায় লেখা, এতে গণনায় কোনো পার্থক্য হয় কি?
২. ১৮ সেপ্টেম্বরের আমার বার্তা এবং ১৭ তারিখে স্ত্রীর "এমন ১ তালাক অনেক দিসোস" কথার কারণে কি ১৭ সেপ্টেম্বরের আগেও কোনো তালাক হয়েছে ধরা হবে? তাহলে মোট সংখ্যা কত দাঁড়ায়?
৩. স্ত্রীর লেখা "৩ তালাক আমি দিলাম তোরে" কি শরিয়তে কোনোভাবে গণ্য হয়?
৪. আমার ক্ষেত্রে ইদ্দত কবে শুরু ও কবে শেষ? ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার (রুজু) সুযোগ আছে কি? থাকলে সঠিক নিয়ম কী?
৫. এখন থেকে আমাদের পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে চলা উচিত (একসঙ্গে থাকা, দেখা, কথা বলা, সন্তানদের বিষয়ে যোগাযোগ)? ইদ্দতকালে স্ত্রী কোথায় থাকবেন?
৬. বাংলাদেশের আইন (মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১, ধারা ৭) অনুযায়ী নোটিশ দেওয়ার বিষয়ে ধর্মীয় দিক থেকে আমার কী করা উচিত?
৭. তালাক হয়ে থাকলে আমার করণীয় কী, আর না হয়ে থাকলে করণীয় কী?
৮. আমি নিজে মুফতি সাহেবকে জানাচ্ছি
১. ১৭ সেপ্টেম্বরের আগে কি কখনো মুখে বা লিখে তালাক বলেছিলাম? কবে, কী শব্দে, কী অবস্থায়? ______
২. তালাক লেখার সময় কেমন অবস্থায় ছিলাম: স্বাভাবিক (নরমাল) ছিলাম।
৩. স্ত্রী এখন গর্ভবতী কি না, মাসিক চক্র চলছে কি না: না।
৪. ১৭ সেপ্টেম্বরের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক (সহবাস) হয়েছে কি না: না।
৫. কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা (তাফউইজ): দেওয়া নেই। আমরা কোন মাযহাবের অনুসারী: ______
তিনটা জায়গা এখনো অসম্পূর্ণ:
৮.১: ১৭ সেপ্টেম্বরের আগে তালাক বলেছিলেন কি না, ফাঁকা আছে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাই সত্যিটা লিখুন বা মুফতিকে মুখে বলুন।
৮.২: আপনি শুধু "স্বাভাবিক ছিলাম" লিখেছেন। তালাকের নিয়ত ছিল কি না, সেটা লেখা নেই।
৮.৫: "না" লিখেছেন, আমি ধরেছি সেটা তাফউইজের উত্তর। মাযহাব লেখা নেই।
Answer
তালাক সংক্রান্ত বিস্তারিত ফতোয়া
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। তালাক ইসলামে একটি বৈধ কিন্তু আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বিষয় হলো তালাক।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২০১৮)
আপনার পরিস্থিতি সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নিচে ধাপে ধাপে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হচ্ছে।
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, স্পষ্ট (সরীহ) শব্দে তালাক উচ্চারণ করলে নিয়তের প্রয়োজন হয় না। "তালাক" শব্দটি সরীহ শব্দ। তাই কেউ যদি বলে "তালাক দিলাম" বা "তালাক" — তবে তা পতিত হয়, নিয়ত ছিল কি না তা জিজ্ঞাসা করা হয় না।
আল-হিদায়া: "সরীহ শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত নয়।" রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): "সরীহ শব্দ হলো 'তালাক' এবং এর সমার্থক শব্দসমূহ।"
প্রশ্ন ১: "১ তালাক দিলাম" ও "২ তালাক" — গণ্য হয়েছে কি?
বিশ্লেষণ:
আপনি WhatsApp-এ লিখেছেন:
- রাত ৮:২৩: "১ তালাক দিলাম.."
- রাত ৮:৩০: "২ তালাক"
এখানে দুটি পৃথক তালাকের বাক্য। প্রথমটি "১ তালাক দিলাম" — এটি এক তালাকে রাজয়ী (প্রথম তালাক)। দ্বিতীয়টি "২ তালাক" — এটি দ্বিতীয় তালাক।
হানাফি মাযহাবের নিয়ম:
একই মজলিসে (একই বৈঠকে) একাধিক তালাক দিলে তা আলাদা আলাদা তালাক হিসেবে গণ্য হয়। এটি হানাফি মাযহাবের সুপ্রতিষ্ঠিত মাসআলা।
আল-হিদায়া: "একই মজলিসে এক, দুই বা তিন তালাক বললে প্রত্যেকটি পৃথকভাবে পতিত হয়।" রাদ্দুল মুহতার: "এক মজলিসে তিন তালাক বললে তিনটিই পতিত হয়, এবং স্ত্রী মুগাল্লাযা (তিন তালাকে বায়েন) হয়ে যায়।"
৭ মিনিটের ব্যবধানের প্রভাব:
৭ মিনিটের ব্যবধান একই মজলিস হিসেবে গণ্য হবে, কারণ:
- আপনি তখনো একই ঝগড়ার মধ্যে ছিলেন
- মাঝখানে কোনো Reconciliation বা صلح হয়নি
- উভয় বার্তা একই প্রসঙ্গে
তবে — হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, একই মজলিসে একাধিক তালাক বললে প্রত্যেকটি আলাদা তালাক হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ:
| ক্রম | বার্তা | তালাক সংখ্যা | মোট | |------|--------|-------------|-----| | ১ | "১ তালাক দিলাম" | ১ | ১ | | ২ | "২ তালাক" | ১ | ২ |
সুতরাং আপনার দুইটি তালাকে রজয়ী পতিত হয়েছে। (তৃতীয়টি এখনো পতিত হয়নি, কারণ আপনি "৩ তালাক" লেখেননি।)
ফতোয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): "একই মজলিসে একাধিক তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলে প্রত্যেকটি পৃথক তালাক হিসেবে গণ্য হবে।"
প্রশ্ন ২: ১৮ সেপ্টেম্বরের বার্তা ও স্ত্রীর "এমন ১ তালাক অনেক দিসোস" — পূর্বের তালাক?
ক. স্ত্রীর "এমন ১ তালাক অনেক দিসোস" (১৭ সেপ্টেম্বর, রাত ৮:২৫):
এই বাক্যটি পূর্বের তালাকের প্রমাণ নয়। কারণ:
- এটি স্ত্রীর অভিযোগ/অনুযোগ — "তুমি এমন ১ তালাক অনেকবার দিয়েছ" — এটি অতীতের ঘটনার দাবি।
- তবে — এটি একা প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট নয়। শরিয়তে তালাক প্রমাণের জন্য সাক্ষী বা স্বীকৃতি প্রয়োজন।
- আপনি নিজে প্রশ্ন ৮.১-এ লিখেছেন: "১৭ সেপ্টেম্বরের আগে কি কখনো মুখে বা লিখে তালাক বলেছিলাম? ______" — এই ঘরটি আপনি ফাঁকা রেখেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ: আপনি যদি সত্যিই আগে কখনো তালাক দিয়ে থাকেন, তবে তা আলাদা তালাক হিসেবে গণ্য হবে। আপনি মুফতিকে সত্য কথা জানান। গোপন করলে ভুল হবে।
খ. ১৮ সেপ্টেম্বরের আপনার বার্তা:
"একটা কথা বলে রাখা ভালো- আমাদের সম্পর্ক নেই। দক্ষিণগাঁও ৩নং রোড ২ তলায় থাকতে হয়েছিল- ১ টা। গতকাল হলো -২ টা।"
এই বার্তায় "১ টা" ও "২ টা" — আপনি নিজেই লিখেছেন এটি অস্পষ্ট। আপনি মুফতিকে সরাসরি জানাবেন এগুলোর অর্থ কী। যদি "১ টা" ও "২ টা" বলতে তালাকের সংখ্যা বোঝানো হয়, তবে এটি পূর্বের তালাকের স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তবে — হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, অস্পষ্ট (কিনায়া) শব্দে তালাক পতিত হতে নিয়ত বা প্রমাণ প্রয়োজন। "১ টা" বা "২ টা" — এটি সরীহ তালাকের শব্দ নয়। তাই এটি একা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, যদি না আপনি নিয়ত করেন বা স্পষ্ট করেন।
রাদ্দুল মুহতার: "কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত অথবা পরিস্থিতির প্রমাণ প্রয়োজন।"
সিদ্ধান্ত:
- যদি আপনি ১৭ সেপ্টেম্বরের আগে কখনো স্পষ্টভাবে তালাক না দিয়ে থাকেন — তবে মোট তালাক ২টি (১৭ সেপ্টেম্বরের দুটি)।
- যদি আগে কখনো স্পষ্ট তালাক দিয়ে থাকেন — তবে সেই সংখ্যা যোগ হবে। আপনি মুফতিকে সত্য জানান।
প্রশ্ন ৩: স্ত্রীর লেখা "৩ তালাক আমি দিলাম তোরে" — গণ্য হবে কি?
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি:
স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা নেই, যদি না:
- কাবিননামায় তাফউইজে তালাক (তালাকের ক্ষমতা অর্পণ) দেওয়া থাকে, অথবা
- স্বামী তাকে স্পষ্টভাবে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করেন।
আপনি প্রশ্ন ৮.৫-এ লিখেছেন: "কাবিননামায় স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা (তাফউইজ): দেওয়া নেই।"
সুতরাং:
স্ত্রীর লেখা "৩ তালাক আমি দিলাম তোরে" — এটি শরিয়তে কোনো তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ:
- স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা নেই
- এটি স্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি অভিব্যক্তি, যা শরিয়তে তালাক পতিত করে না
- এটি শুধু তালাকের দাবি — যা স্বামীর তালাকের সাথে সম্পর্কিত নয়
আল-হিদায়া: "তালাক দেওয়ার অধিকার কেবল স্বামীর। স্ত্রী তালাক দিতে পারে না, যদি না তাকে ক্ষমতা দেওয়া হয়।" ফতোয়া আলমগিরি: "স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা নেই।"
তবে — স্ত্রী যদি বলে "আমি তালাক দিলাম" এবং স্বামী তা সমর্থন করে বা স্বীকৃতি দেয়, তবে তা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আপনি তা সমর্থন করেননি।
সুতরাং স্ত্রীর "৩ তালাক" — এটি কোনো তালাক নয়।
প্রশ্ন ৪: ইদ্দত কবে শুরু ও কবে শেষ? রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া) সুযোগ আছে কি?
ইদ্দতের সূত্রপাত:
আপনার দুই তালাকে রাজয়ী (প্রথম ও দ্বিতীয় তালাক) পতিত হয়েছে। তালাকে রাজয়ী-এর ইদ্দত তালাকের সময় থেকেই শুরু হয়।
ইদ্দতের সময়কাল:
- স্ত্রী যদি গর্ভবতী না হন এবং মাসিক চক্র চলছে — তবে তিন মাসিক পর্যন্ত ইদ্দত।
- স্ত্রী যদি গর্ভবতী হন — তবে সন্তান জন্ম পর্যন্ত।
- স্ত্রী যদি মাসিক বন্ধ হয়ে যায় (মেনোপজ) — তবে তিন মাস।
- আপনি লিখেছেন: "স্ত্রী এখন গর্ভবতী কি না, মাসিক চক্র চলছে কি না: না।"
সুতরাং: স্ত্রীর মাসিক চক্র চলছে না — এর অর্থ হতে পারে:
- তিনি গর্ভবতী নন কিন্তু মাসিক বন্ধ (বয়সজনিত বা অন্য কারণে) — তবে তিন মাস ইদ্দত
- তিনি গর্ভবতী — তবে সন্তান জন্ম পর্যন্ত ইদ্দত
আপনি মুফতিকে জানান: স্ত্রীর মাসিক চক্র কেন বন্ধ — গর্ভাবস্থা, বয়স, না অন্য কারণ?
ইদ্দতের হিসাব:
- তালাকের তারিখ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ইদ্দত শুরু: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (তালাকের সময় থেকেই)
- ইদ্দত শেষ:
- যদি মাসিক চক্র চলছে: তিন মাসিক (প্রায় ৩ মাস)
- যদি গর্ভবতী: সন্তান জন্ম
- যদি মাসিক বন্ধ: তিন মাস (১৭ ডিসেম্বর ২০২৬)
রুজু (ফিরিয়ে নেওয়া) সুযোগ:
হ্যাঁ, তালাকে রাজয়ী-তে ইদ্দতের মধ্যে রুজু করার সুযোগ আছে।
আল-হিদায়া: "তালাকে রাজয়ী-তে ইদ্দতের মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে, নতুন বিবাহের প্রয়োজন নেই।"
রুজুর সঠিক নিয়ম:
- মুখে বলা: "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" বা "রুজু করলাম"
- লিখে বলা: চিঠি, মেসেজ ইত্যাদিতে লিখলে
- সাক্ষী রাখা: দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে রুজু করা উত্তম
- সহবাস: ইদ্দতের মধ্যে সহবাস করলে রুজু হয়ে যায় (হানাফি মাযহাব)
গুরুত্বপূর্ণ: রুজু করার পর তালাকের সংখ্যা কমে না। অর্থাৎ আপনার দুই তালাক পতিত হয়েছে, রুজু করলে আপনি দুই তালাকের মালিক থাকবেন। পরবর্তীতে আরেকটি তালাক দিলে তিন তালাক পূর্ণ হবে এবং স্ত্রী মুগাল্লাযা হয়ে যাবেন।
রাদ্দুল মুহতার: "রুজু করলে তালাকের সংখ্যা বাতিল হয় না, বরং তা বহাল থাকে।"
প্রশ্ন ৫: এখন থেকে পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে চলা উচিত?
ইদ্দতকালে:
-
স্ত্রী কোথায় থাকবেন: ইদ্দতকালে স্ত্রী স্বামীর ঘরেই থাকবেন। এটি ইদ্দতের বিধান।
আল-হিদায়া: "তালাকে রাজয়ী-তে স্ত্রী স্বামীর ঘরে ইদ্দত পালন করবে।"
-
দেখা-সাক্ষাৎ: ইদ্দতকালে স্বামী-স্ত্রী দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবেন, তবে সহবাস করতে পারবেন না (যদি রুজু না করেন)। কথা বলা, দেখা করা — জায়েজ।
-
সন্তানদের বিষয়ে: সন্তানদের দেখাশোনা, ভরণপোষণ — সবই চালু থাকবে। সন্তানদের বিষয়ে যোগাযোগ করতে পারবেন।
-
রুজু না করলে: ইদ্দত শেষ হলে স্ত্রী বায়েন হয়ে যাবেন। তখন নতুন বিবাহ ছাড়া সম্পর্ক পুনঃস্থাপন সম্ভব নয়।
ইদ্দতের পর:
- রুজু করলে: স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পুনরায় একসঙ্গে থাকতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন — দুই তালাক পতিত।
- রুজু না করলে: স্ত্রী বায়েন। নতুন বিবাহ ছাড়া সম্পর্ক নেই।
প্রশ্ন ৬: বাংলাদেশের আইন (মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১, ধারা ৭) ও ধর্মীয় দিক
ধর্মীয় দিক:
শরিয়তে তালাক মুখে বা লিখে বললেই পতিত হয়। নোটিশ বা রেজিস্ট্রেশন তালাক পতিত হওয়ার জন্য শর্ত নয়।
ফতোয়া উসমানি: "তালাক পতিত হওয়ার জন্য নোটিশ বা সরকারি রেজিস্ট্রেশন শর্ত নয়। তালাকের শব্দ উচ্চারণ বা লিখলেই তা পতিত হয়।"
বাংলাদেশের আইন:
মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১, ধারা ৭ অনুযায়ী:
- তালাকের নোটিশ ইউনিয়ন পরিষদ/সিটি কর্পোরেশনে দিতে হবে
- ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়
- এই ৯০ দিনের মধ্যে সালিশ হয়
ধর্মীয় দিক থেকে আপনার করণীয়:
- তালাক পতিত হয়েছে (শরিয়তে)
- আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উত্তম — যাতে ভবিষ্যতে জটিলতা না হয়
- তবে আইনি প্রক্রিয়া ধর্মীয় তালাকের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না
গুরুত্বপূর্ণ: আপনি যদি ইদ্দতের মধ্যে রুজু করতে চান, তবে আইনি নোটিশ দেওয়ার আগে রুজু করুন। রুজু করলে তালাক রাজয়ী থেকে যায় এবং সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়।
প্রশ্ন ৭: তালাক হয়ে থাকলে করণীয়, না হয়ে থাকলে করণীয়
যদি তালাক হয়ে থাকে (যা আমাদের বিশ্লেষণে হয়েছে):
- ইদ্দত পালন: স্ত্রী ইদ্দত পালন করবেন (স্বামীর ঘরে)
- রুজু বা বিচ্ছেদ: ইদ্দতের মধ্যে রুজু করার সুযোগ আছে। যদি রুজু না করেন, ইদ্দত শেষে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত।
- ভরণপোষণ: ইদ্দতকালে স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীর দায়িত্ব।
- সন্তানদের ভরণপোষণ: সন্তানদের ভরণপোষণ সবসময় স্বামীর দায়িত্ব।
- আইনি প্রক্রিয়া: ইউনিয়ন পরিষদ/সিটি কর্পোরেশ