মাস্তুরাত জামাতে যাওয়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মতবিরোধঃ স্বামীর কথা না মানলে কি গোনাহ হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার নতুন বিয়ে হয়েছে প্রায় ৩ মাস হবে। আমার যাওজ আমাকে মাস্তুরাত জামাতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। এখন আমি কোথাও গিয়ে এভাবে থাকার অভ্যাস নেই। তাই যেতে না করি। তো তিনি বলছেন যে উনাকে কেনো বিয়ে করেছি তাহলে তিনি আমার উপর নারাজ। এখন আমার কি গুনাহ হবে? আমার করণীয় কি?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله والصلاة والسلام على سيدنا محمد رسول الله وعلى آله وأصحابه أجمعين
উত্তর:
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার স্বামী আপনাকে মাস্তুরাত জামাতে (মহিলাদের ইসলামী সমাবেশ/ইজতিমা) নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, কিন্তু আপনার সেখানে যাওয়ার অভ্যাস নেই বলে আপত্তি করছেন। এতে আপনার স্বামী নারাজ হয়েছেন এবং আপনি জানতে চাচ্ছেন—আপনার কি গুনাহ হবে এবং আপনার করণীয় কী?
বিশ্লেষণ:
ইসলামে স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর উপর জরুরী। স্বামীর বৈধ (জায়েয) আদেশ মানা স্ত্রীর জন্য জরুরী যদি স্বামীর আদেশ শরীয়তসম্মত হয় এবং তাতে কোনো ক্ষতি না থাকে।
হানাফি ফিকহের আলোকে বিধান:
১. স্বামীর আনুগত্যের সীমা: রদ্দুল মুহতার (রাদ্দুল মুহতার) গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ওয়াজিব।
২. মাস্তুরাত জামাতে যাওয়া: মাস্তুরাত জামাতে যাওয়ার জন্য স্বামীর আদেশ মান্য করা জরুরী। যেহেতু সেখানে কোনো গুনাহের কাজ না হয়, পর্দা রক্ষিত থাকে, তাই স্বামীর আদেশ মান্য করা জরুরী।
৩. স্বামীর নারাজি: স্বামীর নারাজি হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাদিসে এসেছে, "যে স্ত্রী স্বামীর নারাজি অবস্থায় রাত কাটায়, তার উপর ফেরেশতারা লানত করে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪১৫৮; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১৬১) আপনার করণীয়:
১. স্বামীর সাথে কথা বলুন: আপনার স্বামীর সাথে নরম ভাষায় কথা বলুন। তাকে বোঝান যে, আপনার এখনো মাস্তুরাত জামাতে যাওয়ার অভ্যাস হয়নি এবং ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিতে চান। ইসলামে স্ত্রীর মতামত নেওয়া এবং পরামর্শ করা উৎসাহিত।
২. সমঝোতার চেষ্টা করুন: আপনি যদি মনে করেন মাস্তুরাত জামাতে যাওয়া আপনার জন্য কষ্টকর, তাহলে স্বামীকে বলুন—আপনি ধীরে ধীরে প্রস্তুত হবেন। অথবা আপনি যদি যেতে রাজি হন, তাহলে শর্ত হিসেবে বলুন—যেন সেখানে পর্দা রক্ষিত থাকে এবং কোনো গুনাহের কাজ না হয়।
৩. স্বামীর নারাজি এড়িয়ে চলুন: স্বামীর নারাজি এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। তাই আপনি যদি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন এবং তার নারাজি দূর করার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করুন।
৪. গুনাহের বিষয়: মাস্তুরাত জামাতে না যাওয়ার কারণে আপনার গুনাহ হবে না, কারণ এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তবে স্বামীর নারাজি থাকা অবস্থায় থাকা থেকে বিরত থাকুন। যদি স্বামী নারাজ থাকেন এবং আপনি তা দূর করার চেষ্টা না করেন, তাহলে সেটা গুনাহের কারণ হতে পারে।
কুরআন ও হাদিসের দলিল:
১. আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯) — এখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সদ্ব্যবহার ও সমঝোতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২. রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১৬২)
৩. ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর মতে, স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ফরজ নয়, তবে উত্তম। (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪৪)
মোটকথা:
আপনার মাস্তুরাত জামাতে না যাওয়ার কারণে গুনাহ হবে না, তবে স্বামীর নারাজি দূর করার চেষ্টা করা আপনার কর্তব্য। স্বামীর সাথে কথা বলে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করুন। যদি সম্ভব হয়, তাহলে মাস্তুরাত জামাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন, কারণ এতে স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জিত হবে এবং দ্বীনি পরিবেশে থাকার সুযোগও পাবেন। তবে যদি সত্যিই আপনার জন্য কষ্টকর হয়, তাহলে স্বামীকে বোঝান এবং তার নারাজি দূর করার চেষ্টা করুন।
والله أعلم بالصواب