তালাকের পর অনুশোচনা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক ঘটনা পড়ে আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। আল্লাহ তায়ালা আপনার ধৈর্য ও সবরের বিনিময়ে আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
তালাকের বৈধতা প্রসঙ্গে
আপনার বিবরণ অনুযায়ী, আপনার স্বামী আপনাকে তালাক দিয়েছেন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, স্বামীর পক্ষ থেকে তালাকের ঘোষণা দেওয়া হলে তা কার্যকর হয়ে যায়। যেহেতু আপনি তালাকের কাগজ পেয়েছেন এবং এটি বৈধভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তাই আপনার তালাক কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে।
আপনার অনুশোচনা ও দায়িত্ববোধ
আপনি মনে করছেন যে আপনি নিজেই সংসার ভাঙার জন্য দায়ী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য উভয় পক্ষের চেষ্টা প্রয়োজন। আপনার বিবরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে:
১. আপনার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ও স্বামী আপনাকে নিয়মিত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করতেন ২. আপনাকে গালিগালাজ করা হতো ৩. আপনার পরিবার সম্পর্কে কটূক্তি করা হতো ৪. আপনার শ্বাশুড়ি আপনার গহনা কেড়ে নিয়েছিলেন ৫. আপনার স্বামী আপনাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছেন (থাপ্পড় মারা)
ইসলামে স্ত্রীর প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম那人 যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম, আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)
মাফ চাওয়া প্রসঙ্গে
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন যে আপনার মাফ চাওয়া উচিত কিনা। এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা দরকার:
১. আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা: আপনি যদি মনে করেন যে আপনি কোনো গুনাহ করেছেন, তবে আল্লাহর কাছে তওবা করুন। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
২. স্বামীর কাছে মাফ চাওয়া: আপনি ইতিমধ্যে তার দোকানে গিয়ে সরি বলার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তিনি সময় দেননি। আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন। এর বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই।
৩. নিজেকে দোষারোপ না করা: আপনি সংসার ভাঙার জন্য একমাত্র দায়ী নন। আপনার স্বামী ও তার পরিবারের আচরণই মূলত এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, স্ত্রীর ওপর নির্যাতন করা স্বামীর জন্য বৈধ নয়। যদি স্বামী স্ত্রীর প্রতি খারাপ আচরণ করে এবং স্ত্রী তা সহ্য করতে না পারে, তবে স্ত্রীর জন্য তালাক চাওয়া জায়েয আছে।
আপনার করণীয়
১. আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন: আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)
২. ধৈর্য ধারণ করুন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ
"মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক! তার সকল কাজই কল্যাণকর।" (মুসলিম: ২৯৯৯)
৩. নামাজ ও দোয়া চালিয়ে যান: আপনার নামাজ, রোজা ও দোয়া চালিয়ে যান। আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।
৪. আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখুন: আপনার পরিবারের সাথে সময় কাটান, তাদের সাথে কথা বলুন।
৫. আত্ম-উন্নয়নে মনোযোগ দিন: নিজের শিক্ষা, কর্মজীবন বা সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করুন।
ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাবের আলোকে, তালাকের পর ইদ্দত (তিন মাসিক বা তিন মাস) পালন করা আবশ্যক। ইদ্দত শেষে আপনি পুনরায় বিবাহ করতে পারবেন। তবে এই সময়ে নিজের ইবাদত, তওবা ও আত্ম-উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
উপসংহার
প্রিয় বোন, আপনি সংসার ভাঙার জন্য একমাত্র দায়ী নন। আপনার স্বামী ও তার পরিবারের আচরণই মূলত এই পরিণতির কারণ। আপনি আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তবে নিজেকে অতিরিক্ত দোষারোপ করবেন না।
আল্লাহ তায়ালা আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দান করুন এবং আপনার ভবিষ্যৎ জীবনকে সুন্দর করুন। আমিন।