ঘরের কাজ করা কি স্ত্রীর উপর ফরজ?

Family Life · Hanafi

Question No: 3321
Questioner: Abdullah Farhan
Question Asked: 31 Jul 2026, 11:08 PM
Reviewed & Published: 31 Jul 2026, 11:36 PM
Views: 47
Tokens: 6,886
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ঘর গৃহস্থালির কাজ করার ক্ষেত্রে একজন স্ত্রী হিসেবে একজন মেয়ের উপর শরীয়ত নির্ধারিত দায়িত্বের সীমারেখা কতটুকু??

সে কি নিজে নিজে কাজ করবে নাকি কাজের তদারকি করবে নাকি কিছুই করবে না?? নাকি ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন।

একজন আলেমের থেকে শুনেছি মহিলাদের উপর ঘরের কাজ নিজে করা ফরয না। কাজটা করিয়ে নেয়া বা তদারকি করা তার দায়িত্ব। স্ত্রী যদি রান্নাবান্না না করতে চায় তাহলে স্বামী কাজের লোক রাখবে বা বাহিরে থেকে কিনে নিয়ে এসে খাওয়াবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কথা কতটুকু প্রযোজ্য। যেখানে সাধারণত বাড়ির মহিলারাই প্রায় অধিকাংশ কাজ নিজেরাই করেন।

আর স্ত্রীকে কি স্বামী কোন কাজ করার হুকুম করতে পারবে নাকি তাও পারবে না? আর স্ত্রী যদি শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোন কাজ করতে আগ্রহী না হয় তাহলে স্বামীর করণীয় কী?

Answer

উত্তর:
গৃহস্থালির কাজে স্ত্রীর করণীয় সম্পর্কে শরীয়তের বিধান এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগ — উভয় দিকই পরিষ্কার করে উপস্থাপন করা হলো।


১. গৃহস্থালির কাজ স্ত্রীর উপর ফরজ নয় — হানাফি ফিকহের মূলনীতি

হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, ঘরের কাজ করা স্ত্রীর উপর ফরজ বা ওয়াজিব নয়। যেমন:

  • রাদ্দুল মুহতার (৫/২৬৯)-এ ইবনে আবিদীন রহ. লিখেছেন:

    "স্ত্রীর উপর স্বামীর খিদমত করা (ঘরের কাজ করা) ওয়াজিব নয়। কেননা নিকাহের চুক্তিতে এটি শর্ত থাকে না; বরং স্ত্রীর উপর ওয়াজিব হলো স্বামীর কাছে নিজেকে সোপর্দ করা, আর স্বামী তার ভরণপোষণের দায়িত্ব বহন করবে।"

  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৫৪৭)-এ আছে:

    "স্ত্রীকে ঘরের কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না; যেমন রুটি বানানো, ময়দা মাখা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া ইত্যাদি। কেননা এগুলো স্ত্রীর উপর ওয়াজিব নয়।"

  • ইমাম কাসানী রহ. বাদাইউস সানাই (৪/৩০)-এ বলেন:

    "স্বামীর জন্য স্ত্রীকে রুটি বানানো বা রান্নার নির্দেশ দেওয়া জায়েয নয়, যদি না সে নিজে রাজি হয় বা বিবাহের সময় শর্ত থাকে।"


২. ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত

ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে প্রসিদ্ধ মত হলো, স্ত্রীর উপর শুধু সন্তানকে দুধপান করানো পর্যন্ত ওয়াজিব, ঘরের অন্য কোনো কাজ নয়।
তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেছেন, ঘরের কাজ করা মুস্তাহাব (উত্তম) — ফরজ নয়। (দ্দুররুল মুখতার, ৩/৫৯৯; ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৫৪৭)

ইমাম সারাখসী রহ. মাবসুত (৫/১৯৩)-এ বলেন:

"ঘরের কাজ স্ত্রীর উপর এমন কোনো হক নয় যা তাকে বাধ্য করা যায়। তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে মহিলারা নিজ ঘরের কাজ করতেন, তাই এটি উত্তম ও বরকতময়।"


৩. কুরআন ও হাদিসের দলিল

কুরআন থেকে:

  • সূরা আত-তালাক, আয়াত ৭:

    "যার সামর্থ্য আছে সে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করবে; আর যার রিজিক সীমিত করা হয়েছে সে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকে খরচ করবে।"
    এ আয়াতে স্বামীর উপর স্ত্রীর খরচের দায়িত্ব চাপানো হয়েছে, ঘরের কাজের দায়িত্ব নয়।

হাদিস থেকে:

  • সহিহ বুখারী (৫২২৫) ও সহিহ মুসলিম (১৪৪২):
    ফাতিমা রাযি. আলী রাযি.-এর কাছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট কাজের বণ্টনের কথা জানাতে গেলে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

    "তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে যা চাইতে এসেছ তা না-ই চাইলে; বরং ঘুমের আগে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার বলো — এটা তোমার জন্য খাদেমের চেয়ে উত্তম।"
    হাদিসটি প্রমাণ করে, ঘরের কাজ স্ত্রীর উপর ফরজ ছিল না, কেননা রাসূল ﷺ ফাতিমাকে কাজ বণ্টন না করে জিকিরের নির্দেশ দেন।

  • সুনানে আবু দাউদ (১৪৪৫):
    আসমা বিনতে আবু বকর রাযি. বলেন, "আমি যুবাইর রাযি.-এর ঘরের কাজ করতাম, ঘোড়ার দানাও সামলাতাম।"
    এতে বুঝা যায়, মহিলারা স্বেচ্ছায় কাজ করতেন, বাধ্য হয়ে নয়।


৪. আলেমের বক্তব্যের মূল্যায়ন

আপনি যে আলেমের কথা শুনেছেন — "মহিলাদের উপর ঘরের কাজ নিজে করা ফরয নয়; কাজ করিয়ে নেওয়া বা তদারকি করা তার দায়িত্ব" — এটি বিশুদ্ধ হানাফি ফিকহের মূলনীতির সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। তবে এখানে "দায়িত্ব" শব্দটি দ্বারা আরাম ও মুখপাত্র বোঝানো হয়েছে, না হয় কোনো কঠোর বাধ্যবাধকতা। অর্থাৎ স্ত্রীর উপর ঘরের কাজের ওয়াজিব নয়, তবে যদি সে কাজ না করে, তাহলে স্বামী কাজের লোক রাখবে বা বাইরে থেকে খাবার এনে দেবে।


৫. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ

বাংলাদেশে সাধারণত ঘরের মহিলারাই রান্নাবান্না ও গৃহস্থালির কাজ নিজেরাই করেন। এটি শরীয়তের পরিপন্থী নয়; বরং এটি মুস্তাহাব ও সামাজিক রীতিনীতি। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এটি স্ত্রীর ফরজ দায়িত্ব হয়ে গেছে। শরীয়তের বিধান কাল, দেশ ও সমাজভেদে পরিবর্তিত হয় না। যেমন:

  • ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৪৩)-এ মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম লিখেছেন:

    "বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের মতো দেশে স্ত্রীগণ ঘরের কাজ করে থাকেন, এটা জায়েয ও প্রশংসনীয়। কিন্তু এর উপর ভিত্তি করে স্ত্রীকে ঘরের কাজে বাধ্য করা জায়েয নয়। কেননা শরীয়তের দৃষ্টিতে ঘরের কাজ স্ত্রীর উপর ফরজ নয়; এটি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভালোবাসার বিষয়।"

  • আহসানুল ফাতাওয়া (৭/৩৩৭)-এ আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন:

    "বাড়ির কাজ স্ত্রীর জন্য ফরজ নয়, কিন্তু নবীজী ﷺ-এর যুগ থেকে ইসলামি সমাজে স্ত্রীগণ ঘরের কাজ করতেন। তাই নিজে কাজ করা উত্তম, আর না করলে স্বামী নিরুপায় হয়ে কাজের লোক রাখবে।"


৬. স্বামী কি স্ত্রীকে কাজের হুকুম দিতে পারবে?

না, স্বামী ঘরের কাজ করার জন্য স্ত্রীকে বাধ্য করতে পারবে না। যেমন:

  • ফাতাওয়া আলমগীরি (১/৫৪৭) ও রাদ্দুল মুহতার (৫/২৬৯)-এ স্পষ্ট:

    "স্বামী যদি স্ত্রীকে রুটি বানানো, গোশত ভাজা, ঘর ঝাড়ু দেওয়ার আদেশ করে, তা পালন করা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব নয়; কেননা এটি স্ত্রীর হকের অন্তর্ভুক্ত নয়।"

তবে কিছু কিছু হানাফি বর্ননায় বলা হয়েছে, ঘরের কাজ স্ত্রীর উপর মুস্তাহাব। সুতরাং স্বামী জোর করতে পারবে না, কিন্তু স্ত্রীর উচিত স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও সন্তুষ্টির জন্য কাজে সহযোগিতা করা।


৭. স্ত্রী কাজ না করলে স্বামীর করণীয় কী?

  • যদি স্ত্রী শারীরিকভাবে সক্ষম হয়েও কাজ করতে আগ্রহী না হয়, তাহলে শরীয়তের নির্দেশ অনুযায়ী স্বামী:
    ১. কাজের লোক রাখবে, অথবা
    ২. বাইরে থেকে রান্না করা খাবার কিনে এনে স্ত্রীকে খাওয়াবে।
    কেননা স্বামীর উপর স্ত্রীর খোরপোষ (ভরণপোষণ) ফরজ। (সূরা তালাক: ৭; রাদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৮)

  • স্বামী আর্থিকভাবে সক্ষম না হলে স্ত্রীকে বোঝাতে হবে যে, ইসলামে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি স্ত্রী তবুও কাজ না করে, তাহলে তালাক বা বিচ্ছেদের সুপারিশ নেই; বরং ধৈর্য ও সদিচ্ছার সাথে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। (বাহিশতি জেওর, বিবাহ অধ্যায়; আসিরে মুফতিয়ান)


৮. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

| বিষয় | হানাফি ফিকহের বিধান | |--------|----------------------| | ঘরের কাজ স্ত্রীর উপর ফরজ? | না, ফরজ নয় | | কাজ করা উত্তম? | হ্যাঁ, মুস্তাহাব ও সামাজিক রীতি | | স্বামী কী করতে পারবে? | কাজের লোক রাখবে বা খাবার বাইরে থেকে আনবে | | স্ত্রীকে কাজের হুকুম দেওয়া? | স্বামী জোর করতে পারবে না | | বাংলাদেশে প্রয়োগ? | সামাজিক প্রেক্ষাপটে মুস্তাহাব, তবে ফরজ নয় |

মূল কথা: ইসলামে স্ত্রীর উপর ঘরের কাজ বাধ্যতামূলক নয়, বরং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পরিবারের স্বার্থে একে অপরকে সাহায্য করা উত্তম। বাংলাদেশের মতো সমাজে স্ত্রীগণ নিজেদের ইচ্ছায় ও সওয়াবের নিয়তে কাজ করেন, যা শরীয়তসম্মত। তবে এটাকে ফরজ মনে করা ভুল। স্ত্রী অস্বীকৃতি জানালে স্বামী জোর খাটাতে পারবে না, বরং খরচের দায়িত্ব পালন করবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীন বুঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। (আমীন)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.