সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনে সমতা বাধ্যতামূলক। এক সন্তানকে সব সম্পদ লিখে দেওয়া হারাম ও জুলুম।
Family Life · Hanafi
Question
উস্তায,আমার নানুর ৪ জন সন্তান। তিনি তার সম্পদ ১ জন সন্তানকে লিখে দিবেন বলে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন। কিছু অংশ তার বড় ছেলেকে লিখে দিয়েছেনও।বাকি সম্পদ কয়েকদিনের মধ্যেই তার বড় সন্তানকে লিখে দিবেন। এমতাবস্থায় তার বাকি সন্তানদের করণীয় কি?তারা কি আইনী সহায়তা নিবেন?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার নানুর বিষয়টি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী শরিয়ত সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার ও সমতার নির্দেশ দিয়েছে। পক্ষপাতমূলকভাবে একজন সন্তানকে সবকিছু দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা জুলুম ও গুনাহের কাজ।
১) পবিত্র কুরআন ও হাদীসের দলীল
কুরআন:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ
"হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষী হও..." (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ
"আর তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
হাদীস:
হযরত নু'মান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, তার পিতা তাকে একটি দান করেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন:
أَلَكَ وَلَدٌ سِوَاهُ؟ قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: فَأَعْطَيْتَ كُلَّ وَلَدٍ مِثْلَ مَا أَعْطَيْتَ هَذَا؟ قَالَ: لَا. قَالَ: فَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ
"তোমার কি অন্য সন্তানও আছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। তখন নবী (সা.) বললেন: তুমি কি প্রত্যেক সন্তানকে এর মতো দিয়েছ? তিনি বললেন: না। তখন তিনি বললেন: তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।"
(সহীহ বুখারী: ২৫৮৭, সহীহ মুসলিম: ১৬২৩)
আরেক বর্ণনায় আছে:
لَا أَشْهَدُ عَلَى جَوْرٍ
"আমি জুলুমের সাক্ষী হতে পারি না।" (সহীহ মুসলিম: ১৬২৩)
২) হানাফী ফিকহের রায়
ফাতাওয়া হিন্দিয়া তে বলা হয়েছে:
"পিতা-মাতার জন্য সন্তানদের মধ্যে দান-উপহারে সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব। এক সন্তানকে বেশি দিয়ে অন্যদের কম দেওয়া বা বঞ্চিত করা বৈধ নয়।"
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৪/১৪৩)
রদ্দুল মুহতার (৫/৬৯৬) এ বলা হয়েছে:
"সন্তানদের মধ্যে দানে সমতা রাখা মুস্তাহাব নয়, বরং ওয়াজিব। যদি কাউকে বেশি দেয়, তবে অন্য সন্তানদের জন্য দানটি ফেরত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২০৪) তে হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লিখেছেন:
"যে ব্যক্তি জীবদ্দশায় সন্তানদের মধ্যে পার্থক্য করে, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করবে।"
ফাতাওয়া উসমানী (২/৫১৫) তে মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম লিখেছেন:
"সন্তানদের মধ্যে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দান করা হারাম। তবে যদি কোনো সন্তান অক্ষম, অসুস্থ বা বিশেষ প্রয়োজনবিশিষ্ট হয়, তাহলে সন্তানদের সম্মতিতে বা শরিয়তের সীমার মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি দেওয়া যেতে পারে।"
৩) দ্বিতীয় প্রশ্ন: বাকি সন্তানদের করণীয়
ক. সর্বপ্রথম চেষ্টা করুন:
আপনার নানুকে নম্রভাবে বোঝান যে, ইসলামী বিধান অনুযায়ী সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনে সমতা রাখা জরুরি। যদি তিনি বড় ছেলেকে বেশি দিতে চান, তবে অন্য তিন সন্তানের সম্মতি নিতে বলুন। যদি অন্য সন্তানরা স্বেচ্ছায় সম্মতি দেয়, তাহলে তা জায়েজ।
খ. পারিবারিক মধ্যস্থতা:
পরিবারের সিনিয়র সদস্য বা এলাকার ইমাম/মুফতীর মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করুন। মীমাংসা ইসলামে উত্তম। আল্লাহ বলেন:
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
"আর আপস-মীমাংসা উত্তম।" (সূরা আন-নিসা: ১২৮)
গ. আইনী সহায়তা নেওয়া:
যদি সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং নানু পক্ষপাতমূলকভাবে কাজটি করেন, তাহলে বাকি সন্তানরা আইনী সহায়তা নিতে পারবেন। এটি শুধু জায়েজ নয়, বরং নিজের হক আদায়ের জন্য আবশ্যক হতে পারে। কেননা জুলুম প্রতিরোধে আইনের আশ্রয় নেওয়া ইসলামসম্মত। তবে সতর্কতা: এই পদক্ষেপের ফলে পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে, তাই সর্বশেষ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
ঘ. উইল/দান সংক্রান্ত বিধান:
ইসলামী আইনে মৃত্যুর সময় উইল করা যায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সম্পদে, যা উত্তরাধিকারী ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া যায়। কিন্তু সন্তানদের জন্য উইল করা জায়েজ নয়, কারণ সন্তানরা শরিয়তের নির্ধারিত উত্তরাধিকারী। তবে জীবদ্দশায় দান (গিফট) একটি বৈধ ব্যবস্থা, কিন্তু সেটিও সুবিচার ও সমতার ভিত্তিতে হতে হবে।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন:
"পিতা সন্তানদের মধ্যে অসমভাবে দান করলে তা ফেরত নেওয়া যাবে।"
(কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মদ)
৪) সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
- এক সন্তানকে সব সম্পদ দিয়ে অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করা হারাম ও জুলুম।
- যদি নানু ইতিমধ্যেই বড় ছেলেকে কিছু লিখে দিয়ে থাকেন, তাহলে বাকি সন্তানরা এর প্রতিবাদ করতে পারেন এবং ফেরত চাইতে পারেন।
- যদি সব সন্তান স্বেচ্ছায় সম্মতি দেয়, তাহলে বড় ছেলেকে বেশি দেওয়া জায়েজ।
- বাকি সন্তানদের জন্য আইনী সহায়তা নেওয়া বৈধ এবং প্রয়োজনে আদালতে যেতে পারেন। কারণ এটি শরিয়তের নির্দেশিত ন্যায়বিচার আদায়ের একটি মাধ্যম।
- তবে উত্তম হলো পারিবারিক সমাধান; কারণ আদালতের রায়ে সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা তাওফীক দিন।
(আমিন)