ওয়াসওয়াসার কারণে মুখ থেকে তালাক শব্দ বের হয়ে গেলে তালাক পতিত হয় কি?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ। আপনার এই অবস্থাটি হলো ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা)। শয়তান মানুষকে তালাকের ব্যাপারে এই ধরনের ভয় দেখিয়ে কষ্ট দিয়ে থাকে। মনে রাখবেন, শুধু মনের মধ্যে চিন্তা আসা, মুখে কিছু আসার ভয় করা, অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে জিহবা-ঠোঁট নড়ে যাওয়া—এসব দ্বারা কোনো তালাক হয় না।
১. তালাক শুধু ইচ্ছা ও সংকল্পে হয়
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
“নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেকে তাই পাবে যা সে নিয়্যাত করেছে।”
(সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
তালাক তখনই পতিত হয়, যখন একজন সুস্থ বিবেকবান মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে, নিজের ইচ্ছায় এবং বুঝে-শুনে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আপনি ইচ্ছা করেননি; এটি ওয়াসওয়াসা ও অনিচ্ছাকৃত ভুল। সুতরাং এতে তালাক হবে না।
২. ভুল, ভুলে যাওয়া ও অনিচ্ছাকৃত কাজ ক্ষমা করা হয়েছে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا
“হে আমাদের রব! আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদের পাকড়াও করো না।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ
“আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যা করতে বাধ্য করা হয়েছে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।”
(সহীহ ইবনে মাজাহ: ২০৪৩; শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)
আপনি চাকরির সময় ক্লান্তি ও ওয়াসওয়াসার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু বলে ফেলেছেন এবং সাথে সাথে নিজেই বলেছেন, “আরে আমি কি সব বলছি!” —এর মানে আপনি মনে-প্রাণে তালাক দেওয়ার নিয়ত করেননি। তাই এটি তালাক নয়।
৩. ওয়াসওয়াসার কারণে উচ্চারিত শব্দে তালাক পতিত হয় না
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا طَلَاقَ وَلَا عِتَاقَ فِي إِغْلَاقٍ
“যার মন বন্ধ/আচ্ছাদিত হয়ে গেছে (অর্থাৎ অনিচ্ছা, নিরুপায় বা প্রবল অবস্থায়) তার তালাক ও ‘ইতক’ (দাসমুক্তি) পতিত হয় না।”
(আবু দাউদ: ২১৯৩, ইবনে মাজাহ: ২০৪৬; শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
“ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তি যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে, তবে তা তালাক হয় না; কারণ তা শয়তানের পক্ষ থেকে তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।”
(মাজমু‘আল ফাতাওয়া)
শায়খ ইবনে উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ-কে এরূপ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন:
“যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসার কারণে এমন বলে ফেলে, সে তালাক দেয় না; কারণ সে ইচ্ছা করেনি। নবী ﷺ বলেছেন: ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়্যাত অনুযায়ীই পাবে।’ সুতরাং তালাক পতিত হয় না।”
(ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব)
৪. মনে রাখবেন: মজা বা রাগ করে ইচ্ছা করলে তালাক পতিত হয়
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন: ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে বললে, তা মজা করে বলুন বা রাগ করে বলুন, তালাক পতিত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جَدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جَدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ
“তিনটি বিষয়—মজায় করলে বা সিরিয়াসলি করলে—উভয় অবস্থায়ই বাস্তব হয়ে যায়: বিবাহ, তালাক এবং রুজু (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।”
(আবু দাউদ: ২১৯৬, তিরমিযী: ১১৮৪; শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)
কিন্তু আপনার অবস্থা সেটি নয়; আপনি নিয়ত ও ইচ্ছা করেননি। তাই আপনার ওপর কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার স্ত্রী আপনার জন্য হালাল এবং বিবাহ ঠিক আছে।
৫. ওয়াসওয়াসা দূর করার উপায়
১. যখনই মনে এই চিন্তা আসে, বলুন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
“আমি আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।”
২. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। মনে মনে বলুন: “আমি তালাক দিইনি; এটি শয়তানের প্ররোচনা।”
৩. কারো কাছে বারবার প্রশ্ন করবেন না; কারণ এতে ওয়াসওয়াসা আরও বেড়ে যায়।
৪. বেশি বেশি দরুদ, ইস্তিগফার এবং নিয়মিত নামাজে মনোযোগ বাড়ান।
৫. কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃতভাবে তালাকের শব্দ নিজে উচ্চারণ করবেন না। আপনি যদি জানা-শোনা সত্ত্বেও ইচ্ছা করে তালাক বলেন, তাহলে তা পতিত হবে। তাই সাবধানতা অবলম্বন করুন।
সারকথা: আপনার তালাক পতিত হয়নি। এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা মাত্র। আপনি চিন্তামুক্ত থাকুন এবং শয়তানকে পাত্তা দেবেন না। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।