ওয়াসওয়াসা কারণে তালাক বললে কি পতিত হয়
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমি একটা ব্যাংকে চাকুরী করি। হঠাৎ কিছুদিন আমার মনে তালাক সংক্রান্ত প্রশ্ন আসতে থাকে। এর মধ্যে একদিন ব্যাংকে কাজ কাজ করতে প্রচুর তালাকের চিন্তা আসতে থাকে। আমি তখন থেকেই বিভিন্ন দুয়া পড়তে থাকি এবং কাজ করা শুরু করিএবং এই চিন্তা বা ওয়াস ওয়াসা দূর করার চেষ্টা করতে থাকি। এভাবে প্রায় ৪/৫ ঘন্টা অতিবাহিত হয়।মানে কেউ যেন জোর করে বলাবে এমন কিছু। কাজ শেষে আমি একটু অন্য মনস্ক হই এবং চিন্তা করতে থাকি- প্রায় বাবা আম্মাকে তালাক দেব বলত। তো আমি ঐ চিন্তার বশবর্তী হয়ে বাবা মাকে যেভাবে বলত আমিও কেন জানি সেইভাবে জিহবা আর ঠোট হাল্কা নড়ে উঠে তালাক দিলাম বলে(দেব শব্দটি আর বলার আগেই আমার কেমন জানি বাস্তবতায় ফিরে আসি)। এবং তৎক্ষনাৎ আমি শরীর ঝাড়া দিয়ে বলি আমি আমি এসব কি বলতেছি। এখন আমি কি স্ত্রীকে বললাম নাকি বাবার টাই রিপিট করছি মায়ের দিকে- বুঝতেছি না। আমার যতদুর মনে পড়ে শব্দ হয় নি।আবার মনে হচ্ছে শব্দ হয়েছে হালাকা কিন্তু আমি নিশ্চিত নই। মনেও করতে পারছি না। আমার কনো নিয়ত বা ইচ্ছাই ছিল না তালাজের। কারণ স্ত্রীর সাথে আমার ভালো সম্পর্ক।
এরপর আরেকদিন মাগরিবের নামাজ পড়ে হুট করে শুধু জিহবা নড়ে উঠে তালাক বলে। কিন্তু ঠোঁট ওইদিন নড়ে নি। আমার কনো নিয়ত বা ইচ্ছাই ছিল না তালাকের কারণ স্ত্রীর সাথে আমার ভালো সম্পর্ক।
এরপর আরেক রাত্রে বন্ধুদের সঙ্গে ফেচবুকে কথা বলে ঘুমানোর আগে বলে নিজের সাথেই নিজে ফেলি আমার অমুক বন্ধু ভল আছে তমুক বন্ধু ভাল আছে ওইদিকে তুমি তোমার বৌরে দিনে তালাক দাও ১৪ বার যা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত কথা এবং নিজেকে বুঝানো এর ক্ষেত্রে, যে সবাই ভাল আছে তুমি কেন এসব করবে।
এরপর আরেকদিন চেয়ারে বসে কাজ করতেছি হঠাৎ মনে পড়ল নবিজির হাদিস- যে ঠট্টা করে তালাক দিলাম বললেও তালাক হয়ে যায়।
ত আমি কল্পনায় আমার এক বন্ধুকে হাদিস টি রিপিট করতে গিয়ে বলছি ঠাট্টা করে তালাক দিলাম কথাটি বলে আমি শয়তানের ওয়াস ওয়াসার কারণে থেমে যাই কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ণ বাক্য শেষ করা। এখন এই কথা বলার সময় আমার জিহবা নড়েছিল কিন্তু ঠোট নড়েছিল কিনা মনে নেই। শব্দ হয় নি এটা বুঝেছি।
Answer
উত্তর:
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তরঃ
উল্লিখিত সব ঘটনায় কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ বৈধ ও অটুট রয়েছে। আপনাকে কোনো ইদ্দত পালন করতে হবে না এবং আপনার স্ত্রী আপনার কাছে হালাল। শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করুন এবং এসব চিন্তা গুরুত্ব না দিয়ে উপেক্ষা করুন।
বিস্তারিত দলিল ও বিশ্লেষণ
প্রথমে জেনে রাখা জরুরি যে, তালাকের ক্ষেত্রে ইচ্ছা (নিয়ত) ও সচেতন উচ্চারণ অপরিহার্য। কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে, যে তালাক জোরপূর্বক, ভুলবশত বা অজ্ঞান অবস্থায় দেওয়া হয়, তা কার্যকর হয় না। নবী করীম ﷺ বলেছেন:
«رُفِعَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأُ وَالنِّسْيَانُ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ» “আমার উম্মতের কাছ থেকে ভুল, বিস্মৃতি এবং যাতে তারা বাধ্য করা হয়, তা ক্ষমা করা হয়েছে।”
(ইবনু মাজাহ, হাসান; সহীহ ইবনু হিব্বান)
তালাকও এই সাধারণ নীতি থেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে হাদীসে এসেছে, “তিনটি বিষয় серьёз অবস্থায় এবং ঠাট্টায়ও কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক ও স্ত্রী ফিরিয়ে আনা (رجعة)।” (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, সহীহ ইবনু হিব্বান – শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন)। কিন্তু এই হাদীসটি তখন প্রযোজ্য যখন ব্যক্তি সজ্ঞানে ও ইচ্ছাকৃতভাবে তালাক শব্দ উচ্চারণ করে, কিন্তু তা ঠাট্টা বা খেলার ছলে বলে। যদি কেউ বিনা ইচ্ছায়, অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ওয়াসওয়াসার কারণে বলে ফেলে, তবে তা ঠাট্টার পর্যায়ে পড়ে না; বরং তা ভুল বা অজ্ঞানতার অন্তর্ভুক্ত।
এখন আপনার প্রতিটি ঘটনার বিচারঃ
১. প্রচণ্ড রাগের সময় এক তালাক উচ্চারণ
আপনি লিখেছেন, “সামী ত ইচ্ছা করে দেই নি প্রচুর রাগের মাথায় দেয়। তবে স্বামীর নিয়ত ছিল না বা ইচ্ছাও ছিল না।”
রাগের তিনটি স্তর আছে:
- হালকা রাগ (স্বাভাবিক রাগ) – এতে তালাক কার্যকর হয় যদি সে জেনেশুনে বলে।
- মধ্যম রাগ – যেখানে ব্যক্তি নিজের কথা বোঝে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কম থাকে।
- প্রচণ্ড রাগ – যেখানে ব্যক্তি অচেতন বা অজ্ঞান হয়ে যায়, নিজের কী বলছে তা বোঝে না।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) ও অন্যান্য সালাফী বিদ্বানগণের মতে, যদি রাগ এত তীব্র হয় যে ব্যক্তি নিজের উচ্চারণ সম্পর্কে সচেতন ছিল না এবং তা বলতে চায়নি, তবে তালাক কার্যকর হবে না। ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন:
“إذا غضب غضباً شديداً حتى خرج عن عقله، ولم يدر ما يقول، فلا يقع طلاقه” “যখন কেউ এত প্রচণ্ড রাগান্বিত হয় যে তার বুদ্ধি লোপ পায় এবং সে জানে না কী বলছে, তখন তার তালাক পতিত হয় না।”
(مجموع الفتاوى ৩২/১২১)
শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) আরও স্পষ্টভাবে বলেন:
“الغضبان الذي لا يعي ما يقول، أو يغلب على عقله، لا يقع طلاقه” “যে রাগী ব্যক্তি বুঝে না কী বলছে, বা তার জ্ঞান লোপ পায়, তার তালাক কার্যকর নয়।”
(الشرح الممتع ৫/২৬৪)
আপনার ঘটনায় স্ত্রীর সাথে মারামারি, জামা ছেঁড়া, দু’ঘরে যাওয়া – এসব অতি উত্তেজনার স্পষ্ট লক্ষণ। আর স্বামী পরে বলেছে “আমি এ কী করলাম” – প্রমাণ করে সে তখন স্বাভাবিক ছিল না। তাই এ তালাক কার্যকর হয়নি।
২. ব্যাংকে বসে “তালাক দিলাম” বলে ফেলা (অসম্পূর্ণ বাক্য)
- আপনি বলেছেন, “আমি ঐ চিন্তার বশবর্তী হয়ে বাবা মাকে যেভাবে বলত আমিও কেন জানি সেইভাবে জিহবা আর ঠোট হাল্কা নড়ে উঠে তালাক দিলাম বলে (দেব শব্দটি আর বলার আগেই বাস্তবতায় ফিরে আসি)।”
- এমনকি আপনি নিশ্চিত নন শব্দ হয়েছে কিনা। শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন, “তালাক শুধু মুখে উচ্চারণ করলেই হবে না; বরং তা ইচ্ছাকৃত ও সচেতন হতে হবে। আর যদি সন্দেহ থাকে যে শব্দ হয়েছে কি না, তাহলে মূলনীতি হলো – তালাক পতিত হয় না।”
(سلسلة الهدى والنور, শাইখ আলবানী)
ইচ্ছে ছিল না, বরং ওয়াসওয়াসার কারণে জিহবা নড়েছিল। এতে তালাক হয় না।
৩. মাগরিবের নামাজের পর শুধু জিহবা নড়া (ঠোঁট না নড়া)
এটি শুধুমাত্র ওয়াসওয়াসার একটি মুহূর্ত। বাস্তবে কোনো উচ্চারণ হয়নি। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনু কাইয়িম (রহ.) স্পষ্ট বলেন: “মনের কথা বা শুধু জিহবার নড়াচড়া, যদি তা শ্রবণযোগ্য শব্দ না হয়, তবে তালাক গণ্য হবে না।”
(ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন, ৪/১২)
যেহেতু ঠোঁট নড়েনি এবং শব্দ হয়নি, এটি কোনো তালাক নয়।
৪. বন্ধুদের সঙ্গে ফেসবুকে কথার পর অনিচ্ছাকৃতভাবে “তুমি তোমার বউকে ১৪ বার তালাক দাও” বলা
এটি কোনো তালাক উচ্চারণই নয়; বরং নিজেকে বুঝানোর জন্য মুখ ফসকে বেরিয়ে আসা কথা। আর এখানে ‘তুমি’ বলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেও উদ্দেশ্য করা হয়নি। তালাকের জন্য স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে স্পষ্ট ও ইচ্ছাপূর্বক বলা আবশ্যক। শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন:
“لا يقع الطلاق إلا بالنية والقصد إلى الطلاق، وإلا فهو لغو” “নিয়ত ও তালাকের ইচ্ছা ছাড়া তালাক পতিত হয় না; অন্যথায় তা অর্থহীন।”
(المنتقى من فتاوى الفوزان ৪/৬৯)
৫. হাদীস মনে করে “ঠাট্টা করে তালাক দিলাম” বলতে গিয়ে থেমে যাওয়া
আপনি বলতে চেয়েছিলেন “ঠাট্টা করে তালাক দিলাম বললেও তালাক হয়” – এটি একটি কথার পুনরাবৃত্তি মাত্র, নিজে তালাক দেওয়ার চেষ্টা নয়। তাছাড়া আপনি পূর্ণ বাক্য শেষ করেননি, শব্দও হয়নি নিশ্চিত। এর কোনো মূল্য নেই।
ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার পরামর্শ
শাইখ ইবনু বায (রহ.) ও অন্যান্য সালাফী আলিমগণ ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে বলেন:
- ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়, যা ইবাদত ও বিবাহ ইত্যাদিকে নষ্ট করতে চায়।
- এর চিকিৎসা হলো: তা গুরুত্ব না দেওয়া, “আ‘ঊযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রজীম” পড়া এবং অন্য চিন্তায় মনোনিবেশ করা।
- হাদীসে এসেছে, শয়তান তালাক নিয়ে মানুষকে ওয়াসওয়াসা দেয়, যাতে সে চিন্তিত হয়। নবী ﷺ বলেছেন:
“إِنَّ الشَّيْطَانَ يُلْقِي فِي قُلُوبِ عِبَادِهِ الْوَسْوَسَةَ، فَمَنْ وَجَدَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَلْيَقُلْ: آمَنْتُ بِاللَّهِ، فَإِنَّ ذَلِكَ يَذْهَبُ عَنْهُ” “শয়তান তাঁর বান্দাদের অন্তরে ওয়াসওয়াসা দেয়। যে এর কিছু অনুভব করবে, সে যেন বলে: ‘আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি’ – তাহলে তা দূর হয়ে যাবে।”
(মুসলিম)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সব ঘটনায় আপনার ইচ্ছা, সচেতনতা, ও পরিষ্কার উচ্চারণ ছিল না। তাই কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার স্ত্রী আপনার কাছে বৈধ। আপনাকে আলাদা থাকতে হবে না, ইদ্দত পালন করতে হবে না। শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে সাবধান থাকুন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা ও শক্তি প্রার্থনা করুন।
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
“যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”
(সূরা আত-তালাক: ৩)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও হিদায়াতদাতা।