শেয়ারে জমি ক্রয়
Family Life · Hanafi
Question
আমরা ১০ জন মিলে শেয়ারে ১ টি জমি কিনে বাড়ি করার পরিকল্পনা করেছি।আমাদের মধ্যে ২/৩ জন প্রাইমারি স্কুলের টিচার।তারা নিজেদের অংশের টাকা পরিশোধ করার জন্য ব্যাংক থেকে লোন নিবেন।
এ অবস্থায় তাদের লোন নিয়ে জমি কেনার কারনে কি আমাদের বাকি অংশীদারদের জমি কেনা ও হারাম হয়ে যাবে? নাকি এক্ষেত্রে গুনাহ শুধু লোন গ্রহণকারীদের ওপরই বর্তাবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নিচে ইসলামী শরী‘আহ ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
মূলনীতি:
ইসলামে সুদ (রিবা) স্পষ্টভাবে হারাম এবং এটি কবীরা গুনাহ। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে:
"يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ"
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৮)
"হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।"
সুদী লেনদেন কেবল গ্রহীতার জন্যই গুনাহ নয়, বরং যে কেউ সুদী লেনদেনে সহযোগিতা করে, সাক্ষী থাকে বা লিখে দেয়, সেও গুনাহগার হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"لَعَنَ اللَّهُ آكِلَ الرِّبَا، وَمُوكِلَهُ، وَكَاتِبَهُ، وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫৯৮)
"আল্লাহ তা‘আলা সুদ খাদক, সুদ দাতা, তার সাক্ষী ও লেখককে লানত করেছেন। আর তিনি বলেছেন: তারা সবাই সমান।"
সুতরাং প্রশ্ন হলো—যারা সুদী লোন নিচ্ছে না, তারা যদি তাদের সাথে জমি কেনে, তাহলে তাদের ওপর কি গুনাহ হবে?
আপনাদের অবস্থার বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
১. শরীকানা চুক্তি ও সুদের সম্পর্ক:
- আপনারা ১০ জন মিলে জমি কিনতে চান। এখানে প্রত্যেকের অংশ নির্দিষ্ট (যেমন ১০% করে) এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশের টাকা নিজে পরিশোধ করবে।
- যারা ব্যাংক থেকে সুদী লোন নিচ্ছে, তারা নিজেদের অংশের জন্য লোন নিচ্ছে, আপনাদের অংশের জন্য নয়।
- সুতরাং আপনারা কেউ সুদী লেনদেনে সরাসরি অংশগ্রহণ করছেন না, বরং শুধু কয়েকজন শরীক নিজেদের মধ্যে সুদী লোন নিচ্ছে।
২. এখন প্রশ্ন হলো—এই অবস্থায় আপনাদের জমি কেনা কি হারাম হবে?
- জবাব: না, যারা সুদী লোন নিচ্ছে না, তাদের জন্য জমি কেনা জায়েয হবে এবং তাদের অংশ হালাল থাকবে। তবে শর্ত হলো, জমি কেনার সময় সুদী লোন গ্রহীতাদের সাথে এমন কোনো চুক্তি না হয় যাতে আপনাদের অংশও সুদী টাকার সাথে মিশে যায় বা আপনাদেরও সুদী লেনদেনের অংশীদার গণ্য করা হয়।
- হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্ট বলা হয়েছে: "একটি হারাম কাজ যদি একাধিক ব্যক্তির মধ্যে কেউ করে, তবে বাকিদের ওপর তার গুনাহ বর্তাবে না, যতক্ষণ না তারা সরাসরি সেই কাজে অংশগ্রহণ করে বা তাতে সন্তুষ্ট থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৯১; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৭৪)
৩. গুনাহ কেবল লোন গ্রহীতাদের ওপরই বর্তাবে?
- হ্যাঁ, সুদী লোন শুধু গ্রহীতাদের জন্যই হারাম। তবে তারা যদি আপনাদের সাথে জমি কেনে, তাহলে তাদের অংশের জমি হারাম উপায়ে অর্জিত হওয়ার কারণে তাদের জন্য তা হারাম হবে। কিন্তু আপনাদের অংশের জমি হালাল।
- তবে এক্ষেত্রে সতর্কতা হলো—আপনারা যদি জানেন যে তারা সুদী লোনে জমি কিনছে এবং আপনারা তাতে নীরব থাকেন বা তাদেরকে উৎসাহিত করেন, তাহলে আপনাদেরও কিছুটা দায়িত্ব হবে। কারণ সুদী লেনদেনের গুনাহের অংশীদার না হলেও, সুদী কাজে নীরব থাকা এবং তাকে সাহায্য করা (যেমন জমি একসাথে কিনে এই লেনদেনকে বৈধতা দেওয়া) মানা হয়েছে।
ফাতাওয়া ও হানাফী বিদ্বানগণের মত:
-
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী):
"যদি কয়েকজন ব্যক্তি মিলে কোনো জমি কিনে এবং তাদের মধ্যে কেউ ব্যাংক থেকে সুদী লোন নেয়, তাহলে যারা লোন নেয়নি তাদের জন্য জমি কেনা জায়েয হবে, তবে তাদের জন্য উত্তম হলো—সুদী লোন গ্রহীতাকে এই কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা। আর যদি তারা চুপ থাকে এবং সুদী লোনের মাধ্যমে জমি কেনায় সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তারা গুনাহের অংশীদার হবে না ঠিকই, তবে দ্বীনী দায়িত্ববোধের ঘাটতি থাকবে।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৫২) -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.):
"কেউ যদি সুদী টাকা দিয়ে নিজের অংশের জমি কেনে এবং বাকি শরীকরা হালাল টাকা দিয়ে নিজেদের অংশ কেনে, তাহলে শরীকদের জন্য জমি কেনা জায়েয। তবে লেনদেন করার সময় আলাদা আলাদা চুক্তি করা উত্তম, যাতে হালাল ও হারাম টাকা মিশে না যায়।"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৭৬) -
বাহিশতী জেওয়ার (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী):
"সুদী লেনদেনের সরাসরি অংশগ্রহণ না করলে গুনাহ হয় না, কিন্তু সুদী কাজে সন্তুষ্ট থাকা বা তাতে সহযোগিতা করা গুনাহ। তাই মুমিনের উচিত সুদী লেনদেন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা এবং অপরকেও দূরে রাখার চেষ্টা করা।"
(বাহিশতী জেওয়ার, ২/৪৫)
আপনাদের জন্য বাস্তব পরামর্শ:
১. আপনারা যারা লোন নিচ্ছেন না, তাদের স্পষ্টভাবে বোঝান যে সুদ হারাম এবং এই জমি কেনা যদি সুদী লোনের মাধ্যমে হয়, তাহলে তা তাদের জন্য বরকত নষ্ট করবে এবং আখিরাতে কঠিন জবাবদিহির কারণ হবে।
২. আপনাদের চেষ্টা করা উচিত যে যারা লোন নিচ্ছে, তারা কোনো ইসলামী ব্যাংক বা সুদমুক্ত উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করে।
৩. যদি তারা জোর করে লোন নেয় এবং আপনারা তাদের সাথে জমি কিনতেই চান, তাহলে আলাদা আলাদাভাবে লিখিত চুক্তি করুন, যেন আপনাদের অংশ এবং তাদের অংশ পৃথক রাখা যায়। তবে উত্তম হলো, এমন পরিস্থিতিতে জমি কেনা থেকে বিরত থাকা, যাতে আপনারাও তাদের গুনাহের সাথে জড়িত না হন।
৪. যদি সম্ভব হয়, তাহলে তাদের অংশের জমি আলাদা করে নিয়ে আপনারা বাকি অংশ কিনুন, অথবা তাদেরকে বোঝান যে তারা জমির মালিকানা কেবল নিজেদের নামে করুক, আপনাদের সাথে শরীক না হোক।
মোটকথা: আপনাদের জন্য জমি কেনা হারাম হবে না, তবে এটি একটি সংবেদনশীল অবস্থা। নেক নiyyat ও তাকওয়ার সাথে কাজ করলে আল্লাহ সহায়তা করবেন।
والله أعلم بالصواب
মুফতী সিরাজুল হক (ইফতা বিভাগ, দারুল উলূম দেওবন্দ)