বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাক এবং হানাফি মাযহাব থেকে শাফেয়ী মাযহাবে স্থানান্তরিত হওয়া সম্পর্কে জানতে চাই?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার বিষয় টা একটু ভালো করে দেখে আমাকে নিশ্চিন্ত করুন।
1. বিয়ের পূর্বে শর্ত তালাক এর কথা বলছে কিন্তু বাক্য টা কি করম ছিল সেটা মনে নেই। উদাহরণ স্বরূপ :- *অমুক কাজ করলে ডিভোর্স । নাকি *অমুক কাজ করলে ডিভোর্স দিবো । এক্ষেত্রে কোন বাক্য টা বলছে শিশ্চিন্ত হতে পারছে না।
এক্ষেত্রে কি তলাক হবে ?
2. আবার মনে হচ্ছে দুই ধরনেরই বাক্য বলছে , কিন্তু নিশ্চিন্ত ভাবে মনে করতে পারছে না। মনে হচ্ছে ডিভোর্স বা ডিভোর্স দিবো এই দুই ধরনের কথা বলছে কিন্তু স্পষ্ট করে মনে নেই । কিন্তু তার ধারণা কোনো না কোনো একদিন বলছে। ( স্পষ্ট মনে পড়ছে না)
এক্ষেত্রে কি তলাক হবে?
3. হানাফী মাযহাব এ বিয়ের পূর্বে শর্ত তালাক হয়, কিন্তু আহেল হাদীস অনুযায়ী হয়না। এক ব্যক্তি সে তার বিয়ের পূর্বের শর্ত তালাক এর মশলা নিয়ে মুফতি কে জিজ্ঞাসা করেছে , মুফতির জবাব কোনো তালাক হবে না। তারপরও যদি কোনো ভুল ত্রুটি থেকে থাকে , সে এখন আহেল হাদীস অনুযায়ী চলছে তাহলে বিয়ের পূর্বের শর্ত তালাক যা সব ছিল সব বাতিল বলে গণ্য হবে ?? যেহেতু সে হানাফী মুফতি জিজ্ঞাসা করেছে সমস্যা নেই বলছে , তারপরও যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে সে তো এখন আহেল হাদীস অনুযায়ী চলছে, আর আহেল হাদীস এ বিয়ের আগে কোনো তালাক বা শর্ত তালাক নেই , তাহলে তার সেই সব শর্ত বাতিল বলে গণ্য হবে ??
4. সেই ব্যক্তি এই সব না ভেবে নিশ্চিন্তে আহেল হাদীস অনুযায়ী কি চলতে পারে ??
মুফতি সাহেব দয়া করে বিষয় টা পুঙ্খানু ভাবে দেখে জবাব দিয়ে। ধন্য বাদ
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিষয়গুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী। আমি বিস্তারিতভাবে প্রতিটি পয়েন্ট আলোচনা করছি, ইনশাআল্লাহ।
১. বিয়ের পূর্বে শর্ত তালাকের বাক্য মনে না থাকা ও অনিশ্চয়তা
আপনি বলছেন, বিয়ের আগে কোনো এক সময় তালাকের শর্ত দেওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু ঠিক মনে নেই— “অমুক কাজ করলে ডিভোর্স” নাকি “অমুক কাজ করলে ডিভোর্স দিবো” কোন বাক্যটি ব্যবহার করেছিলেন।
হানাফি ফিকহের নীতি:
তালাক সম্পন্ন হওয়ার জন্য স্পষ্ট ও নিশ্চিত বাক্য প্রয়োজন। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের কথার ব্যাপারে সন্দেহে থাকে (যেমন— বলেছি কি বলিনি, বা কোন বাক্য বলেছি), তাহলে তালাক পতিত হবে না। কেননা “اليقين لا يزول بالشك” (নিশ্চিত জিনিস সন্দেহে দূর হয় না)।
রদ্দুল মুহতার-এ এসেছে:
إذا شك في الطلاق لا يقع
(যদি তালাকের ব্যাপারে সন্দেহ হয়, তবে তা পতিত হবে না)
তাই আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর: যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন কোন বাক্য বলেছিলেন, সেহেতু কোনো তালাক পতিত হয়নি।
২. দুই ধরনের বাক্যের সম্ভাবনা ও ধারণা
আপনি মনে করছেন, হয়তো “ডিভোর্স” অথবা “ডিভোর্স দিবো” — এই দুই ধরনের বাক্যই একবার বলেছেন, কিন্তু স্পষ্ট করে মনে নেই। শুধু ধারণা আছে যে কোনো একদিন বলেছেন।
হানাফি ফিকহের নীতি:
শুধু ধারণা বা সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক পতিত হয় না। তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট প্রমাণ বা নিজের নিশ্চিত স্মৃতি প্রয়োজন। আপনি যদি নিশ্চিত না হন, তাহলে তালাক হয়নি।
الفتاوى الهندية-তে বলা হয়েছে:
لو تردد في الطلاق هل وقع أم لا؟ لا يقع
(যদি কেউ তালাক পতিত হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে দ্বিধায় থাকে, তবে তা পতিত হবে না)
অতএব দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরও: তালাক পতিত হয়নি।
৩. হানাফি মুফতি বলেছেন “তালাক হবে না”— এখন আহলে হাদীস অনুযায়ী চললে পূর্বের শর্ত কি বাতিল হবে?
প্রথমত, আপনি হানাফি মুফতির কাছে ফতোয়া চেয়ে পেয়েছেন যে “কোনো তালাক হবে না”। এই ফতোয়া আপনার জন্য তখনকার মতোই কার্যকরী ছিল এবং এখনও তা বৈধ। কারণ মুফতি সাহেব নিজ মাযহাব অনুযায়ী জবাব দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, এখন আপনি যদি আহলে হাদীস মতে চলতে চান, তাহলে তাদের নীতি অনুযায়ী বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাক আদৌ বৈধ নয়। অর্থাৎ, আপনি যে কথাই বলেছেন, তা তাদের মতে তালাকের গণনায় আসে না। ফলে আপনার অবস্থা আরও বেশি নিরাপদ।
তবে এখানে একটি সতর্কতা:
- কোনো ব্যক্তি এক মাযহাব অনুযায়ী আমল করে ফতোয়া নেওয়ার পর যদি অন্য মাযহাবে চলে যায়, তবে পূর্বের আমল কি বাতিল হবে?
উত্তর: পূর্বের আমল তখনকার মাযহাব অনুযায়ী বৈধ ছিল, তাই তা বাতিল হয় না। কিন্তু বর্তমান বিষয়টি যেহেতু ভবিষ্যতের শর্ত ও তালাক নিয়ে, এবং আপনি এখন আহলে হাদীস মতে বিশ্বাস করেন যে ওই শর্ত তালাক গণনীয় নয়, তাই আপনার জন্য নিশ্চিন্ত থাকা জায়েয।
সুতরাং: আপনার পূর্বের শর্ত তালাকের বিষয়টি উভয় মাযহাবের নিরিখেই অকার্যকর— হানাফি ফতোয়ার কারণে এবং আহলে হাদীসের মূলনীতি অনুযায়ী। তাই তা বাতিল বলেই গণ্য হবে।
৪. উক্ত ব্যক্তি কি নিশ্চিন্তে আহলে হাদীস অনুযায়ী চলতে পারে?
আপনি যদি পূর্বোক্ত বিষয়গুলো (তালাকের অনিশ্চয়তা ও হানাফি ফতোয়া) নিয়ে নিশ্চিত হন, তাহলে আপনি আপনার নতুন বিশ্বাস (আহলে হাদীস) অনুযায়ী আমল করতে পারেন। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে উভয় দিক থেকেই কোনো তালাক পতিত হয়নি।
তবে একটি নীতিগত কথা:
ইসলামে মাযহাব পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ নয়, তবে তা হতে হবে জ্ঞানের ভিত্তিতে এবং একবার গ্রহণ করার পর সেটির ওপরই আমল করা উত্তম। কিন্তু এখানে যেহেতু আপনার বিবাহের ভিত্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে চান, এবং সব দিক বিবেচনায় তালাকের কোনো সম্ভাবনা নেই, তাই আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
ইমাম ইবনে আবেদীন (رح) বলেন:
لا يلزم العامي اتباع مذهب بعينه، بل يسأل من شاء
(সাধারণ ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব মানতে বাধ্য নয়; বরং যাকে ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পারে)
তবে বর্তমান অবস্থায় আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হলো: আপনার হানাফি মুফতি সাহেবের দেওয়া ফতোয়ার ওপর নির্ভর করা এবং অতিরিক্ত সন্দেহ-ওয়াসওয়াসা দূর করা।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন নং | উত্তর | |-----------|-------| | ১ ও ২ | তালাক পতিত হয়নি, কারণ আপনি নিশ্চিত নন। | | ৩ | হানাফি ফতোয়া অনুযায়ী তালাক হয়নি; এখন আহলে হাদীস অনুযায়ীও তা বাতিল, তাই নিশ্চিন্ত থাকুন। | | ৪ | আপনি চাইলে আহলে হাদীস অনুযায়ী চলতে পারেন, তবে অতীতের বিষয়ে হানাফি ফতোয়ার ওপরই নির্ভর করুন। |
উপদেশ:
আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আপনার বিবাহ বরকতময় হয় এবং শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে পারেন। তালাক নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে পরিবারের সাথে শান্তি ও ভালোবাসায় জীবন কাটান।
والله أعلم بالصواب