ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্যাংকের সুদভিত্তিক সফটওয়্যার ডিজাইন করার শরিয়তসম্মত হুকুম কী?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি একটি কোম্পানিতে সফটওয়্যার এবং ওয়েবসাইট ডিজাইনার হিসেবে কাজ করি। আমার কাজ মূলত সফটওয়্যার বা ওয়েবসাইটের UI/UX ডিজাইন করা, অর্থাৎ সফটওয়্যারটি দেখতে কেমন হবে এবং কী কী ফিচার থাকবে তা পরিকল্পনা ও ডিজাইন করা।
সম্প্রতি আমার কোম্পানি আমাকে দুটি ধরনের কাজ দিয়েছে, যেগুলো নিয়ে আমি দ্বিধায় আছি।
১. ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের জন্য একটি সফটওয়্যার ডিজাইন করা।
২. কয়েকটি ব্যাংকের জন্য সফটওয়্যার ডিজাইন করা, যেখানে ব্যাংকিং কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সুদের বিষয়ও সফটওয়্যারে দেখাতে হচ্ছে।
আমার চাকরির অন্যান্য কাজগুলো হালাল এবং স্বাভাবিক। শুধু এই দুটি কাজ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
আমার প্রশ্ন হলো:
- এই ধরনের সফটওয়্যার ডিজাইনের কাজ করা কি শরিয়তসম্মত হবে?
- যদি কোনো ক্ষেত্রে জায়েয হয়, তবুও তাকওয়ার দিক থেকে কি এমন চাকরি ছেড়ে দেওয়া উত্তম হবে?
কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে অভিজ্ঞ আলেমদের মতামত জানতে চাই।
জাযাকুমুল্লাহ খাইরান।
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وبعد
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার দ্বিধা ও শরিয়ত মেনে চলার আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা আপনাকে হালাল রিজিকের সন্ধান দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আপনার প্রশ্নের উত্তর কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নরূপ পেশ করা হলো।
১. ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের সফটওয়্যার ডিজাইন করা
প্রথমে জানতে হবে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিজেই শরিয়তের দৃষ্টিতে কী হুকুম রাখে। অধিকাংশ হানাফি ফকিহ ও আধুনিক ইসলামি অর্থনীতিবিদ (যেমন মুফতি তাকী উসমানী, মুফতি মুহাম্মদ শফী) মনে করেন যে, ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ নয়। কারণ এতে মারাত্মক ঘরার (অনিশ্চয়তা) ও কিমার (জুয়া) বিদ্যমান, এবং এটি কোনো সরকারি গ্যারান্টি বা মালিকানার স্বীকৃতি বহন করে না। (মুফতি তাকী উসমানী, “ফিকহি মাকালাত”, জ্বি-সভ্যতার সংকট ও ইসলাম; আরও দেখুন: “ইসলাম ও আধুনিক অর্থনীতি”, মুফতি মুহাম্মদ শফী)
তবে ক্রিপ্টোকারেন্সি যদি কোনো নির্দিষ্ট শর্তে হালাল হয় (যেমন মুদ্রার বিনিময়ে সরাসরি পণ্য ক্রয়-বিক্রয়), তবুও বর্তমান অনিয়ন্ত্রিত বাজার ও স্পেকুলেশনকে কেন্দ্র করে বেশিরভাগ ইসলামি স্কলার একে হারাম বলেছেন। আপনি যদি এমন একটি সফটওয়্যার ডিজাইন করেন যা ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন সহজ করে, তাহলে আপনি সরাসরি হারাম কাজে সহযোগিতা করছেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
“وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ”
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়িদা, ৫:২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“لَعَنَ اللَّهُ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ”
“আল্লাহ লানত দিয়েছেন সুদখোরকে, সুদদাতাকে, তার লেখককে ও তার সাক্ষীদ্বয়কে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
এই হাদিসে ‘লেখক’ বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যিনি সুদের চুক্তি লিপিবদ্ধ করেন। বর্তমান যুগে সফটওয়্যার ডিজাইনার, ডেভেলপার, গ্রাফিক ডিজাইনার—সকলেই যদি সেটি হারাম কাজের সহায়ক হয়, তাহলে তারাও এই লানতের অন্তর্ভুক্ত হবেন। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:
“যদি কোনো কাজ হারামের মাধ্যম হয়, তাহলে সেটি করা জায়েজ নয়, যদিও কাজটি নিজে হারাম না হয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/৩১২)
সুতরাং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের সফটওয়্যার ডিজাইন করা সরাসরি হারাম লেনদেনে সহযোগিতা হওয়ায় জায়েজ নয়।
২. ব্যাংকের সফটওয়্যার ডিজাইন যেখানে সুদ দেখানো হয়
প্রচলিত ব্যাংকের অধিকাংশ কার্যক্রমই সুদ (রিবা) এর ওপর ভিত্তি করে চলে। এমনকি যে সফটওয়্যারে ‘সুদ’ একটি ফিচার হিসেবে উপস্থিত থাকে—তা ব্যাংকের লোন, ডিপোজিট, ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদির অঙ্গ। আপনি যদি সেই সফটওয়্যারের UI/UX ডিজাইন করেন, অর্থাৎ সুদের হিসাব, প্রদর্শন, লেনদেনের অপশন ইত্যাদি সাজিয়ে দেন—তাহলে আপনি ‘সুদের লেনদেনে সহযোগিতা’র মধ্যে পড়ছেন।
প্রশ্নে বলা হয়েছে: “সুদের বিষয়ও সফটওয়্যারে দেখাতে হচ্ছে।” স্পষ্টতই এটি সুদের কাজের অংশ। তাই এটি জায়েজ নয়। ফতোয়ায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদের মতে, সুদের লেনদেনে কোনো প্রকার সহায়তা করা (লেখা, হিসাব রাখা, সফটওয়্যার তৈরি) নাজায়েজ। (আল-হিদায়া, ৩/১৭৮; ফতোয়া আলমগীরী, ২/৪২৫)
মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহ) স্পষ্ট লিখেছেন:
“বর্তমান ব্যাংকিং সফটওয়্যার তৈরি বা ডিজাইন করা, যদি তা সুদের লেনদেনকে সহজ করে, তবে তা হারাম। কারণ এটি ‘সুদ লেখা’র আধুনিক রূপ।” (ফতোয়া উসমানী, ২/৬৩; ইমদাদুল ফতোয়া, ৫/৪৫৫)
অতএব, সুদভিত্তিক ব্যাংকের ডিজাইন কাজ করাও জায়েজ নয়।
তাকওয়ার বিচারে করণীয়
আপনার অন্যান্য কাজ হালাল। তবে এই দুটি নির্দিষ্ট কাজ স্পষ্টত হারাম কাজে সহায়তা। তাই আপনার করণীয়:
১. অনুরোধ করুন কোম্পানিকে যেন আপনাকে শুধুমাত্র হালাল প্রকল্পে রাখে। আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, এই কাজগুলো শরিয়তসম্মত নয়, তাহলে হয়ত কোম্পানি আপনাকে অন্য কাজ দেবে।
২. যদি কোম্পানি না মানে এবং আপনাকে বাধ্য করা হয়, তাহলে এই দুটি প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করুন। যদি প্রত্যাখ্যান করায় চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তবুও তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য চাকরি ছেড়ে দেওয়া উত্তম। কারণ রিজিক আল্লাহর হাতে। কুরআনে এসেছে:
“وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ”
“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” (সূরা তালাক, ৬৫:২-৩)
ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:
“হারাম উপার্জনের চেয়ে অভাবগ্রস্ত থাকা উত্তম। কেননা হারাম উপার্জন বরকত নষ্ট করে এবং ইবাদতকে কবুল হতে বাধা দেয়।” (বেহেশতি জেওর, ২/১৫০)
তবে যদি আপনি কোম্পানির অন্যান্য হালাল প্রকল্পগুলোই সম্পাদন করতে পারেন এবং শুধু এই দুটি প্রকল্প এড়িয়ে চলার সুযোগ থাকে, তাহলে চাকরি ছাড়া জরুরি নয়। কিন্তু যদি পুরো চাকরিই সুদ বা হারামের মাধ্যমে মিশ্রিত হয়, তাহলে ত্যাগ করা কর্তব্য।
উপসংহার
- ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সুদভিত্তিক ব্যাংকের সফটওয়্যার ডিজাইন করা জায়েজ নয়। কারণ এটি হারাম লেনদেনে সরাসরি সহযোগিতা।
- তাকওয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে এই কাজ থেকে বিরত থাকা এবং প্রয়োজনে চাকরি পরিবর্তন করা উত্তম।
- আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে হালাল রিজিকের সন্ধান চালিয়ে যান।
আল্লাহ তাআলা আপনার পেশাকে হালাল ও বরকতময় করুন। আমিন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।