পরিবারের ভোরণপোষন সম্পর্কিত
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে কেউ যদি আত্মহত্যা করে, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে এর বিধান কী—তা জানতে চেয়েছেন। পাশাপাশি জানতে চেয়েছেন, আত্মহত্যাকারী কি জান্নাতে কখনো যেতে পারবে না? আর যাদেরকে রেখে যাওয়া হচ্ছে, তারা কি কোনো বিচার ছাড়াই চলে যেতে পারে?
নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে উত্তর দেওয়া হলো।
১. আত্মহত্যার গুনাহ: সাধারণ আত্মহত্যা ও ভরণপোষণ ব্যর্থতাজনিত আত্মহত্যা কি একই?
উত্তর: হ্যাঁ, উভয় ক্ষেত্রেই গুনাহ এক এবং সমান। কারণ আত্মহত্যার কারণ যাই হোক না কেন, নিজের জীবন নেওয়া ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
"আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।" (সূরা আন-নিসা, ৪:২৯)
এ আয়াতে কোনো শর্ত বা ব্যতিক্রম রাখা হয়নি। তাই দুনিয়ার কোনো চাপ, দায়িত্ব বা ব্যর্থতাই আত্মহত্যাকে বৈধ করতে পারে না।
হাদিসে এসেছে:
مَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ فَحَدِيدَتُهُ فِي يَدِهِ يَتَوَجَّأُ بِهَا فِي بَطْنِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا
"যে ব্যক্তি লোহার অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের আগুনে সেই অস্ত্র নিজ পেটে বারবার বিদ্ধ করতে থাকবে, সেখানে সে চিরকাল অবস্থান করবে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৭৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৯)
উল্লেখ্য, এখানে "খালিদান মুখাল্লাদান ফিহা আবাদান" শব্দটি দ্বারা আত্মহত্যার শাস্তির ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে, তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মতানুযায়ী, কোনো মুসলিম জাহান্নামে চিরকাল থাকবে না, যদি সে তাওহীদ ও ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করে। আত্মহত্যা কবিরা গুনাহ হলেও এটি কুফরি নয়। তাই আত্মহত্যাকারী মুসলিম কিছুকাল শাস্তি ভোগ করে পরে আল্লাহর রহমতে জান্নাতে যাবে। (সূত্র: আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৫; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩৫)
সারকথা: সন্তান-পরিবারের ভরণপোষণে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করা সাধারণ আত্মহত্যার মতোই কবিরা গুনাহ। কোনো অজুহাতই এ গুনাহকে হালকা করতে পারে না।
২. আত্মহত্যাকারী কি জান্নাতে কখনো যাবে না?
উত্তর: না, চিরকাল জান্নাত থেকে বঞ্চিত থাকবে—এমন কথা বলা ঠিক হবে না। বরং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকিদা হলো:
- যে মুসলিম তাওহীদের ওপর মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না।
- আত্মহত্যা কবিরা গুনাহ হলেও এটি কুফরি নয়। তাই আত্মহত্যাকারী মুসলিম জাহান্নামে গুনাহের পরিমাণ শাস্তি ভোগ করে, অতঃপর আল্লাহর রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন:
وَلَا نُكَفِّرُ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ بِذَنْبٍ مَا لَمْ يَسْتَحِلَّهُ
"আমরা কিবলাবর্তী কাউকে কোনো গুনাহের কারণে কাফির বলি না, যতক্ষণ না সে গুনাহকে হালাল মনে করে।" (মাতনুত তাহাবিয়্যাহ)
সুতরাং আত্মহত্যাকারী যদি গুনাহকে হালাল মনে না করে (অর্থাৎ জানে এটা হারাম, কিন্তু দুর্বলতার কারণে করে ফেলে), তাহলে সে মুরতাদ হবে না; তার ঈমান বাকি থাকে। আর যে ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য জান্নাত অবশ্যই নির্ধারিত—যদিও কিছুকাল শাস্তির পর।
সারকথা: আত্মহত্যাকারী মুসলিম কখনো জান্নাতে যাবে না—এমন ভাবা ভুল। বরং সে গুনাহের কারণে কিছুকাল জাহান্নামে শাস্তি পেয়ে পরে জান্নাতে যাবে। তবে হাদিসে আত্মহত্যার জন্য যে ভয়াবহ শাস্তির কথা বলা হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায়—এ গুনাহ এত বড় যে এর শাস্তি অত্যন্ত কঠিন। তাই কেউ যেন এ পাপে লিপ্ত না হয়।
৩. যাদেরকে রেখে যাওয়া হচ্ছে, তারা কি কোনো বিচার ছাড়াই চলে যেতে পারে?
উত্তর: না, মোটেও না। নিজের জীবন নেওয়ার মাধ্যমে দায়িত্ব এড়ানো ইসলামসম্মত নয়। বরং পরিবারের ভরণপোষণ একটি ফরজ দায়িত্ব। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এই দায়িত্ব থেকে পলায়ন করে আত্মহত্যা করে, তাহলে তার ওপর অতিরিক্ত গুনাহ হবে—কারণ সে:
- নিজের জীবন হত্যা করল (কবিরা গুনাহ)
- পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব ত্যাগ করল
- যাদের দায়িত্ব ছিল তাদেরকে অসহায় অবস্থায় ফেলে গেল
হাদিসে এসেছে:
كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ
"কারো পাপের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার ভরণপোষণের অধীন ব্যক্তিদের (অবহেলা করে) নষ্ট করে দেয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৯২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৯৬)
সুতরাং আত্মহত্যা করার মাধ্যমে নিজের দায়িত্ব রেখে যাওয়া আরও বড় গুনাহ। বরং কর্তব্য হলো—সবর ও ধৈর্যের সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং বৈধ উপায়ে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
৪. গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা ও উপদেশ
- পরিবারের ভরণপোষণে ব্যর্থ হওয়া একটি কঠিন পরীক্ষা। তবে ইসলাম হতাশা ও নিরাশাকে উৎসাহিত করে না। বরং ধৈর্য, নামাজ, দান-সদকা ও তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত কামনা করতে বলে।
- আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় বিপদ ডেকে আনে।
- ইসলামী দৃষ্টিতে কেউ যদি চরম দারিদ্র্যে পড়ে, তবে তার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের সাহায্য নেওয়া জায়েজ। এমনকি জরুরি অবস্থায় নিজের প্রয়োজনে অমুসলিমের কাছ থেকেও সাহায্য নেওয়া যায়।
- সাহায্যের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আলেম ও সমাজসেবী প্রতিষ্ঠানের কাছে যেতে পারেন। আল্লাহ কখনো বান্দাকে তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)।
৫. হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে দলিল
- রদ্দুল মুহতার (৬/৪১৫) - আত্মহত্যার বিধান ও শাস্তি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা।
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৩৫) - আত্মহত্যাকারীর জানাজা ও দাফন এবং তার আখিরাত সম্পর্কে ফাতাওয়া।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৯১) - কষ্ট, দারিদ্র্য ও আত্মহত্যা প্রসঙ্গে।
- বাহিশতি জেওর (৩/৪২) - পরিবারের ভরণপোষণের ফরজিয়াত ও আত্মহত্যার গুনাহ।
- ফাতাওয়া আলমগিরি (৫/৪৭৯) - আত্মহত্যাকারী মুসলিমের বিধান।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর |
|--------|--------|
| ভরণপোষণে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করলে গুনাহ কি একই? | হ্যাঁ, একই কবিরা গুনাহ—কারণ আত্মহত্যার কোনো অজুহাত নেই। |
| আত্মহত্যাকারী কি চিরকাল জান্নাতে যাবে না? | চিরকাল নয়; তবে গুনাহের পরিমাণ শাস্তির পর জান্নাতে যেতে পারে, যদি ঈমান নিয়ে মরে। |
| যাদের রেখে যাওয়া হচ্ছে তারা কি বিচার ছাড়া চলে যেতে পারে? | না, এটা বাড়তি গুনাহ। দায়িত্ব ত্যাগ করাও কবিরা গুনাহ। |
শেষ কথা
আপনি যদি কোনো হতাশা বা দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকেন, তবে দয়া করে একজন বিশ্বস্ত আলেম বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। আল্লাহ বলেন:
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তার জন্য তিনি যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ধৈর্য ও সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন। আমিন।