জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টন করলে সম্পদ বন্টন এর ভাগ সমান কেমন হওয়া উচিত?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনারা আট বোন ও দুই ভাই মিলে মোট দশজন সন্তান। আপনার বাবা জীবিত এবং তাঁর ৪ শতাংশ জমি আছে। তিনি চাচ্ছেন জীবিত অবস্থায়ই সম্পত্তি ভাগ করে দিতে। ইসলামী শরিয়তে পিতার জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করাকে ‘হেবা’ (দান) বলে গণ্য করা হয়। এই ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা হলো:
১. জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টনের বিধান:
-
পিতা জীবিত থাকাকালীন সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করলে সন্তানদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা মাকরূহে তাহরীমী (হারামের নিকটবর্তী) বলে গণ্য।
-
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমরা সন্তানদের মধ্যে দান-হেবায় সমান হও। যদি আমি কাউকে অগ্রাধিকার দিতাম, তবে মেয়েদের উপর ছেলেদের অগ্রাধিকার দিতাম।”
(শরহু মা‘আনিল আছার, ইমাম ত্বহাবী; বাইহাকী) -
তাই উত্তম হলো পুত্র ও কন্যার মধ্যে不平等 (অসম) বণ্টন না করা। তবে যদি বাবা সমানভাবে দিতে চান, তাহলে তা জায়েয হবে, কিন্তু পছন্দনীয় নয়।
২. কুরআনের নির্দেশনা (উত্তরাধিকার সূত্রে):
ইসলামী শরিয়তে মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের জন্য কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশ আছে:
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান।”
(সূরা নিসা: ১১)
এটি মৃত্যুর পরের জন্য হলেও পিতার জীবিত অবস্থায় দান করার সময়ও এই নীতি অনুসরণ করা অধিকতর উত্তম। তবে বাবা চাইলে নিজের ইচ্ছামত সমানও দিতে পারেন, কিন্তু এতে পুত্রদের অধিকার হরণ হয় না, বরং এটি দান হিসেবে গণ্য হবে।
৩. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
- যদি বাবা সমানভাবে দিতে চান, তাহলে ৪ শতাংশ জমি ১০ জন সন্তানের মধ্যে সমান ভাগ করলে প্রত্যেক সন্তান পাবে: ৪ ÷ ১০ = ০.৪ শতাংশ (অর্থাৎ ২৫ ভাগের ১ ভাগ)।
- যদি বাবা কুরআনের নীতি অনুসারে দিতে চান, তবে:
- ২ পুত্র = ২ অংশ (প্রত্যেকে ১ অংশ)
- ৮ কন্যা = ৪ অংশ (প্রত্যেকে ০.৫ অংশ)
- মোট অংশ = ২ + ৪ = ৬ অংশ
- প্রতি অংশের পরিমাণ = ৪ ÷ ৬ = ০.৬৬৬ শতাংশ
- প্রত্যেক পুত্র পাবে: ২ × ০.৬৬৬ = ১.৩৩৩ শতাংশ
- প্রত্যেক কন্যা পাবে: ০.৬৬৬ ÷ ২ = ০.৩৩৩ শতাংশ
৪. হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ দিক:
- ফাতাওয়া শামী (রদ্দুল মুহতার)-এ এসেছে:
“পিতার জন্য সন্তানদের মধ্যে দান-হেবায় সমান হওয়া ওয়াজিব নয়, বরং মুস্তাহাব। তবে কেবল মেয়েদের হেয় করার উদ্দেশ্যে কম দেয়া জায়েয নয়।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া ও বেহেশতী জেওরেও বলা হয়েছে:
“জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টন করলে সমান বণ্টন করা ভালো। কিন্তু যদি কুরআনের মীরাসের নীতি অনুসরণ করা হয়, তবে তাতে বরকত বেশি।”
সুতরাং, আপনার বাবার জন্য পরামর্শ:
১. সমান ভাগ করলে (প্রত্যেকে ০.৪ শতাংশ) – জায়েয, তবে উত্তম নয়।
২. কুরআনের নীতি অনুসারে (পুত্র ১.৩৩৩ শতাংশ, কন্যা ০.৩৩৩ শতাংশ) – অধিক উত্তম ও বরকতময়।
৩. যদি বাবা মৃত্যুর পূর্বেই সম্পত্তি ভাগ করে দিতে চান, তবে ভালো হয় লিখিতভাবে এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিতে দলিল করে দেওয়া।
সর্বোত্তম পন্থা:
একজন বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করে বাবার ইচ্ছানুযায়ী সমাধান গ্রহণ করুন।
রেফারেন্স:
- কুরআন মাজীদ (সূরা নিসা: ১১)
- শরহু মা‘আনিল আছার (ইমাম ত্বহাবী)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী)
- বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মোহাম্মদ শফী)
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারকে সঠিক পথে চালিত করুন।
والله أعلم بالصواب