জায়েয কিনা
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: জায়েজ হওয়ার শর্তসাপেক্ষে
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে আপনার আব্বু (গ্রামীণ ডাক্তার) রোগীদের রক্ত বা অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট ল্যাবে রেফার করছেন এবং ল্যাব কর্তৃপক্ষ তাকে কমিশন বা পার্সেন্টেজ দিচ্ছে। ইসলামী ফিকহের আলোকে এটি জায়েজ কি না তা নির্ভর করে কিছু শর্তের ওপর। নিচে হানাফি ফিকহের কিতাব ও গ্রহণযোগ্য ফতোয়ার আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. কমিশন গ্রহণের মূল নীতি (উসূল)
ইসলামী শরিয়তে সামসারাহ (দালালি বা মধ্যস্থতা) বৈধ। কোনো পণ্য বা সেবার ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে মধ্যস্থতা করে কমিশন নেওয়া জায়েজ, যদি তা নিম্নোক্ত শর্ত পূরণ করে:
- মধ্যস্থতা সততার সাথে হয়, প্রতারণা বা ধোঁকা না থাকে।
- ক্রেতার ওপর বাড়তি চাপ বা মূল্য বৃদ্ধি না হয়।
- কমিশন লেনদেনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়, ঘুষ বা উৎকোচ না হয়।
উল্লেখ্য, ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক একটি আমানতের সম্পর্ক। ডাক্তারের জন্য আবশ্যক হলো রোগীর সর্বোত্তম স্বার্থ দেখা। যদি ল্যাব থেকে কমিশন নেওয়ার কারণে ডাক্তার তার প্রেসক্রিপশনে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা যোগ করেন বা রোগীর জন্য ক্ষতিকর কোনো সিদ্ধান্ত নেন, তবে তা হারাম।
২. হানাফি ফিকহের নির্দেশনা
(ক) ইবনে আবিদীন (রহ.)-এর ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ বলা হয়েছে:
মধ্যস্থতাকারী (সামসার) যদি তার কাজের বিনিময়ে নির্ধারিত পারিশ্রমিক গ্রহণ করে, তবে তা জায়েজ। তবে শর্ত হলো, সে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মাঝে সঠিক তথ্য প্রদান করবে এবং কোনো পক্ষের সাথে ধোঁকাবাজি করবে না।
(রাদ্দুল মুহতার, ৪/৫৫২, কিতাবুল বুয়ূ')
এখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ল্যাব ও রোগীর মধ্যে যোগাযোগ করায় আপনার আব্বু কমিশন নিচ্ছেন। যদি তিনি রোগীকে বলেন, “এই ল্যাবে করালে আমার কমিশন আসে”, অথবা রোগী জানেন যে, ডাক্তার কমিশন নেন, তাহলে সেটি স্পষ্টতা ও সততার অংশ।
(খ) ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) তে বলা হয়েছে:
চিকিৎসকের জন্য ওষুধ কোম্পানি বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে কমিশন নেওয়া জায়েজ, যদি এতে রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি না পায় এবং ডাক্তার রোগীর সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করেন। তবে যদি কমিশনের কারণে ডাক্তার তার পেশাগত সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হন (যেমন অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা লিখে দেন), তবে তা জায়েজ নয়।
(ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩০৮, ভলিউম ২, পরিচ্ছেদ: মধ্যস্থতা ও কমিশন)
(গ) ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরী) তে এসেছে:
একজন ব্যক্তি যদি অন্যকে পণ্য ক্রয়ে সহায়তা করে এবং এর জন্য নির্ধারিত কমিশন নেয়, তবে তা বৈধ, যদি প্রতারণা না থাকে।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২১৮, কিতাবুল বুয়ূ')
৩. বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনার আব্বুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্তাবলি
জায়েজ হওয়ার শর্ত (যদি নিচের সবগুলো পূরণ হয়):
- রোগীর ওপর কোনো আর্থিক বাড়তি চাপ না পড়ে: ল্যাব থেকে আপনার আব্বু যে কমিশন পাচ্ছেন, সেই টাকা ল্যাব তাদের মূল্য তালিকা থেকে দেয় (অর্থাৎ ল্যাব সাধারণ মূল্যেই পরীক্ষা করছে, রোগী অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছে না)।
- প্রেসক্রিপশনে পক্ষপাত না হয়: আপনার আব্বু শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত পরীক্ষাই লিখবেন। অপ্রয়োজনীয় বা বাড়তি পরীক্ষার জন্য জোর দেবেন না।
- স্বচ্ছতা: রোগী বা তার অভিভাবক যদি জানেন যে ডাক্তার এই ল্যাব থেকে কমিশন পান, তাহলে সেটি উত্তম। তবে গোপন কমিশনও জায়েজ, যদি অন্য শর্তগুলো পূরণ হয়।
- ল্যাবের মান ও বিশ্বস্ততা: ল্যাবের রিপোর্ট নির্ভরযোগ্য এবং রোগীর জন্য নিরাপদ হতে হবে। কমিশনের কারণে খারাপ ল্যাব রেফার করা যাবে না।
নাজায়েজ হওয়ার কারণ (যদি নিচের যেকোনো একটি থাকে):
- ল্যাব যদি কমিশন দিতে গিয়ে রোগীর কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেয় (যেমন: সাধারণ মূল্যের চেয়ে বেশি দাম ধার্য করে)।
- আপনার আব্বু যদি রোগীকে না জানিয়ে বা বুঝিয়ে অন্য ল্যাবের চেয়ে কম মানের হলেও এই ল্যাবে পাঠান কেবল কমিশনের জন্য।
- কমিশনের পরিমাণ যদি এত বেশি হয় যে তা ঘুষের পর্যায়ে পড়ে এবং ডাক্তারের বিবেককে প্রভাবিত করে।
৪. হাদিস ও কুরআনের আলোকে সতর্কতা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي فِي النَّارِ»
"ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ে জাহান্নামে যাবে।"
(মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৬৬০১; আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৮০)
তবে এখানে কমিশন ঘুষ নয়, কারণ ঘুষ হয় অন্যায় কাজ করাতে বা অধিকার হরণ করতে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে ল্যাব নিজ উদ্যোগে ডাক্তারকে তার রেফারেলের বিনিময়ে কমিশন দিচ্ছে—এটি সামসারাহ (ব্রোকারেজ) এর অন্তর্ভুক্ত। তবুও ডাক্তারের উচিত সতর্ক থাকা, যেন এটি ঘুষের পর্যায়ে না যায়। ইমাম শাফি‘ঈ (রহ.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি তার পেশাগত অবস্থানের কারণে কাউকে রেফার করার জন্য টাকা নেয়, তবে তা ঘুষের মতোই মাকরূহ। (আল-উম্ম, ৪/১৯৪)
তবে হানাফি মতে, যদি শর্ত পূরণ হয়, তবে তা জায়েজ। মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"ডাক্তার যদি কমিশন নেন, কিন্তু রোগীর পরীক্ষার খরচ না বাড়ে এবং তিনি পেশাগত সততা বজায় রাখেন, তবে তা নাজায়েজ নয়। তবে উত্তম হলো, কমিশন গ্রহণ না করে রোগীর সেবাই প্রধান লক্ষ্য রাখা।"
(ইসলাহি খুতুবাত, ৩/১৪২)
৫. পরিণাম ও পরামর্শ
উত্তম পন্থা: আপনার আব্বু যদি কমিশন নেওয়া থেকে বিরত থাকেন, তবে তা অধিক তাকওয়া ও বরকতময় হবে। কারণ ডাক্তারি পেশা একটি আমানতী পেশা; এখানে রোগীর বিশ্বাস রাখা জরুরি।
যদি কমিশন নেওয়া জরুরি মনে করেন, তাহলে নিশ্চিত করুন:
- আপনি শুধু সেই ল্যাবেই রেফার করবেন, যেটি রোগীর জন্য উত্তম (গুণগত মান ও মূল্য উভয় দিক থেকে)।
- রোগীকে সরাসরি বলতে পারেন: "আপনি যদি এই ল্যাবে পরীক্ষা করান, তাহলে আমি সেখান থেকে কিছু কমিশন পাই, কিন্তু এতে আপনার কোনো বাড়তি খরচ হবে না।"
- আপনার বিবেককে সন্তুষ্ট রাখুন: কোনো অবস্থাতেই অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা লিখবেন না।
চূড়ান্ত ফতোয়া
ল্যাব থেকে কমিশন গ্রহণ করা নাজায়েয হওয়ার দিকটিই অধিক গ্রহণযোগ্য। الدر المختار وحاشية ابن عابدين (رد المحتار) (6/ 95): "[مطلب ضل له شيء فقال من دلني عليه فله كذا] (قوله: إن دلني إلخ) عبارة الأشباه إن دللتني. وفي البزازية والولوالجية: رجل ضل له شيء فقال: من دلني على كذا فهو على وجهين: إن قال ذلك على سبيل العموم بأن قال: من دلني فالإجارة باطلة؛ لأن الدلالة والإشارة ليست بعمل يستحق به الأجر، وإن قال على سبيل الخصوص بأن قال لرجل بعينه: إن دللتني على كذا فلك كذا إن مشى له فدله فله أجر المثل للمشي لأجله؛ لأن ذلك عمل يستحق بعقد الإجارة إلا أنه غير مقدر بقدر فيجب أجر المثل، وإن دله بغير مشي فهو والأول سواء". فقط واللہ اعلم
উত্তম সমাধান: আপনার আব্বু ল্যাব থেকে নির্ধারিত পার্সেন্টেজের বদলে একটি নির্দিষ্ট হাদিয়া বা উপহার হিসেবে নিতে পারেন (যার নির্ধারিত হার নেই), অথবা সম্পূর্ণ কমিশন গ্রহণ না করে রোগীর সেবায় ব্যয় করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে হালাল রিজিক দান করুন ও হারাম থেকে হেফাজত করুন।
সূত্র ও রেফারেন্স (হানাফি কিতাব)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – ৪/৫৫২, কিতাবুল বুয়ূ’, বাবুস সামসারাহ।
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) – ২/৩০৮-৩১০, মধ্যস্থতা ও কমিশন অধ্যায়।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরী) – ৩/২১৮, কিতাবুল বুয়ূ’।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) – ৪/৩৫৭, মধ্যস্থতার বিনিময়।
- জাওয়াহিরুল ফিকহ (মুফতি মুহাম্মদ শফি) – ২/২২৫-২২৮।
- শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবী) – ৪/১২৩, মধ্যস্থতা সংক্রান্ত।