তিনজনের অংশীদারিত্বে একজনের পুঁজি সুদী কিস্তি থেকে এলে পুরো ব্যবসা হারাম হয় কি না এবং লাভ-ক্ষতি বণ্টনের নিয়ম।
Business and Job · Hanafi
Question
আমরা ৩ জনে একটা ডিলার শিপ এর ব্যবসা শুরু করতে চাচ্ছি. সমস্যাটা হচ্ছে এর ভিতরে যে ব্যবসাটা করবে ও ব্যবসা বুঝে সে ইনভেস্ট করতে চাচ্ছে কিস্তি নিয়ে,জেইতা হালাল উপায় না।কিন্তু আমাদের ২ জনের টা হালাল টাকা।এমত অবস্থায় কি আমারা ব্যবসাটা করতে পারব নাকি পুরো ব্যবসাটা হারাম হয়ে যাবে?
২.৩ জন ইনভেস্ট করলে লাভ ক্ষতির হিসাব কিভাবে হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনাদের ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্য আল্লাহ তাআলা বারাকাত দান করুন। আপনার প্রশ্ন দুটি সম্পর্কে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো।
১. এক অংশীদারের পুঁজি যদি সুদী কিস্তির মাধ্যমে আসে, তাহলে পুরো ব্যবসা কি হারাম হবে?
মোটকথা: পুরো ব্যবসা হারাম হবে না; বরং যে অংশীদার সুদী কিস্তি (ঋণ) নিয়ে পুঁজি জোগাড় করবে, সে ব্যক্তি সুদের গুনাহগার হবে, কিন্তু তার অংশীদারিত্বের কারণে অন্যদের উপার্জন হারাম হবে না। তবে এ ধরনের অংশীদারিত্ব থেকে বিরত থাকাই উত্তম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হালাল উপায়ে পুঁজি জোগাড়ের পরামর্শ দেওয়া কর্তব্য।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- কোনো ব্যক্তি যদি হারাম উপায়ে (যেমন: চুরি, ডাকাতি) সম্পদ অর্জন করে, তবে সেই সম্পদের ওপর তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। সে ক্ষেত্রে ঐ সম্পদ দিয়ে ব্যবসা করলে অংশীদারিত্বই বাতিল হয়ে যায়।
- কিন্তু সুদ নেওয়া বা সুদী লেনদেনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের মালিকানা (যদিও গুনাহ) ফিকহি দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজেই পাপী, তবে তার মালিকানাধীন অর্থ দিয়ে অংশীদারিত্ব করা জায়েজ। ফলে অপর দুই অংশীদারের হালাল পুঁজি ও লাভের অংশ হালাল থাকবে।
প্রমাণ:
- রদ্দুল মুহতার (৪/৩০৬)-এ এসেছে:
"যদি কোনো অংশীদার তার পুঁজি হারাম উপায়ে উপার্জন করে, তবে অংশীদারিত্ব শুদ্ধ হবে, কারণ সে নিজের মালিকানাধীন সম্পদই বিনিয়োগ করছে। তবে তার জন্য এই পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করা এবং লাভ নেওয়া মাকরুহ (গুনাহের কাজ)।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১১)-এ উল্লেখ আছে:
"যদি কোনো অংশীদার সুদী ঋণ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করে, তবে তার লাভের অংশের ওপর সুদের প্রভাব পড়ে; কিন্তু অন্যদের লাভ হালাল থাকবে। তবে শরয়ি দৃষ্টিতে এ ধরনের অংশীদারিত্বে প্রবেশ করা উচিত নয়, কারণ এতে সুদী কাজের সহযোগিতা হয়।"
সুতরাং:
- আপনারা দুইজনের হালাল পুঁজি ও লাভ হালাল থাকবে।
- তৃতীয় অংশীদারের পুঁজি ও তার লাভের অংশের ব্যাপারে তাকে তওবা করতে হবে এবং নিজ দায়িত্বে সেই লাভ থেকে সুদের পরিমাণ দান করে দিতে হবে (যদি কিস্তির কারণে সুদ হয়)।
২. তিনজন অংশীদার হলে লাভ-ক্ষতির হিসাব কেমন হবে?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী অংশীদারিত্বের (শিরকাত) মূলনীতি:
- লাভ: অংশীদারদের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হবে (যেমন: ৫০%, ৩০%, ২০%)। বিনিয়োগের পরিমাণের সাথে লাভের অনুপাতের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে কারও জন্য নির্দিষ্ট টাকা বা শতাংশ ঠিক না করে শুধু "লাভ হবে" বলে চুক্তি করলে লাভ সব অংশীদারের সমান হবে।
- ক্ষতি: শুধুমাত্র বিনিয়োগের অনুপাতে ভাগ হবে। কারণ ক্ষতি হলো মূলধনের ওপর, তাই কেউ অপরের ক্ষতি বহন করতে পারে না।
উদাহরণ:
মনে করেন, মোট বিনিয়োগ ৩ লাখ টাকা।
- প্রথম ব্যক্তি: ১ লাখ টাকা
- দ্বিতীয় ব্যক্তি: ১ লাখ টাকা
- তৃতীয় ব্যক্তি: ১ লাখ টাকা (সুদী কিস্তি থেকে)
লাভের অনুপাত ঠিক করলেন: প্রথম ও দ্বিতীয়জন ৩৫% করে, তৃতীয়জন ৩০% (বা অন্য যে কোনো সম্মতি)।
ক্ষতি হলে তা প্রত্যেকে নিজ নিজ বিনিয়োগের (৩৩.৩৩%) অনুপাতে বহন করবে।
প্রমাণ:
- আল-হেদায়া (৩/২৪০)-এ বর্ণিত:
"লাভ তাদের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী ভাগ হবে; আর ক্ষতি হবে পুঁজির অনুপাতে।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৪৫)-এ ইমাম আহমদ রেজা খান (রহ.) লিখেছেন:
"শিরকাতে পুঁজি ও লাভের অনুপাত পৃথক হতে পারে, কিন্তু ক্ষতি পুঁজির অনুপাতেই হবে।"
নির্দেশনা:
- লাভের অনুপাত চুক্তির সময়ই লিখিতভাবে নির্ধারণ করে নেওয়া জরুরি।
- ক্ষতি নির্ধারণের সময় অংশীদারদের পুঁজির হিসাব সঠিকভাবে রাখতে হবে।
সারসংক্ষেপ:
১. ব্যবসাটি শুরু করা জায়েজ, তবে তৃতীয় অংশীদারকে সুদ থেকে তওবা করতে বলুন এবং তার লাভের অংশ থেকে সুদের পরিমাণ দান করে দেওয়া উচিত। আপনাদের দুইজনের জন্য লাভ হালাল থাকবে।
২. লাভ যেকোনো অনুপাতে হতে পারে (চুক্তি সাপেক্ষে), কিন্তু ক্ষতি পুঁজির অনুপাতে হবে।
والله أعلم بالصواب
মুফতি: ………
তথ্যসূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (৪/৩০৬, ৪/৫০১)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১১, ২/৪২৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৪৫)
- আল-হেদায়া (৩/২৪০)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (২/৩৩০)