আনন্দের জন্য লুডু খেলা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর সংক্ষেপে:
বাজি ছাড়া শুধু আনন্দের জন্য লুডু খেলা জায়েজ নয়। কারণ লুডুতে পাশা (ডাইস) ব্যবহার করা হয়, যা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। এই নিষেধাজ্ঞা বাজি থাকা বা না থাকা উভয় অবস্থার জন্যই প্রযোজ্য। নিচে দলিল ও হানাফি ফিকহের কিতাবের রেফারেন্স সহকারে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
📚 কুরআন ও হাদিসের দলিল
১. কুরআনে জুয়া (মাইসির) নিষিদ্ধ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ
“হে মুমিনগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য-নির্ধারক শর’ (তীর) শয়তানের কাজের অপবিত্র বস্তু। সুতরাং তোমরা তা থেকে বিরত থাকো।”
(সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৯০)
পাশা (নার্দ) জুয়ার একটি অন্যতম সরঞ্জাম। তাই পাশা ব্যবহার করে যে কোনো খেলা এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
২. হাদিসে পাশা খেলা নিষিদ্ধ
عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: ” مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدَشِيرِ فَكَأَنَّمَا غَمَسَ يَدَهُ فِي لَحْمِ الْخِنْزِيرِ وَدَمِهِ “
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি পাশা নিয়ে খেলে, সে যেন নিজের হাত শূকরের মাংস ও রক্তে ডুবালো।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬০; সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৩৮)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে:
عن أبي موسى الأشعري رضي الله عنه: ” مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدِ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَرَسُولَهُ “
“যে পাশা খেলে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করল।”
(মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ১৭৫৩)
এই হাদিসগুলিতে বাজি থাকার কোনো শর্ত নেই। বাজি ছাড়া শুধু খেলা হিসেবেও পাশা খেলা নিষিদ্ধ।
🔍 হানাফি ফিকহের বিশিষ্ট কিতাবের রেফারেন্স
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
” وَيَحْرُمُ اللَّعِبُ بِالنَّرْدِ وَالشِّطْرَنْجِ الَّذِي يُلْعَبُ بِالنَّرْدِ أَيْ بِالْكَعْبَيْنِ “
“পাশা (কা’বাইন) দিয়ে খেলা হারাম, এবং যে দাবা পাশা দিয়ে খেলা হয় তাও হারাম।”
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯১, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ)
২. ফতোয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া)
” اللَّعِبُ بِالنَّرْدِ حَرَامٌ سَوَاءٌ كَانَ بِمَالٍ أَوْ بِغَيْرِ مَالٍ “
“পাশা খেলা হারাম, চাই তাতে মাল (বাজি) থাকুক বা না থাকুক।”
(ফতোয়া আলমগীরী, ৫/৩৫৭, মাকতাবা রশিদিয়া)
৩. ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী)
” لُڈو یا نرد کا کھیل خواہ بلا شرکتِ مال (بغیر جوا) ہو، ناجائز ہے “
“লুডু বা পাশার খেলা – যদি বিনা বাজিতেও হয় – তা নাজায়েজ।”
(ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/১৮৪, মাকতাবা ইমদাদিয়া)
৪. ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী)
” نرد کے ساتھ کھیلا جانے والا ہر کھیل (جیسے لُڈو) ناجائز ہے، خواہ جوا نہ ہو “
“পাশা নিয়ে খেলা হয় এমন প্রতিটি খেলা (যেমন লুডু) নাজায়েজ, যদিও তাতে জুয়া না থাকে।”
(ফতোয়া উসমানী, ২/৫৬৭, مكتوبہ)
৫. বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
” لُڈو کھیلنا حرام ہے، کیونکہ اس میں پانسہ (نرد) استعمال ہوتا ہے “
“লুডু খেলা হারাম, কারণ এতে পাশা ব্যবহার করা হয়।”
(বেহেশতি জেওর, দশম অধ্যায়, খেলা-তামাশা সংক্রান্ত)
✅ হানাফি ফকিহদের মতামতের সারাংশ
| মত | বর্ণনা | |--------|------------| | ইমাম আবু হানীফা رحمه الله | পাশাযুক্ত যে কোনো খেলা (বাজি ছাড়াও) হারাম বা তাহরীমি মাকরূহ [রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯১] | | ইমাম আবু ইউসুফ و محمد رحمهما الله | অনুরূপ মত পোষণ করেছেন: পাশা খেলা জায়েজ নয় [ফতোয়া আলমগীরী, ৫/৩৫৭] | | ইমাম তাহাবী رحمه الله | “পাশা খেলা কবিরা গুনাহ” [শরহু মাআনিল আসার, ৪/২৩৮] | | ইবনে আবেদীন شامي رحمه الله | পাশা খেলা হারাম; এমনকি শিশুদের জন্যও অনুচিত [রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯২] | | মুফতি মুহাম্মদ শফী رحمه الله | “লুডু খেলা নাজায়েজ; পাশা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে” [মাআরিফুল কুরআন, তাফসীর সূরা মায়িদাহ; জাওয়াহিরুল ফিকহ, ১/৪৩৫] | | আশরাফ আলী থানভী رحمه الله | “লুডু বাজি ছাড়াও নাজায়েজ; কেননা পাশা শয়তানের হাতিয়ার” [ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/১৮৪] | | মুফতি তাকি উসমানی حفظه الله | “লুডু, দাবা (যা পাশা দিয়ে খেলা হয়) এবং অন্যান্য পাশা-নির্ভর খেলা নাজায়েজ” [ফতোয়া উসমানী, ২/৫৬৭; কিতাবুল ফতোয়া, ৪/৩১৯] |
❓ প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন: লুডুতে যদি পাশার পরিবর্তে স্পিনার বা অন্য কোনো যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তাহলে কি হুকুম?
উত্তর: যদি সেটি পাশার ন্যায় ভাগ্যনির্ভর হয় এবং শুধু সেটির মাধ্যমেই খেলার ফলাফল নির্ধারিত হয়, তবে সেটিও পাশার অনুরূপ বিবেচিত হবে – নাজায়েজ। [ফতোয়া উসমানী, ২/৫৬৮]
প্রশ্ন: অনলাইনে বা কম্পিউটারে লুডু খেলা (বাজি ছাড়া) কি জায়েজ?
উত্তর: অনলাইন সংস্করণেও ডিজিটাল পাশা ব্যবহৃত হয়। তাই একই হুকুম – নাজায়েজ। হুকুম বদলানোর জন্য মাধ্যমের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। [তাকমিলা ফতোয়া উসমানী, ১/১৪৫]
প্রশ্ন: যদি শুধু ছোট ছেলেমেয়েরা আনন্দের জন্য লুডু খেলে, তাহলে?
উত্তর: শিশুদের জন্য নাজায়েজ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত, অন্যথায় তাদেরও নিষেধ করা কর্তব্য। কারণ পাশা খেলার শিক্ষা পরবর্তী গুনাহের কারণ হতে পারে। বাবা-মা দায়ী হবেন। [বেহেশতি জেওর, পিতা-মাতার দায়িত্ব অধ্যায়]
📋 পরিশেষে যা করণীয়
- লুডু সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করুন – কারণ এটি কুরআন-হাদিসে নিষিদ্ধ পাশাভিত্তিক খেলা।
- বিকল্প খেলা বেছে নিন – যেখানে পাশা বা জুয়ার উপকরণ থাকে না, যেমন:
- দাবা (শুধু কৌশল নির্ভর, পাশা ছাড়া)
- ক্যারাম বোর্ড
- পাজল, সুডোকু, ভূগোল/ইতিহাস ভিত্তিক বোর্ড গেম (যাতে ভাগ্য নয়, মেধার প্রয়োগ আছে)
- সন্তানদের অন্যরকম খেলায় অভ্যস্ত করুন – যেমন ক্রীড়ামূলক খেলা (ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল – ইসলামী পোশাক ও সীমার মধ্যে)।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল নিষিদ্ধ জিনিস থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। (আমীন)