নন মাহরাম থাকলে একজন পুরুষ এর জন্য পারিবারিক সফরে যাওয়া যাবে কিনা
Family Life · Hanafi
Question
আমার পরিবার থেকে একটি ভ্রমণ এর আয়োজন করা হয়েছে, ৩-৪ দিনের সফর। আমার মা, ভাই, ভাই এর স্ত্রী এবং সেই স্ত্রীর আগের বিবাহের মেয়ে, আমার ভাই এর ২ মেয়ে আছে আমাদের পরিবারে। এর সাথে ভাই এর শ্বশুর বাড়ির লোকজন ও যাবে যেখানে আমার গায়রে মাহরাম মানুষ আছে, তবে তাদের সকলের মাহরাম আছে। এই অবস্থায় যেখানে পর্দার বিধান লঙ্ঘন হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেখানে আমার যাওয়ার বা না যাওয়ার বিধান কি? আমি কি সেখানে যাওয়ার মাধ্যমেই গুনাহগার হবো যদি দৃষ্টি নত রাখি এবং অপ্রয়োজনীয় সকল কথা, কাজ পরিহার করি? আমার মন সায় দিচ্ছে না।
এখানে আসলে কি করা উচিত?
Answer
উত্তর: গায়রে মাহরাম উপস্থিত থাকলে পরিবারিক সফরে যাওয়ার বিধান
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে যেখানে গায়রে মাহরাম নারী (ভাইয়ের স্ত্রী, ভাইয়ের স্ত্রীর আগের বিবাহের মেয়ে) এবং অন্যান্য গায়রে মাহরাম ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন এবং পর্দা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে আপনার জন্য এই সফরে না যাওয়াই উত্তম ও নিরাপদ। তবে যদি আপনি যানও, তবুও আপনি গুনাহগার হবেন না, যদি আপনি পর্দার সকল বিধান মেনে চলেন এবং দৃষ্টি নত রাখেন।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. পর্দার বিধান ও সতর্কতা
ইসলামে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ (সূরা আন-নূর: ৩১)
"আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি নত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে।"
২. ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিধান
হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে:
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৩/৮৩)-তে বলা হয়েছে: যে স্থানে পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা সম্ভব নয় এবং গুনাহের আশঙ্কা থাকে, সেখানে না যাওয়া কর্তব্য।
ফাতাওয়া উসমানী (২/১৮৯)-তে এসেছে: গায়রে মাহরাম থাকলে এবং পর্দা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা থাকলে, মুমিনের কর্তব্য হল এমন পরিবেশ থেকে দূরে থাকা।
রদ্দুল মুহতার (৬/৩৭০)-এ বর্ণিত: নারী-পুরুষের মেলামেশার ক্ষেত্রে যেখানে পর্দার বিধান লঙ্ঘনের আশঙ্কা থাকে, সেখানে অংশগ্রহণ করা মাকরূহে তাহরীমী (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)।
৩. আপনার অবস্থার বিশ্লেষণ
আপনার সফরে যেসব নারী আছেন:
- আপনার মা (আপনার মাহরাম)
- ভাইয়ের স্ত্রী (গায়রে মাহরাম)
- ভাইয়ের স্ত্রীর আগের বিবাহের মেয়ে (গায়রে মাহরাম)
- ভাইয়ের ২ মেয়ে (আপনার ভাতিজি = মাহরাম)
- ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ির লোকজন (যেখানে গায়রে মাহরাম আছে)
এখানে সমস্যা হলো:
- গায়রে মাহরাম নারীদের উপস্থিতি
- দীর্ঘ সময় (৩-৪ দিন) একসাথে থাকা
- ভ্রমণের পরিবেশে পর্দা রক্ষা করা কঠিন হতে পারে
- শ্বশুর বাড়ির গায়রে মাহরাম লোকজন
৪. আপনি কি গুনাহগার হবেন?
আপনি যদি পূর্ণ পর্দা মেনে চলেন - অর্থাৎ:
- সর্বদা দৃষ্টি নত রাখেন
- অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও কাজ পরিহার করেন
- গায়রে মাহরামদের সাথে একান্তে না থাকেন
- নারীদের সাথে হ্যান্ডশেক ইত্যাদি না করেন
তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন না। তবে এতে দুটি সমস্যা থেকে যায়:
- অন্যান্য লোকেরা পর্দা লঙ্ঘন করতে পারে
- নিজেকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন
৫. করণীয়
উত্তম পন্থা: আপনি এই সফরে না যান। যদি না যান, তাহলে:
- পর্দার কোনো লঙ্ঘনের সাথে জড়িত হবেন না
- নিজের ঈমান ও আমল সংরক্ষণ করবেন
- পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও দায়িত্বশীল বোধ করবে
বিকল্প পন্থা: যদি যেতেই চান, তাহলে:
- নিয়ত করুন আল্লাহর বিধান রক্ষার জন্য
- পর্দার সকল বিধান কঠোরভাবে পালন করুন
- অপ্রয়োজনীয় স্থানে না যান
- যদি কোনো পর্দা লঙ্ঘন হতে দেখেন, সেখান থেকে সরে আসুন
৬. গুরুত্বপূর্ণ হাদীস
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ "যে বিষয়ে তোমার সন্দেহ হয়, তা ছেড়ে দাও ঐ বিষয়ের জন্য যা তোমার সন্দেহ সৃষ্টি করে না।" (তিরমিযী: ২৫১৮)
আপনার মন সায় না দেওয়ার কারণেই আপনি সঠিক পথেই আছেন। আপনার বিবেক আপনাকে সতর্ক করছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
এই সফর থেকে বিরত থাকাই আপনার জন্য উত্তম ও নিরাপদ। পরিবারের সাথে অন্য কোনো সফরের আয়োজন করতে পারেন যেখানে শুধুমাত্র মাহরাম সদস্যরা থাকবেন অথবা গায়রে মাহরামদের পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা থাকবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পর্দার বিধান মেনে চলার তাওফীক দান করুন। (আমীন)
উল্লেখিত কিতাবসমূহ:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতী আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া / ফাতাওয়া আলমগীরী