মহিলাদের মিলাদ মাহফিল জায়েজ নাকি বিদআত?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
মহিলাদের দ্বারা তালীমে মিলাদ (নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্ম ও জীবনী সম্পর্কিত আলোচনা, দরুদ ও সালাম পাঠ) করা জায়েয, তবে কিছু শর্ত ও সতর্কতা সাপেক্ষে। এটি মূলত বিদআত নয়, যদি তা সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতিতে এবং বিদআতী আকীদা ও রীতি-রীতি থেকে মুক্ত হয়। অন্যথায় যদি এতে কোনো শরীয়ত বহির্ভুত অমূলক বা নব-প্রবর্তিত পদ্ধতি যুক্ত হয়, তবে তা বিদআতে পরিণত হতে পারে।
মিলাদ মাহফিলের মূল বিধান (সাধারণ প্রসঙ্গ)
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
"নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ কর এবং যথাযথভাবে সালাম জানাও।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৬)
এই আয়াতের ভিত্তিতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাঁর জীবনী আলোচনা করাও সওয়াবের কাজ। তাই সাধারণভাবে তাঁর জন্ম, জীবন, চরিত্র ও মুজিযা বর্ণনা করা জায়েয।
তবে নির্দিষ্ট কোনো দিন, মাস বা পদ্ধতি (যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক দরুদ, নির্দিষ্ট নিয়মে কিয়াম, আলোর ব্যবস্থা ইত্যাদি) আবশ্যক বা অপরিহার্য মনে করা বিদআত। হানাফী ফিকহের বড় বড় ইমামগণ এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট মত দিয়েছেন।
হানাফী ইমাম ও গ্রন্থের বক্তব্য
১. মুফতী মুহাম্মদ শফী (رحمة الله عليه) বলেন:
"মিলাদ মাহফিল যদি কুরআন তিলাওয়াত, নবীজীর সীরাত বর্ণনা ও দরুদ-সালামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং তাতে কোনো গর্হিত কাজ (যেমন নারী-পুরুষের মেলা, নবীজীকে আল্লাহর সমান স্থান দেওয়া ইত্যাদি) না থাকে, তবে তা জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। কিন্তু যদি তাতে কোনো বিদআতী বিশ্বাস বা রসম জড়িত হয়, তাহলে তা নাজায়েয।"
(মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আল-আহযাবের তাফসীর; ফাতাওয়া দারুল উলূম, ج ৬, ص ৩৭৪)
২. মুফতী তকী উসমানী (دامت بركاته) তাঁর ফাতাওয়ায় লেখেন:
"মিলাদের মূল বিষয় অর্থাৎ নবীজীর সীরাত আলোচনা, দরুদ ও সালাম পাঠ করা মুস্তাহাব। তবে প্রচলিত অনেক মিলাদ মাহফিলে বিদআতী রীতি (যেমন নির্দিষ্ট তারিখ ফরজ মনে করা, দাঁড়িয়ে দরুদ পড়াকে আবশ্যক ধরা) সংযুক্ত হয়ে গেছে। এগুলো থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। মিলাদ মাহফিলকে সীরাতুন্নবী ও যিকিরের সাধারণ মজলিস হিসেবে গণ্য করতে হবে।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ج ২, ص ۳۸০-৩৮২)
৩. ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) তে এসেছে:
"মিলাদ পড়া বা শোনা জায়েয আছে, তবে তাতে কোনো অপছন্দনীয় কাজ (যেমন নানাবিধ রসম-রেওয়াজ, নির্দিষ্ট পন্থা আবশ্যক মনে করা) না থাকতে হবে।"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ج ৫, ص ১৯৫)
৪. রদ্দুল মুহতার (আলাউদ্দীন হাসকাফী) তে বিদআত সম্পর্কে বলা হয়েছে:
"বিদআত বলতে সেই পদ্ধতিকে বুঝায় যা দীনের মধ্যে নতুন করে সংযোজিত এবং যার মূল দীনে কোনো ভিত্তি নেই। আর যার ভিত্তি দীনে আছে (যেমন দরুদ পাঠ, কুরআন তিলাওয়াত) কিন্তু তাতে শুধু সময়, সংখ্যা বা পদ্ধতি নির্ধারণ করে ফরজ বা ওয়াজিব মনে করা বিদআতে যেতে পারে।"
(রদ্দুল মুহতার, ج ১, ص ৫৬২)
মহিলাদের মিলাদ মাহফিলের বিশেষ বিধান
মহিলাদের জন্য তালীমে মিলাদ বা মিলাদ মাহফিল জায়েয হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো অবশ্যই পালন করতে হবে:
- পৃথক আবস্থান: মাহফিল সম্পূর্ণরূপে মহিলাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। কোনো অমহরম পুরুষের উপস্থিতি থাকবে না।
- কণ্ঠস্বর: মহিলারা উচ্চস্বরে দরুদ বা সালাম পড়বেন না যাতে অমহরম পুরুষ বা বাইরের লোকজন শুনতে পায়। (তবে নিজেদের মধ্যে স্বাভাবিক আওয়াজে পড়া যাবে)
- পর্দা: স্থানটি এমন হবে যাতে বাইরে থেকে দেখা না যায়। যদি জানালা ইত্যাদি থাকে তবে পর্দার ব্যবস্থা করতে হবে।
- বিদআত থেকে বিরত: মিলাদকে নির্দিষ্ট তারিখ বা সময়ের সাথে ওয়াজিব মনে করা যাবে না। নির্দিষ্ট নিয়মে কিয়াম (দাঁড়ানো) বা নির্দিষ্ট সংখ্যায় দরুদ আবশ্যক ভাবা বিদআত।
- শরয়ী বাধানিষেধ: কোনো প্রকার গান-বাদ্য, নারী-পুরুষের মেলামেশা, অযথা খরচ বা অপচয় করা যাবে না।
এই শর্তগুলো বজায় থাকলে মহিলাদের নিজেদের মধ্যে মিলাদ মাহফিল জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। অন্যথায় তা বিদআত বা অপছন্দনীয় হতে পারে।
তবে অনেক হানাফী ফকীহ (যেমন মুফতী তকী উসমানী) বলেছেন: মিলাদ মাহফিলকে তালীম (শিক্ষা) হিসেবে গ্রহণ করলে তা আরও উত্তম। অর্থাৎ নবীজীর জীবনী থেকে শিক্ষা নেওয়া, তাঁর আদর্শ আলোচনা করা এবং দরুদ পাঠ করা – এটাই মিলাদ মাহফিলের মূল উদ্দেশ্য হওয়া চাই। আকীদা-বিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড বা বিশ্বাস যুক্ত হলে তা নাজায়েয।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রশ্ন: মহিলারা তালিমে মিলাদ পড়ে। এটা জায়েজ না বিদআত?
উত্তর:
✔ জায়েজ – যদি নিম্ন শর্তগুলো পূরণ হয়:
- শুধু মহিলাদের সমাবেশ হয়, অমহরম পুরুষ না থাকে।
- কণ্ঠস্বর অমহরমের কাছে পৌঁছানো না হয়।
- মিলাদকে ফরজ, ওয়াজিব বা আবশ্যক মনে না করা হয়।
- কোনোরূপ নির্দিষ্ট রসম-রেওয়াজ (যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যক দরুদ, কিয়াম, মিছিল ইত্যাদি) দীনের অংশ হিসেবে বিশ্বাস না করা হয়।
- আলোচনা ও দরুদ-সালামের মাধ্যমে নবীজীর প্রতি ভালোবাসা ও শিক্ষা গ্রহণ করা হয়।
✘ বিদআত – যদি কোনো শরয়ী অনুমোদন ছাড়া নতুন রীতি যুক্ত হয়, যেমন:
- নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়কে আবশ্যক মনে করা,
- অমহরম পুরুষের উপস্থিতি বা মেলা,
- গান-বাদ্যর মাধ্যমে মিলাদ উদযাপন,
- নবীজীকে আল্লাহর স্থানে বসানো বা অতিরঞ্জিত বিশ্বাস পোষণ করা,
- নির্দিষ্ট পদ্ধতি (যেমন দাঁড়ানো, ফুল দেওয়া, আগরবাতি ইত্যাদি) ইবাদতের অংশ মনে করা।
সারমর্ম: মহিলাদের জন্য তালীমে মিলাদ জায়েয, তবে তা বিদআতমুক্ত ও পূর্ণ শরয়ী পর্দার মধ্যে হতে হবে। যেমন মুফতী তকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম ফাতাওয়া উসমানীতে বলেন: "মিলাদ মাহফিল যদি একটি সাধারণ যিকির ও সীরাত মজলিস হয় এবং তাতে কোনো বিদআতী বিশ্বাস বা রসম না থাকে, তবে তা জায়েয।"
সতর্কতা: কোনো কাজকে দীনের অংশ মনে করে করলেই সেটি বিদআত হয়। সাধারণ মিলাদ আলোচনা যদি বিদআতী নিয়ত ছাড়া করা হয়, তাহলে তা বিদআত নয় বরং সুন্নত (যেমন দরুদ ও সীরাত চর্চা)।