বিবাহের উদ্দেশ্যে পাত্রকে দ্বীনি প্রশ্ন করা এবং অভিভাবকের মতামত জানতে চাওয়া কি জায়েজ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
উল্লেখ্য যে,প্রশ্নের উত্তর এবং যা জানতে চাওয়া হয়েছে সব আরেকজনকে পাঠানো হয়েছে এবং অভিভাবককেও জানানো হয়েছে।
সরাসরি সামনাসামনি এতোগুলা প্রশ্ন করা যেতো না এবং পরিবারও জিজ্ঞেস করতো না এসব(যেহেতু দ্বীনি জ্ঞান নেই)।
আর পাত্রের বায়োডাটাতে বিস্তারিত তেমন কিছু উল্লেখ ছিলো না বিধায় এই পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছে।
জানাবেন,ইংশাআল্লহ
জাযাকুমুল্লাহু খইরন ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আখিরহ।
Answer
উত্তরঃ
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: একজন সম্ভাব্য পাত্রের সাথে বিবাহের উদ্দেশ্যে সরাসরি দেখা-সাক্ষাতের কোনো মাধ্যম না থাকায়, অভিভাবকের নির্দেশে তাকে শুধুমাত্র দ্বীনি বিষয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে এবং তার পরিবারের মতামত জানতে চাওয়া হচ্ছে। এই পদ্ধতি কি গুনাহ বা নাজায়েজ?
উত্তর: প্রথমত, ইসলামে অ-মাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। বিবাহের উদ্দেশ্যে মেয়ে বা ছেলেকে দেখা জায়েজ, তবে গোপনীয়তা ও ফিতনার আশঙ্কা থেকে বাঁচতে শরিয়ত নির্দিষ্ট পদ্ধতি দিয়েছে।
হানাফি ফিকহের আলোকে মূলনীতি:
- বিবাহের প্রস্তাবের জন্য পাত্র বা পাত্রীকে দেখার অনুমতি আছে, তবে তা শুধু প্রয়োজনীয় পরিমাণে এবং পর্দার সাথে হতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮৪)
- অ-মাহরামের সাথে সরাসরি টেলিফোন বা মেসেজে কথা বলা মূলত নাজায়েজ, যদি তা ফিতনার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। তবে প্রয়োজনে (যেমন বিবাহের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য জানা) এবং অভিভাবকের উপস্থিতি ও অনুমতি সাপেক্ষে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় আলোচনার জন্য জায়েজ হতে পারে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৮৩)
- বিশেষ করে যখন পূর্ণাঙ্গ মাধ্যম (সরাসরি দেখা, পরিবারের মাধ্যমে) না থাকে এবং অভিভাবক নিজেই এ পদ্ধতি নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন প্রয়োজনের তাগিদে (দারুরাহ) এ ধরনের সীমিত ও শর্তসাপেক্ষ যোগাযোগ বৈধতার আওতায় আসতে পারে, তবে কোনো গুনাহ হবে না— ইনশাআল্লাহ।
প্রদত্ত পরিস্থিতির বিশ্লেষণ:
- আপনি শুধুমাত্র দ্বীনি বিষয়ক প্রশ্ন করেছেন এবং অভিভাবকের মতামত জানতে চেয়েছেন— এটি অশ্লীল বা ফালতু কথোপকথন নয়।
- উল্লেখ্য যে, প্রশ্নের উত্তর ও তথ্য অন্য একজনকে (সম্ভবত মাহরাম বা অভিভাবক) পাঠানো হয়েছে এবং অভিভাবককে অবহিত করা হয়েছে, অর্থাৎ গোপনীয়তা বা ফিতনার সুযোগ নেই।
- পাত্রের বায়োডাটায় বিস্তারিত না থাকায় এবং পরিবার দ্বীনি জ্ঞানের অভাবে সরাসরি প্রশ্ন করতে অপারগ হওয়ায় এই পন্থা প্রয়োজনীয় (দারুরাহ) পর্যায়ে পড়ে।
সিদ্ধান্ত: উক্ত পদ্ধতি— যেখানে শুধু দ্বীনি প্রশ্ন ও অভিভাবকের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে, এবং তা অভিভাবকের নির্দেশে ও স্বীকৃতিতে করা হচ্ছে— গুনাহ বা নাজায়েজ হবে না ইনশাআল্লাহ। তবে আপনাকে কিছু সতর্কতা মেনে চলতে হবে:
১. মেসেজিং শুধু প্রয়োজনীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখবেন, অপ্রয়োজনীয় বা আবেগপূর্ণ কথাবার্তা পরিহার করবেন।
★ফিতনার আশংকা থাকা যাবেনা,অডিও/ভিডিও কল করা যাবেনা,কথা রেকর্ড করে পাঠানো যাবেনা।
২. সম্ভব হলে মেসেজের কপি অভিভাবককে দেখাবেন বা কমপক্ষে তাকে জানিয়ে রাখবেন (যা আপনি ইতিমধ্যে করছেন)। ৩. কোনো অবস্থাতেই একান্তে বা গোপনে (তৃতীয় ব্যক্তি ছাড়া) কথা বলা যাবে না। ৪. সুযোগ পেলে সরাসরি অভিভাবক ও মাহরামের উপস্থিতিতে দেখা-সাক্ষাৎ ও আলোচনার ব্যবস্থা করুন।
প্রাসঙ্গিক দলিল:
قال في الدر المختار ورد المحتار: "(وَيَجُوزُ) النَّظَرُ لِلْخِطْبَةِ... وَلاَ يَزِيدُ عَلَى مَرَّةٍ إِلاَّ أَنْ يَكُونَ لَمْ يَرَ فَيَكُونَ لَهُ نَظْرَتَانِ" (رد المحتار، ٣/٦٦)
অর্থ: "বিবাহের প্রস্তাবের জন্য দেখা জায়েজ... একবারের বেশি দেখা জায়েজ নয়, তবে যদি প্রথম দেখায় ঠিকমত না দেখে থাকে তবে দু'বার দেখা যেতে পারে।"
وفي الفتاوى الهندية: "وَإِذَا كَانَتْ لِلرَّجُلِ حَاجَةٌ إِلَى الْكَلَامِ مَعَ الْمَرْأَةِ الْأَجْنَبِيَّةِ فَلَا بَأْسَ بِهِ إذَا كَانَ بِحَضْرَةِ أَهْلِهَا وَأَمْكَنَ الِاحْتِرَازُ عَنْ الْفِتْنَةِ" (الفتاوى الهندية، ٥/٣٤٣)
অর্থ: "যদি কোনো পুরুষের কোনো অ-মাহরাম নারীর সাথে কথা বলার প্রয়োজন হয়, তাহলে তা যদি তার পরিবারের উপস্থিতিতে হয় এবং ফিতনা থেকে বাঁচা সম্ভব হয়, তবে তাতে দোষ নেই।"
উপসংহার: আপনার বর্ণিত শর্তগুলো (অভিভাবকের অনুমতি, তথ্যের স্বচ্ছতা, প্রয়োজনীয়তা) বর্তমান থাকলে সেক্ষেত্রে উপরে উল্লেখিত শর্তাবলী সাপেক্ষে এটি নাজায়েজ বা গুনাহের কাজ নয়। বরং পাত্রের দ্বীনি বিষয়ে জানার জন্য বৈধ।
আল্লাহ তাআলা আপনার বৈধ বিবাহকে সহজ করুন এবং বরকত দিন। আমীন।
والله أعلم بالصواب