ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ.-এর "ইসলামী আকীদা" বইটি নিয়ে হানাফী মাযহাবের দৃষ্টিতে কী কী সমস্যা রয়েছে এবং তা কতটুকু সত্য?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الأمين وعلى آله وأصحابه أجمعين أما بعد
প্রশ্নের উত্তর:
আপনি যে বইটির কথা উল্লেখ করেছেন—"ইসলামী আকীদা" (লেখক: ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ.)—এ সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাব এবং উসূলবিদদের নীতিমালা অনুযায়ী আমরা বিষয়টি বিশ্লেষণ করছি।
১. বইটির পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (১৯৬০-২০১৬) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেম, লেখক ও দাঈ। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ায় অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর লেখা "ইসলামী আকীদা" বইটি বাংলাদেশের মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আকীদা বিষয়ে বহুল পঠিত একটি বই।
তবে এই বইটি নিয়ে বিতর্ক মূলত নিম্নলিখিত কারণে সৃষ্টি হয়েছে:
২. বইটিতে যেসব বিষয়ে সমালোচনা রয়েছে
হানাফী আলেমগণ এবং আকীদাবিদগণ (বিশেষত দেওবন্দী ও বরেলভী উভয় পক্ষ থেকেই) বইটির কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। প্রধান আপত্তিগুলো হলো:
(ক) সালাফী/আছারী পদ্ধতির প্রাধান্য: লেখক বইটিতে আকীদার ক্ষেত্রে সালাফদের (আছারীদের) পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে আশআরী ও মাতুরীদী (যা হানাফী মাযহাবের আকীদার ভিত্তি) পদ্ধতিকে দুর্বল বলে চিত্রিত করেছেন। যেমন—সিফাত (গুণাবলি) বিষয়ে তাফবীয (অর্থ না করে আল্লাহর উপর ছেড়ে দেওয়া) বনাম তা'বীল (ব্যাখ্যা করা) নিয়ে আলোচনায় তিনি আছারী পদ্ধতিকে সমর্থন করেছেন, যা হানাফী মাযহাবের মূলধারার (মাতুরীদী) পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক।
(খ) তাকলীদের সমালোচনা: বইটির কিছু অংশে তিনি ফিকহী মাসআলায় অন্ধ তাকলীদের সমালোচনা করেছেন এবং সরাসরি কুরআন-হাদীস অনুসরণের উপর জোর দিয়েছেন। যদিও তিনি তাকলীদের সম্পূর্ণ অস্বীকারকারী ছিলেন না, তবুও তাঁর ভাষ্যকে অনেক হানাফী আলেম "তাকলীদের প্রতি অনীহা" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
(গ) মীলাদ, ওসিলা ও অন্যান্য আমল সম্পর্কে অবস্থান: তিনি মীলাদুন্নবী (সা.), ওসিলা, উরস ইত্যাদি বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এবং এসবকে বিদ'আত বা শিরকের পর্যায়ে ফেলেছেন (যদিও সবগুলোকে শিরক বলেননি)। এ কারণে বাংলাদেশের সুফী-বেরলভী পক্ষের আলেমরা তাঁর বইকে "সমস্যাযুক্ত" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
(ঘ) কিছু হাদীসের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা: আকীদার কিছু জটিল মাসআলা (যেমন: আরশ, কুরসী, আল্লাহর হাত-চোখ ইত্যাদি) নিয়ে তিনি যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা হানাফী মাতুরীদী পদ্ধতির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
৩. হানাফী ফিকহ ও আকীদার প্রামাণ্য দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাবের আকীদাগত ভিত্তি হলো ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরীদী (রহ.)-এর পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে:
- সিফাত (গুণাবলি) বিষয়ে তা'বীল (যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা) করা হয়, যেমন—"ইয়াদুল্লাহ" অর্থ আল্লাহর ক্ষমতা/রহমত, "ইস্তিওয়া" অর্থ আরশের উপর অধিষ্ঠান (যা আমাদের ধারণার মতো নয়)।
- তাকলীদ ফিকহী মাসআলায় সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি এবং এটি বৈধ ও প্রয়োজনীয়।
- ওসিলা, মীলাদ ইত্যাদি বিষয়ে হানাফী ফুকাহারা সাধারণত সহনশীল অবস্থান নিয়েছেন, যদিও সেগুলোকে "মুস্তাহাব" বলেছেন (তবে শিরক বলেননি)।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর রদ্দুল মুহতার-এ এবং আল্লামা শামী (রহ.) ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, আকীদার ক্ষেত্রে মাতুরীদী পদ্ধতিই আহলুস সুন্নাহর মূল পদ্ধতি।
৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও ফতোয়া
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে:
১. বইটিতে কিছু বিষয়ে সমস্যা আছে—বিশেষত হানাফী মাতুরীদী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক কিছু ব্যাখ্যা এবং তাকলীদ সম্পর্কিত নেতিবাচক ধারা। তাই হানাফী মাযহাবের অনুসারী সাধারণ মুসলিমের জন্য বইটি শর্তসাপেক্ষে পাঠ করা উচিত।
২. তবে বইটিকে সম্পূর্ণ বর্জন করা বা লেখককে গোমরাহ বলা সঠিক নয়। তিনি অনেক বিষয়ে সঠিক ও প্রামাণ্য কথা বলেছেন। তাঁর বইয়ে তাওহীদ, শিরক, রিসালাত ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ে অনেক ভালো আলোচনা আছে।
৩. যাদের জন্য বইটি সমস্যাযুক্ত:
- যারা হানাফী মাযহাবের আকীদা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন না, তারা বইটি পড়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন।
- যারা তাকলীদের গুরুত্ব বোঝেন না, তাদের জন্য বইটির কিছু অংশ ক্ষতিকর হতে পারে।
৪. পঠন-পদ্ধতি: বইটি পড়ার সময় হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য আকীদার কিতাব (যেমন: আল-আকীদাতুত তাহাবী ও তার ব্যাখ্যা, শারহুল আকাইদ, বাহিশতী জেওর-এর আকীদা অধ্যায়) সাথে মিলিয়ে পড়া উচিত। প্রয়োজনে কোনো বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. সংশ্লিষ্টদের জন্য পরামর্শ
- সাধারণ মুসলিম: আকীদার মৌলিক বিষয়গুলো (তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত) জানার জন্য বইটি পড়া যেতে পারে, তবে সিফাত ও তাকলীদ সম্পর্কিত অধ্যায়গুলো পড়ার সময় সতর্ক থাকুন।
- তালিবুল ইলম: হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য কিতাবসমূহ (যেমন: শারহুল আকাইদ, তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, ফাতাওয়া উসমানী) অধ্যয়ন করে তারপর বইটি সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে পড়ুন।
- সাধারণ মানুষ: বইটি নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়ে সরাসরি কোনো মুফতী বা বিশ্বস্ত আলেমের কাছে প্রশ্ন করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ। তিনি আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।