মিথ্যা নিজেকে ডিভোর্সি দাবি করলে তালাক হয় কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
ডিভোর্সি পাত্রী অবিবাহিত পাত্রী চাইতাম আমার বিবাহিত অবস্থায়।
এখন কয়বার পোস্ট দিছি আর কয়বার পোস্টে নিজেকে ডিভোর্সি দাবি করছি মনে নাই। অনেক খুজে দেখলাম একটা পোস্ট পাইছি যেখানে আমি বিবাহিত অবস্থায় নিজেকে ডিভোর্সি দাবি করে পাত্রী চাইছি।
আই ফতোয়ার কিছু পোস্ট এ দেখলাম বিবাহ নিয়া ডিভোর্স নিয়া মিথ্যা বললে কিছু হয় না৷ তার পর ও আরো যাচাই করো
এতে কি তালাক হবে মিথ্যা ডিভোর্স ই বলার কারনে কারন আমি তো বিবাহিত ছিলাম? উদ্দেশ্য মজা করা। মেসেঞ্জার টায় ঢুকতে পারতেছি না ঢুকলে আরো বুঝতে পারতাম আরো কয়বার নিজেকে ডিভোর্সি দাবি করছি কিনা৷
তো এই নিজেকে মিথ্যা ডিভোর্সি দাবি করলে উপরের প্রেক্ষিতে তালাক হবে কিনা?
Answer
উত্তর: আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—
আপনি মিথ্যা নিজেকে ‘ডিভোর্সি’ (তালাকপ্রাপ্ত) দাবি করলেও এর দ্বারা আপনার স্ত্রীর উপর কোনো তালাক পতিত হবে না। কারণ এটি তালাকের স্পষ্ট বা ইঙ্গিতমূলক শব্দের মাধ্যমে তালাক দেওয়া নয়, বরং নিজের অবস্থা সম্পর্কে একটি মিথ্যা তথ্য প্রদান মাত্র। তালাক হওয়ার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন: "আমি তোমাকে তালাক দিলাম") বা ইঙ্গিতমূলক শব্দ (যেমন: "তুমি মুক্ত") তালাকের নিয়তে বলা আবশ্যক। ‘আমি ডিভোর্সি’ বা ‘আমি তালাকপ্রাপ্ত’ বলা তালাকের শব্দ নয়, বরং নিজের সম্পর্কে একটি বক্তব্য। তাই এতে তালাক হয় না।
তবে এ কথা বলা জঘন্য গুনাহের কাজ, কারণ এটি মিথ্যা, ধোঁকা দেওয়া, এবং নিজেকে এমন অবস্থায় দাবি করা যা বাস্তবে নয়। এর জন্য আপনাকে তওবা-ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
বিস্তারিত দলিল ও ফিকহি বিশ্লেষণ (হানাফি মাজার)
১. তালাকের শর্ত ও প্রকৃতি
হানাফি ফিকহ অনুসারে তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীকে অবশ্যই তালাকের শব্দ (সারিহ বা কিনায়া) ব্যবহার করে তালাকের ইচ্ছে প্রকাশ করতে হবে।
- সারিহ (স্পষ্ট) শব্দ: যেমন ‘আমি তোমাকে তালাক দিলাম’, ‘তুমি তালাকপ্রাপ্ত’ ইত্যাদি। এ ধরনের শব্দে নিয়তের প্রয়োজন নেই; তালাক পতিত হয়।
- কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দ: যেমন ‘তুমি মুক্ত’, ‘তুমি আমার কাছে হারাম’ ইত্যাদি। এখানে তালাকের নিয়ত থাকলে তালাক পতিত হয়, না থাকলে হয় না।
‘আমি ডিভোর্সি’ বা ‘আমি তালাকপ্রাপ্ত’—এই বাক্যটি তালাকের সারিহ বা কিনায়া কোনোটিই নয়। এটি তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার খবর বা নিজের অবস্থা বর্ণনা করা। তালাকের ইচ্ছে ছাড়া এ ধরনের বক্তব্যে তালাক পতিত হয় না।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত:
যদি কেউ বলে, ‘আমি তালাকপ্রাপ্ত’ (أنا مطلق) এবং তার তালাকের ইচ্ছে থাকে, তাহলে ইমাম আবু হানিফার মতে এটি তালাক গণ্য হবে (যেহেতু এটি কিনায়া শব্দ হিসেবে ধরা যেতে পারে যদি উদ্দেশ্য তালাক হয়)। কিন্তু যদি তার তালাকের ইচ্ছে না থাকে, তবে তালাক পতিত হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৮)
আপনার ক্ষেত্রে আপনি স্পষ্টতই মজা করার উদ্দেশ্যে নিজেকে ডিভোর্সি দাবি করেছেন, তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আপনার ছিল না। তাই কোনো তালাক পতিত হয়নি।
২. মিথ্যা দাবি ও তার পরিণতি
মিথ্যা বলা এবং নিজেকে ডিভোর্সি দাবি করা গুনাহের কাজ। এতে আপনার ঈমান ও চরিত্রের জন্য ক্ষতি, তবে তালাকের কোনো প্রভাব নেই।
- হাদিস: “যে ব্যক্তি মিথ্যা বলল, তার প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর লা’নত বর্ষিত হয়।” (আবু দাউদ)
- ফতোয়া: আপনি ফেসবুক গ্রুপে পাত্রী চাওয়া এবং নিজেকে ডিভোর্সি দাবি করা—এ দুটোই নাজায়েজ ও হারাম। বিবাহিত অবস্থায় অন্যদের কাছে বিবাহযোগ্য পাত্রী চাওয়া জিনার দিকে ধাবিত করতে পারে এবং পরিবারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।
৩. পূর্ববর্তী ফতোয়ার সমর্থন
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, ‘বিবাহ ও ডিভোর্স নিয়ে মিথ্যা বললে কিছু হয় না’—এমন একটি ফতোয়া দেখেছেন। এটি সম্ভবত সঠিক যে শুধু মৌখিক দাবিতে তালাক পতিত হয় না, তবে গুনাহ থেকে যায়। তবে এই ফতোয়ার অর্থ এই নয় যে মিথ্যা বলা জায়েজ। ফতোয়াটি শুধু তালাকের হুকুম সম্পর্কে।
আরও বিশুদ্ধ মত:
ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেন, “যদি কেউ বলে ‘আমি তালাকপ্রাপ্ত’, অথচ বাস্তবে তালাকপ্রাপ্ত নয়, তাহলে তালাক পতিত হবে না, তবে সে মিথ্যাবাদী হবে এবং এর জন্য তওবা করা ওয়াজিব।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯১)
৪. মেসেঞ্জার ও পুরনো পোস্ট সম্পর্কে
আপনি মেসেঞ্জারে লগইন করতে না পারলেও বিষয়টি পরিষ্কার: আপনি একবার বা একাধিকবার নিজেকে ডিভোর্সি দাবি করেছেন—এতে তালাক হয়নি। তবে আপনি কতবার এমন পোস্ট দিয়েছেন, তা খুঁজে বের করে সেসব পোস্ট ডিলিট করে দেওয়া উচিত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
চূড়ান্ত ফতোয়া:
আপনার বর্তমান বিবাহ বৈধ ও অটুট রয়েছে। মিথ্যা ডিভোর্সি দাবির কারণে আপনার স্ত্রীর প্রতি কোনো তালাক পতিত হয়নি। তবে এই কাজটি কবিরা গুনাহ। আপনাকে অবশ্যই এ কাজ থেকে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অসৎ উদ্দেশ্যে পাত্রী চাওয়া ও মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সনদভিত্তিক হানাফি গ্রন্থসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন) – ৩/২৯১
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া – ১/৩৭৮
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তকি উসমানি) – ২/৫৪২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) – ২/২৮৫
আল্লাহ তাআলা সবাইকে হেদায়েত দান করুন।