‘হুম’ (Hmm) তালাকের কেনায়া বাক্য নাকি?
Family Life · Shafei
Question
Answer
উত্তর: ‘হুম’ (Hmm) শব্দটি শাফি‘ঈ মাযহাবে তালাকের কিনায়া (পরোক্ষ বাক্য) হিসেবে গণ্য নয়। তাই এটি উচ্চারণ করলে বা লিখলে তালাক পতিত হয় না—এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদের নিয়ত থাকলেও। নিম্নে বিস্তারিত দলীল-প্রমাণসহ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. তালাকের বাক্যের প্রকারভেদ (শাফি‘ঈ মাযহাব)
শাফি‘ঈ ফিকহে তালাকের বাক্য দুই প্রকার:
-
সরীহ (স্পষ্ট): যেমন ‘তালাক’, ‘আমি তোমাকে তালাক দিলাম’ ইত্যাদি। এ ধরনের বাক্যে নিয়তের প্রয়োজন নেই; উচ্চারণ করলেই তালাক পতিত হয়।
(আল-মাজমূ‘ ১৬/২৪৪; মুগনী আল-মুহতাজ ৪/২৮০) -
কিনায়া (পরোক্ষ): যে বাক্য তালাকের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে, আবার অন্য অর্থেও বুঝানো সম্ভব। যেমন: ‘তুই মুক্ত’, ‘তোর পরিবারের কাছে যা’, ‘আমার আর প্রয়োজন নেই’ ইত্যাদি। এ ধরনের বাক্যে তালাক পতিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়ত আবশ্যক।
(মিনহাজ আত-তালিবীন; তুহফাত আল-মুহতাজ ৭/৩৮৫; নিহায়াত আল-মুহতাজ ৬/২৫২)
২. ‘হুম’ (Hmm) কি কিনায়া?
‘হুম’ একটি ধ্বনি বা আওয়াজ, কোনো অর্থপূর্ণ শব্দ নয়। এটি সাধারণত চিন্তা, ইতস্তত বা নিরুত্তরতার প্রকাশ। আরবি ভাষায়ও ‘হুম’ তালাকের কিনায়া হিসেবে গণ্য নয়। শাফি‘ঈ ফিকহের কিতাবসমূহে তালাকের কিনায়া হিসেবে উল্লিখিত শব্দগুলোর মধ্যে ‘হুম’ নেই। যেমন—
- ‘ألحقي بأهلك’ (তুমি তোমার পরিবারের কাছে যাও)
- ‘اذهبي’ (যাও)
- ‘أنت حرام’ (তুমি হারাম)
- ‘اعتدي’ (ইদ্দত পালন করো)
- ‘خليت سبيلك’ (আমি তোমার পথ ছেড়ে দিলাম)
ইত্যাদি।
(আল-উম্ম ৫/২৪৪; আল-মাজমূ‘ ১৬/৩৩৭; ফাতহ আল-মু‘ঈন ৩/৪২৫)
সুতরাং ‘হুম’ কোনো প্রকারেই তালাকের কিনায়া নয়।
৩. এখানে নিয়তের ভূমিকা কী?
কিনায়ায় নিয়ত আবশ্যক, তবে তা কেবল তখনই কার্যকর হয় যখন বাক্যটি তালাকের সম্ভাবনা রাখে। যেহেতু ‘হুম’ নিজেই তালাকের কোনো অর্থ বহন করে না, সেহেতু নিয়ত থাকলেও তালাক পতিত হবে না। ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
“কিনায়া হলো এমন বাক্য যা দ্বারা তালাক বা অন্য কিছু বুঝানো সম্ভব। আর তাই তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। বাক্যটি যদি তালাকের অর্থের জন্যই সম্ভাবনাময় না হয়, তবে তা কিনায়াই নয়।”
(আল-মাজমূ‘ ১৬/৩৩৬)
অর্থাৎ, ‘হুম’ শব্দটির মধ্যে তালাকের কোনো সম্ভাবনা নেই—বরং এটি একটি নিরর্থক আওয়াজ। তাই নিয়ত থাকা সত্ত্বেও তালাক পতিত হয় না।
৪. স্বামী যদি একা একা বা কোনো প্রশ্নের জবাবে না বলে ‘হুম’ উচ্চারণ করে
এক্ষেত্রেও কোনো তালাক হয় না। কারণ উচ্চারণের মাধ্যমটি নিজেই তালাকের বাক্য নয়। এমনকি স্বামী যদি মনে মনে তালাকের চিন্তা করে ‘হুম’ বলে, তবুও তালাক পতিত হয় না।
শাফি‘ঈ মাযহাবের মূলনীতি: তালাকের জন্য সুস্পষ্ট বা পরোক্ষ বাক্য ব্যবহার আবশ্যক।
(মুগনী আল-মুহতাজ ৪/২৮০-২৮১)
৫. ‘হুম’ লিখে প্রশ্ন করার সময় যদি মনে তালাকের চিন্তা আসে
লেখাও উচ্চারণের মতো একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত। কোনো অর্থপূর্ণ বাক্য ছাড়া শুধু ‘হুম’ লেখা তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়—এমনকি লেখার সময় তালাকের নিয়ত থাকলেও। কারণ লেখাটি তালাকের ইঙ্গিতবাহী নয়।
ইমাম ইবন হাজার আল-হায়তামী (রহ.) বলেন:
“লিখিত তালাকের বিধান মৌখিক তালাকের মতোই। তবে তা তখনই কার্যকর হয় যখন লিখিত বাক্যটি সরীহ বা কিনায়া নিয়তে ব্যবহৃত হয়। আর ‘হুম’ তো কোনো শব্দই নয়।”
(তুহফাত আল-মুহতাজ ৭/৪০০)
৬. সারসংক্ষেপ
- ‘হুম’ তালাকের কিনায়া নয়।
- নিয়ত থাকলেও তালাক পতিত হবে না।
- একা একা বলা, জবাবে বলা, বা মনে তালাকের চিন্তা এসে বলা—সব অবস্থায় তালাক হয় না।
- লিখিত ‘হুম’-এর ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য।
৭. নিরাপদ পথ
যদিও ‘হুম’ দ্বারা তালাক হয় না, তবুও বিবাহিত জীবনে এ ধরনের অস্পষ্ট ধ্বনি এড়িয়ে চলা উত্তম।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও সর্বাধিক জ্ঞানী।
REFERENCES (শাফি‘ঈ সূত্র):
- আল-উম্ম (ইমাম শাফি‘ঈ)
- আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব (ইমাম নববী)
- মিনহাজ আত-তালিবীন ওয়া উমদাত আল-মুফতীন (ইমাম নববী)
- মুগনী আল-মুহতাজ (শাইখ খতীব আল-শিরবিনী)
- তুহফাত আল-মুহতাজ বি শারহিল মিনহাজ (ইবন হাজার আল-হায়তামী)
- নিহায়াত আল-মুহতাজ (ইমাম রামলী)
- ফাতহ আল-মু‘ঈন বি শারহি কুররাত আল-‘আইন (শাইখ মালিবারী)