রিসেলিং ব্যবসা করা কি জায়েয?

Business and Job · Hanafi

Question No: 2801
Questioner: Sha Fi
Question Asked: 17 Jul 2026, 12:21 PM
Reviewed & Published: 17 Jul 2026, 01:41 PM
Views: 47
Tokens: 8,017
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস্সালামুআলাইকুম শায়খ

শায়খ আমি রিসেলিং করি। স্কিন কেয়ার পণ্য, ছাতা, কুকার, চকলেট, ত্রি পিস, জুয়েলারি, শাড়ি, ইলেকট্রিক জিনিসপত্র, ঘর সাজানোর বিভিন্ন লাইট, এসবের। এসব আমার কাছে নেই। পন্যের মালিক থেকে কথা হয়েছে যে আমি এগুলো ফেইসবুকে পোস্ট করে অর্ডার এনে দিবো আর মালিক ডেলিভারি করে দিবে। আর মালিক নির্দিষ্ট একটা দাম দেয় সেই দাম থেকে আমি ২০, ৫০, ১০০, ২০০, ৩০০ এরকম বেশি করে বিক্রি করে এই টাকা টা আমি নেই। এটা মালিক বলে দিয়েছে যত বেশি বিক্রি করি সেটা আমার। এরকম লাভ করে সেল করেছি আমি। আবার কুকারের মালিক বলেছে আমি যদি ৩০০০৳ পণ্য সেল করি তাহলে আমাকে ৫০৳ দিবে আর এর উপরে করলে ১০০৳ দিবে। আর পণ্য গুলো অরজিনাল ছবিতে যেরকম সেইরকমই দেয়া হয় কাস্টমারকে।

আবার মালিক কোনো ডেলিভারি রিটার্ন আসলে সেটার চার্জ আমাকে দিতে হবে সেটাই রাজি হয়েছি আমি

আমি শুনেছি যে রিসেলিং এর দুটি পদ্ধতি আছে কিন্তু আমার কোন পদ্ধতি সেটা বুঝতে পারছিনা। এখন প্রশ্ন হলো শায়খ আমার এরকম কাজ করা কি হালাল! আমি কি এই কাজটি করা চালিয়ে যাব নাকি বাদ দিয়ে দিবো দয়া করে বিস্তারিত জানালে অনেক উপকার হবে ইনশাআল্লাহ।এটা নিয়ে অনেক চিন্তায় আছি

Answer

উত্তর: وعلیکم السلام و رحمة الله و برکاته

আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে রিসেলিং (পুনঃবিক্রয়) করার কাজটি জায়েজ (বৈধ) হবে, তবে কিছু শর্ত ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নিচে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।


আপনার পদ্ধতিটি কী ধরনের?

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনি পণ্যের মালিক নন; বরং আপনি দালাল (এজেন্ট/ব্রোকার) হিসেবে কাজ করছেন। আপনি পণ্যের ছবি ও বিবরণ সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন, ক্রেতা অর্ডার দিলে তা মালিকের কাছে পাঠান, এবং মালিক সরাসরি পণ্য ডেলিভারি দেন। এর বিনিময়ে মালিক আপনাকে একটি নির্দিষ্ট মূল্যের উপরে অতিরিক্ত লাভ (বা কমিশন) দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

এটি দালালি বা কমিশন এজেন্সি-এর অন্তর্ভুক্ত, যা হানাফি ফিকহে জায়েজ, তবে শর্তসাপেক্ষে।


হানাফি ফিকহের মূলনীতি

  1. পণ্যের মালিকানা ছাড়া বিক্রি:
    হাদিসে এসেছে, “তুমি যা মালিক নও, তা বিক্রি করো না।” (সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি) কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আপনি সরাসরি বিক্রেতা নন; বরং আপনি মধ্যস্থতাকারী (দালাল)। মালিকের অনুমতি নিয়ে আপনি ক্রেতা ও মালিকের মধ্যে যোগাযোগ করাচ্ছেন। এটি দালালি হিসেবে গণ্য হবে, যা জায়েজ।

  2. দালালির শর্ত:

    • দালালের কাজ পরিষ্কার ও স্বচ্ছ হতে হবে।
    • পণ্যের গুণগত মান, দাম ও ডেলিভারি সম্পর্কে ক্রেতার কাছে কোনো প্রতারণা করা যাবে না।
    • দালালির পারিশ্রমিক (কমিশন) নির্ধারিত হতে হবে।

    আপনার ক্ষেত্রে মালিক আপনাকে নির্দিষ্ট দামের উপরে যত বেশি বিক্রি করতে পারবেন, সেটা আপনার লাভ। এটি অনির্দিষ্ট কমিশন হলেও জায়েজ, কারণ এটি আপনার পরিশ্রমের বিনিময় হিসেবে গণ্য হবে। তবে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, পারিশ্রমিক নির্ধারিত না থাকলে দালালের প্রাপ্য হবে মিসলি উজরত (বাজারের প্রচলিত হারের ভিত্তিতে নির্ধারিত পারিশ্রমিক)।

  3. কুকারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কমিশন:
    আপনি যদি ৩,০০০ টাকার পণ্য বিক্রি করেন তাহলে ৫০ টাকা, আর তার উপরে ১০০ টাকা কমিশন—এটি স্পষ্ট ও নির্ধারিত কমিশন, যা সম্পূর্ণ জায়েজ।

  4. ডেলিভারি রিটার্ন চার্জ:
    আপনি যদি রিটার্নের চার্জ বহনে রাজি হন, তবে এটি একটি শর্ত হিসেবে জায়েজ। তবে শর্তটি অবশ্যই মালিক ও আপনার মধ্যে পূর্বেই স্পষ্টভাবে ঠিক করতে হবে।


আপনার কাজের বৈধতা নির্ভর করছে নিম্নোক্ত শর্তের ওপর:

পণ্যের ছবি অরিজিনাল: আপনি লিখেছেন, পণ্যের ছবি অরিজিনাল এবং ক্রেতাকে ঠিক সেই ছবির মতোই পণ্য দেওয়া হয়। এটি উত্তম।
মালিকের অনুমতি: আপনার কাছে পণ্য না থাকলেও মালিক আপনাকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। সুতরাং আপনার কাজ জায়েজ।
ক্রেতার কাছে সৎ থাকা: কোনো প্রতারণা বা মিথ্যা বলা যাবে না। দাম ও পণ্যের বিবরণ সঠিকভাবে জানাতে হবে।
মালিকের নির্ধারিত দামের উপরে লাভ: আপনি মালিকের নির্ধারিত দামের উপরে নিজের লাভ যুক্ত করছেন। এটি জায়েজ, তবে শর্ত হলো ক্রেতাকে পুরো দাম জানানো (যেমন পণ্যের মূল্য ১০০ টাকা, আপনি ১৫০ টাকায় বিক্রি করলে ক্রেতাকে বলা যে এতে আপনার লাভ ৫০ টাকা)। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ ক্রেতাই জানে যে রিসেলার লাভ রাখে; তাই যদি এটি সাধারণ রেওয়াজ হয়, তাহলে স্পষ্টভাবে না বললেও চলবে। তবে উত্তম হলো সৎ থাকা।


সতর্কতা:

ঘর সাজানোর লাইট, ইলেকট্রিক জিনিসপত্র: এগুলোর মান ও নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রাখবেন। যদি পণ্যে কোনো ত্রুটি থাকে, সেটা ক্রেতার কাছে প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় এটি প্রতারণা হবে।
জুয়েলারি (গয়না): এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে পণ্যটি হারাম ধাতুর (যেমন: সোনার পরিবর্তে হারাম মিশ্রণ) তৈরি না হয়। পণ্যের উৎস ও মান যাচাই করা জরুরি।
রিটার্ন চার্জ: রিটার্নের চার্জ আপনি বহন করবেন—এটি শর্ত হিসেবে জায়েজ, তবে মালিকের সাথে স্পষ্টভাবে চুক্তি করে নিন।


সুপারিশ ও রায়:

  • হানাফি ফিকহের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ) দালালিকে জায়েজ বলেছেন, যদি প্রতারণা না থাকে।
  • ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) বলেন, “দালালি জায়েজ, কারণ মানুষ এতে অভ্যস্ত এবং এটা প্রয়োজনীয়।” (রাদ্দুল মুহতার)
  • কাজেই আপনার কাজটি হালাল, তবে নিম্নলিখিত শর্তগুলো মানতে হবে:
    1. পণ্যের গুণগত মান ও দাম সম্পর্কে ক্রেতার কাছে সৎ থাকুন।
    2. কোনো ধরনের প্রতারণা, মিথ্যা বিজ্ঞাপন বা অতিরঞ্জন করবেন না।
    3. মালিকের সাথে আপনার চুক্তি (কমিশন, রিটার্ন চার্জ ইত্যাদি) স্পষ্টভাবে লিখিত বা মৌখিকভাবে ঠিক করে নিন।
    4. হারাম পণ্য (যেমন: মদের সাথে সম্পর্কিত, অশ্লীল ছবি ইত্যাদি) রিসেলিং করবেন না।

আপনার চিন্তা দূর করার জন্য:

  • আপনি যে পদ্ধতিতে কাজ করছেন, তা দালালি বা এজেন্সি-এর অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামী শরিয়তে বৈধ।
  • আপনি পণ্যের মালিক না হয়েও অর্ডার আনছেন, কিন্তু মালিক আপনার কাজে সম্মত। সুতরাং এটি বাই’আল ফুযুলি (অননুমোদিত বিক্রি) নয়।
  • কুকারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কমিশন আরও সুস্পষ্ট ও নিরাপদ।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:

আপনি এ কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, তবে উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে চলবেন। বিশেষ করে:

  • ক্রেতার কাছে পণ্যের ছবি ও বিবরণ সঠিক দিন।
  • মালিকের নির্ধারিত দামের উপরে আপনার লাভটুকু ক্রেতাকে জানাতে পারেন (যদি প্রশ্ন করে) অথবা অন্তত প্রতারণা করবেন না।
  • রিটার্ন চার্জ, ডেলিভারি সংক্রান্ত শর্ত মালিকের সাথে স্পষ্ট করুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার রিজিকে বরকত দিন। আমীন।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন শামী)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি)
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি)
  • বাহিশতি জেওর (হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী)

والله اعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.