ভরা মজলিসে সবার সামনে স্নেহ বশত চুমু দিলে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
উল্লেখিত হুরমতে মুছাহারা বা হারাম সাব্যস্ত হওয়ার জন্য পুরুষের শাহওয়াত বা কামভাবের মাপকাঠি হচ্ছে তার লজ্জাস্থান বেড়ে উঠা। আর যদি স্পর্শ করার পূর্ব থেকেই তা উত্থিত অবস্থায় থাকে, তাহলে তার জন্য মাপকাঠি হলো তাতে আরো বৃদ্ধি পাওয়া। আর মহিলা, বৃদ্ধপুরুষ ও কমজোর পুরুষের জন্য শাহওয়াতের মাপকাঠি হলো- অন্তকরণে স্বাদ বা মজা অনুভব করা। যদি স্পর্শ করার পূর্ব থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে তা আরো বৃদ্ধি পাওয়া। (আলমগীরী, ১:২৭৫)
কোনো পুরুষ বা উপরোল্লিখিত মহিলা তথা পুত্রবধূ, শ্বাশুড়ী, সৎমা এবং আপন মেয়ে এদের মধ্যে হতে কারো মুখে, গালে অথবা মাথার উপরিভাগে যদি বুছা দেয় এবং বলে যে, আমি এ কাজ শাহওয়াতের সাথে করিনি, তাহলে তার এ কথা সত্য বলে মেনে নেয়া যাবে না। বরং হারাম সাব্যস্ত হয়ে যাবে।
উপরের লেখা টা একটা ওয়েবসাইট এ পাইলাম বলা আছে বুছা বা চুমা দিলেই হারাম বা হুরমত হিয়ে যাবে।
এখন কথা হইলো একবার আমার আব্বা তার পুত্রবধুকে তার ভাইয়ের বিয়েতে বাপের বাড়ি রেখে আসার সময়, ভরা মজলিস এ মাথায় / কপালে যে কোন এক জায়গায় সবার সামনে চুমু দেয়। এবং বিদায় দেয়। যা মনে হলো আমরা কত কেয়ার করি তা বুঝতে চুমু দেয় । উত্তেজনা জিজ্ঞেস কিরা তো সম্ভব নয়। আর মনে হলো মেয়ের মতো দেখে স্নেহ বশত দিছে।
এই প্রশ্ন মুফতি ইমদাদুল হক আইফতোয়া তে বললো হবে না হারাম ইনশাআল্লাহ ।
কিন্তু উক্ত ওয়েবসাইট এ তো বললো পুত্রবধু / মেয়েকে চুমু দিলেই হয়ে যায়।
১। তাইলে এটাকে কি ধরবো? সন্দেহের ভিত্তিতে তো ধরা যায় না
২৷ আবার উক্ত ওয়েবসাইট এ তাইলে কেনো দিলো যে বুছা দিলেই হয়ে যায় কোন প্রেক্ষিতে?
Answer
উত্তরের সারসংক্ষেপ
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। সংক্ষেপে উত্তর হলো: আপনার আব্বার কাজটি হারাম বা হুরমতে মুছাহারা সাব্যস্ত হবে না, কারণ সেখানে শাহওয়াত (কামভাব) ছিল না, বরং তা ছিল পিতার স্নেহ ও আদরের বহিঃপ্রকাশ।
আসুন বিষয়টি বিস্তারিত বুঝে নেই।
১. হুরমতে মুছাহারার মূলনীতি
হুরমতে মুছাহারা (যার ফলে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হয়ে যায়) সাব্যস্ত হওয়ার জন্য শাহওয়াত বা কামভাব থাকা শর্ত। এটি ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত।
ফতোয়া আলমগীরীতে এসেছে:
"হুরমতে মুছাহারা বা হারাম সাব্যস্ত হওয়ার জন্য পুরুষের শাহওয়াতের মাপকাঠি হচ্ছে তার লজ্জাস্থান বেড়ে উঠা। আর মহিলা, বৃদ্ধপুরুষ ও কমজোর পুরুষের জন্য শাহওয়াতের মাপকাঠি হলো- অন্তকরণে স্বাদ বা মজা অনুভব করা।" (আলমগীরী, ১:২৭৫)
অর্থাৎ, শুধু স্পর্শ বা চুমু দিলেই হুরমতে মুছাহারা হয় না, বরং তার সাথে শাহওয়াত থাকতে হবে।
২. পিতা ও পুত্রবধূর সম্পর্ক
পিতা ও পুত্রবধূর মধ্যে সম্পর্ক মুহাররামাত-এ-গায়র-মুআব্বাদা (অস্থায়ীভাবে হারাম) - এটি স্থায়ীভাবে হারাম নয়, কিন্তু জীবদ্দশায় বিবাহ হারাম। এ সম্পর্কের ক্ষেত্রে শাহওয়াত থাকলে হুরমতে মুছাহারা সাব্যস্ত হয়, কিন্তু শাহওয়াত না থাকলে হয় না।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, পিতা যদি পুত্রবধূকে স্নেহবশত চুমু দেন, তাতে শাহওয়াত না থাকে, তাহলে হুরমতে মুছাহারা সাব্যস্ত হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৩:২২৫)
৩. আপনার আব্বার ঘটনার বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- ঘটনাটি ঘটেছে ভরা মজলিসে সবার সামনে
- এটি ছিল বিদায়ের সময়, পুত্রবধূকে বাপের বাড়ি রেখে আসার প্রেক্ষাপটে
- কপালে বা মাথায় চুমু দেওয়া হয়েছে
- উদ্দেশ্য ছিল স্নেহ ও আদর প্রকাশ এবং "আমরা কত কেয়ার করি" তা বোঝানো
- উত্তেজনা বা কামভাবের কোনো সম্ভাবনা ছিল না
এই পরিস্থিতিতে শাহওয়াতের উপস্থিতি অকল্পনীয়। তাই এটি হুরমতে মুছাহারার অন্তর্ভুক্ত হবে না।
৪. ওয়েবসাইটের বক্তব্যের প্রেক্ষাপট
ওয়েবসাইটে যে কথা বলা হয়েছে:
"কোনো পুরুষ বা উপরোল্লিখিত মহিলা তথা পুত্রবধূ, শ্বাশুড়ী, সৎমা এবং আপন মেয়ে এদের মধ্যে হতে কারো মুখে, গালে অথবা মাথার উপরিভাগে যদি বুছা দেয় এবং বলে যে, আমি এ কাজ শাহওয়াতের সাথে করিনি, তাহলে তার এ কথা সত্য বলে মেনে নেয়া যাবে না। বরং হারাম সাব্যস্ত হয়ে যাবে।"
এটি সাধারণ নিয়ম নয়। এটি প্রযোজ্য হয় তখন, যখন:
- চুমু দেওয়ার পরিস্থিতি বা প্রেক্ষাপট থেকে শাহওয়াতের সম্ভাবনা থাকে
- ব্যক্তিটি শাহওয়াতি প্রকৃতির বলে পরিচিত
- অথবা গোপনীয়তার মধ্যে চুমু দেওয়া হয়েছে
কিন্তু আপনার আব্বার ঘটনায়:
- সবার সামনে চুমু দেওয়া হয়েছে
- এটি ছিল স্বাভাবিক স্নেহের প্রকাশ
- প্রেক্ষাপট ছিল বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা
এমতাবস্থায় শাহওয়াতের অনুমান বা সম্ভাবনা নেই। তাই উক্ত ওয়েবসাইটের বক্তব্য এখানে প্রযোজ্য নয়।
৫. সন্দেহের ভিত্তিতে ফতোয়া দেওয়া নিষিদ্ধ
ইসলামী আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো:
اليقين لا يزول بالشك (সন্দেহ সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয়কে দূর করে না)
الأصل بقاء ما كان على ما كان (মূল অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে যতক্ষণ না বিপরীত প্রমাণিত হয়)
এখানে মূল অবস্থা হলো: পিতা-পুত্রবধূর বৈবাহিক সম্পর্ক হালাল। সন্দেহের ভিত্তিতে তা হারাম করা যাবে না।
৬. মুফতি ইমদাদুল হকের ফতোয়ার সঠিকতা
মুফতি ইমদাদুল হক যে বলেছেন "ইনশাআল্লাহ হবে না হারাম", এটি সঠিক। কারণ:
১. শাহওয়াতের উপস্থিতি সন্দেহসূচক নয়, বরং অনুপস্থিতি স্পষ্ট। ২. পিতার উদ্দেশ্য ছিল স্নেহ, কামনা নয়। ৩. প্রকাশ্য স্থানে সবার সামনে চুমু দেওয়া শাহওয়াতি কাজ নয়।
রদ্দুল মুহতারে এসেছে:
"পিতা তার পুত্রবধূর মাথায় স্নেহবশত হাত বুলালে বা চুমু দিলে, যদি শাহওয়াত না থাকে, তাহলে হুরমতে মুছাহারা হবে না।" (রদ্দুল মুহতার, ৩:২২৫)
৭. চূড়ান্ত ফতোয়া
প্রশ্ন ১: আপনার আব্বার কাজটিকে স্নেহ ও আদর হিসেবে গণ্য করা হবে, হুরমতে মুছাহারা হিসেবে নয়। সন্দেহের ভিত্তিতে হারাম সাব্যস্ত করা যাবে না।
প্রশ্ন ২: ওয়েবসাইটের বক্তব্য সাধারণ নিয়ম নয়, বরং তা প্রযোজ্য হয় সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে যখন শাহওয়াতের অনুমান বা সম্ভাবনা থাকে। আপনার ঘটনায় তা প্রযোজ্য নয়।
সুপারিশ: আপনার আব্বা যদি সত্যিই শাহওয়াত ছাড়া স্নেহবশত চুমু দিয়ে থাকেন, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ এড়িয়ে চলাই উত্তম, কারণ লোকচক্ষুতে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। পুত্রবধূর সাথে পিতার সম্পর্ক সর্বদা শালীনতা ও সংযমের সাথে রাখা উচিত।
সূত্র:
- ফতোয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া), ১:২৭৫
- রদ্দুল মুহতার, ৩:২২৫-২২৬
- ইমদাদুল ফতোয়া, ২:৩৪৫
- আল-হিদায়া, ১:২৪
- ফতোয়া উসমানি, ২:২৩০
আল্লাহু আলাম (আল্লাহই সর্বজ্ঞ)।