হায়েয পরবর্তী ফরয গোসল ব্যতিত সহবাস করে নিলে করণীয় কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2745
Questioner: Shamsun Nahar Popy
Question Asked: 15 Jul 2026, 04:14 PM
Reviewed & Published: 15 Jul 2026, 04:29 PM
Views: 60
Tokens: 4,594
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম উস্তাদ,
হায়েজ এর একদম শেষ এ হালকা হলুদ স্রাব দেখা অবস্থায় ইস্তিঞ্জার পর ধুয়ে ফেলে স্বামী সহবাস হলে কি তা হারাম হিসেবে গন্য হবে? যদিও সহবাসের পর আর হলুদ বা অন্য কোন স্রাব দেখা যায় নি। ফরজ গোসল ও করা হয় নি। হারাম হলে এমতাবস্থায় স্বামী স্ত্রী উভয়ের করণীয় কি? এরকম বেশ কয়েকবার হয়েছে।

Answer

উত্তর: ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

প্রথমত, আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—হ্যাঁ, হায়েজ (মাসিক) চলাকালীন বা তার নিশ্চিত লক্ষণ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সহবাস করা হারাম (কবিরা গুনাহ)। তবে আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।


আপনার পরিস্থিতির ফিকহি বিশ্লেষণ

প্রশ্নে উল্লেখিত অবস্থা:

  • হায়েজের শেষ পর্যায়ে হালকা হলুদ স্রাব দেখা যাচ্ছে।
  • আপনি ইস্তিঞ্জা করে ধুয়ে ফেলেছেন।
  • এরপর স্বামী-স্ত্রী সহবাস করেছেন।
  • সহবাসের পর আর কোনো স্রাব দেখা যায়নি।
  • সহবাসের পর ফরজ গোসল করেননি

ফিকহি বিধান:

১. হলুদ স্রাবের হুকুম:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হানাফি ফিকহের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, হায়েজের দিনগুলোর মধ্যে দেখা হলুদ বা নীলাভ স্রাব (যদি রক্তের অনুরূপ হয়) হায়েজেরই অংশ বলে গণ্য হবে। এটি তখনই হায়েজের বাইরে গণ্য হবে যখন তা সম্পূর্ণ শুকনো ও নিষ্কলুষ সাদা স্রাব (পবিত্রতার নিদর্শন) দেখা যাওয়ার পর প্রকাশ পায়।

সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (১/৪৬৪) - "হায়েজের দিনগুলোতে হলুদ ও নীলাভ স্রাব হায়েজের অন্তর্ভুক্ত।"
  • ফতোয়া হিন্দিয়া (১/৩৫) - "যতক্ষণ পর্যন্ত রক্ত বা তার অনুরূপ স্রাব (হলুদ, নীলাভ) দেখা যায়, ততক্ষণ হায়েজ স্থায়ী থাকে।"

আপনার ক্ষেত্রে, যেহেতু হলুদ স্রাবটি এখনও হায়েজের শেষ পর্যায়ে দেখা গিয়েছিল, অর্থাৎ হায়েজ এখনও শেষ হয়নি, তাই স্ত্রী তখনও নাপাক অবস্থায় ছিলেন।

২. হায়েজ অবস্থায় সহবাসের বিধান:
পবিত্র কুরআন ও হাদিস দ্বারা হায়েজ অবস্থায় সহবাস করা স্পষ্টভাবে হারাম প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তারা আপনাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা কষ্টদায়ক (অপবিত্র)। সুতরাং তোমরা হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকো এবং তাদের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে, তখন তাদের কাছে এসো, যেভাবে আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন।" (সূরা বাকারা: ২২২)

হাদিসে এসেছে, নবী (সা.) বলেছেন:

"যে ব্যক্তি হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, সে যেন এক দীনার বা অর্ধ দীনার সাদকাহ করে।" (সুনানে আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)

সুতরাং, যেহেতু স্ত্রী তখনও হায়েজ অবস্থায় ছিলেন, তাই সহবাস করা হারাম ও কবিরা গুনাহ। এটি হালাল বা জায়েজ হিসেবে গণ্য হবে না—বরং তা হারাম ও গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে


এমতাবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর করণীয়:

তওবা ও ইস্তিগফার:

  • যেহেতু বিষয়টি ইচ্ছাকৃত না হলেও (অজ্ঞানতা বা ভুলের কারণে) হয়ে গেছে, তাই স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্যই তওবা করা ওয়াজিব। তওবায় অন্তর থেকে লজ্জা ও অনুতাপ নিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ভবিষ্যতে এই গুনাহ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।

যে দিনগুলোর কথা বলা হয়েছে, সে দিনগুলোতে সহবাসের পর ফরজ গোসল করা হয়নি:

  • প্রতিটি সহবাসের জন্য আলাদা ফরজ গোসল ওয়াজিব ছিল। যেহেতু আপনি গোসল করেননি, তাই নামাজ, কুরআন স্পর্শ, মসজিদে যাওয়া ইত্যাদি ইবাদতের জন্য পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। তবে এর জন্য কোনো কাফফারা নেই—শুধু তওবা করে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকতে হবে এবং বর্তমানে পবিত্রতা অর্জনের জন্য বিলম্ব না করে ফরজ গোসল সেরে নিন

ভবিষ্যতে সতর্কতা:

১. হায়েজের শেষ নির্ধারণ:
হায়েজ শেষ হওয়ার সম্পূর্ণ পবিত্রতা বুঝতে হবে:

  • মেয়েদের জন্য স্বাভাবিক পবিত্রতা হলো: যখন সম্পূর্ণভাবে রক্ত বা কোনো স্রাব বন্ধ হয়ে যায় এবং ভিতর থেকে সাদা ও পিচ্ছিল না-থাকা স্রাব (কৃত্রিম) অথবা শুষ্কতা দেখা দেয়।
  • হলুদ স্রাব যদি হায়েজের দিনগুলোতে দেখা দেয়, তবে তা হায়েজের অংশ এবং তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সহবাস করা নাজায়েয।
  • পবিত্রতা নিশ্চিত হওয়ার পরেই ফরজ গোসল করে তারপর সহবাস করা জায়েজ।

২. ইস্তিঞ্জা করে ধুয়ে ফেলা সহবাসের জন্য যথেষ্ট নয়:
ইস্তিঞ্জা কেবল পেশাব-পায়খানার পবিত্রতার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু হায়েজ থেকে পবিত্রতার জন্য ফরজ গোসল ওয়াজিব। তাই সহবাসের পূর্বে স্ত্রীকে ফরজ গোসল করে পবিত্র হতে হবে (যদি হায়েজ শেষ হয়ে থাকে)।

৩. কাফফারা:
অজ্ঞতা বা ভুলে হায়েজ অবস্থায় সহবাস হয়ে গেলে তাওবাহর পাশাপাশি এক বা অর্ধ দীনার সাদকাহ করা মুস্তাহাব।

(দেখুন: ফতোয়া উসমানি, ইমদাদুল ফতোয়া, রদ্দুল মুহতার)


সংক্ষিপ্ত উত্তর:

  • হ্যাঁ, সহবাসটি হারাম ও গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে—যদিও সহবাসের পর আর স্রাব দেখা যায়নি এবং ফরজ গোসল করা হয়নি।
  • উভয়ের করণীয়:
    ১. তওবা ও ইস্তিগফার করুন (বেশি বেশি)।
    ২. ফরজ গোসল করুন (এখন করলেই হবে)।
    ৩. ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন: যতক্ষণ পর্যন্ত রক্ত বা হলুদ-নীলাভ স্রাব দেখা যায়, ততক্ষণ হায়েজ গণ্য হবে। সম্পূর্ণ পবিত্র হওয়ার পর অর্থাৎ সাদা স্রাব বা শুষ্কতা নিশ্চিত হওয়ার পর ফরজ গোসল করে তারপর সহবাস করুন।
    ৪. ** এক দিরহাম বা অর্ধেক দিরহাম সদকাহ করা মুস্তাহাব।

আল্লাহ তাআলা আপনার তওবা কবুল করুন এবং হালাল উপায়ে দাম্পত্য জীবনকে পবিত্র ও বরকতময় করুন। (আমিন)


উত্তর লিখনে সহায়তা করেছেন:

  • কিতাব: ফতোয়া উসমানি, ইমদাদুল ফতোয়া, রদ্দুল মুহতার, ফতোয়া হিন্দিয়া, বাহিশতি জেওর।
  • মাশায়েখ: ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, আল্লামা ইবনে আবেদিন শামি, হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মুফতি মুহাম্মদ শফি, মুফতি তাকি উসমানি।

(আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.