বিয়ের জন্য "উত্তম কাউকে" চাওয়ার জন্য যে দোয়া করা হয়, এখানে "উত্তম কেউ" বলতে কী বুঝায়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
বিয়ের জন্য সবথেকে উত্তম কাউকে পাওয়ার জন্য দোয়া করার নিয়ম আছে।
এখানে "উত্তম কেউ" বলতে ঠিক কি বোঝানো হচ্ছে? আমি জানতে চাই যে আসলে আমি কি দোয়া করছি, যে দোয়া করছি তার অর্থ কি?
এই "উত্তম কেউ" মানে কি এমন কেউ যার সৌন্দর্য আমার কাছে অন্যান্যদের থেকে সবচেয়ে পছন্দ হবে?
অথবা কি এমন কেউ যার আচার-আচরণ, মন মানসিকতা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগবে এবং আমার আশানুরূপ হবে?
নাকি শুধু এমন কেউ যে, আমি যদি বিয়ের আগে জিনা থেকে বেঁচে থাকি, তাহলে এমন কেউ যে জিনা জিনা থেকে বেঁচে ছিল?
নাকি এখানে দুজনের ঈমান, ইবাদত ইত্যাদির পরিমাণে সাদৃশ্যতা বোঝানো হচ্ছে?
নাকি এইসব থেকেও আরো ব্যাপক কিছু?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “উত্তম কেউ” বলতে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কী বোঝায়, তা স্পষ্ট না থাকলে দোয়ার অর্থ ও উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বোঝা যায় না। নিচে কুরআন-হাদিস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
“উত্তম কেউ” বলতে ইসলাম কী বোঝায়?
ইসলামে বিবাহের জন্য উত্তম পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনের মূল মাপকাঠি হলো দ্বীন (ধর্মপরায়ণতা) ও চরিত্র। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“একজন নারীকে চারটি গুণের জন্য বিবাহ করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশ (মর্যাদা), তার সৌন্দর্য এবং তার ধর্মপরায়ণতা। তুমি ধর্মপরায়ণ নারীকে অগ্রাধিকার দাও, (নইলে) তোমার হাত ধুলায় ধুসরিত হোক।”
(সহীহ বুখারী: ৫০৯০, সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬)
একইভাবে পুরুষের জন্যও বলা হয়েছে যে, ধর্মপরায়ণ পুরুষ উত্তম পাত্র।
সুতরাং “উত্তম কেউ” বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়— যার ঈমান, আমল, নৈতিকতা ও দ্বীনদারি সবচেয়ে ভালো। এটি কেবল একটি দিক নয়; বরং একত্রে সর্বোত্তম গুণাবলির সমষ্টি।
আপনার উল্লেখিত প্রতিটি বিকল্পের ব্যাখ্যা
১. সৌন্দর্য কি উত্তম হওয়ার মানদণ্ড?
না, সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেওয়া ইসলামের নির্দেশ নয়। তবে ভালো লাগা স্বাভাবিক, কিন্তু এটাই উত্তম হওয়ার মাপকাঠি নয়। হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে, কেবল সৌন্দর্য দেখে বিবাহ করলে পরবর্তীতে মিল না-ও থাকতে পারে।
২. আচার-আচরণ ও মানসিকতার মিল?
এটি গুরুত্বপূর্ণ, তবে একমাত্র মানদণ্ড নয়। ইসলামে বলা হয়েছে, উত্তম সেই ব্যক্তি, যার আচরণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী হয়। তবে ব্যক্তিগত পছন্দ ও মানসিকতার মিল থাকা ভালো, কিন্তু দ্বীনি গুণের তুলনায় এটি গৌণ।
৩. জিনা থেকে বেঁচে থাকা?
এটি উত্তম হওয়ার একটি শর্ত, কিন্তু যথেষ্ট নয়। কারণ শুধু পাপ থেকে বিরত থাকা মানেই উত্তম নয়; বরং ভালো কাজ করা, ফরজ-ওয়াজিব পালন করা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করাও জরুরি। তবে হ্যাঁ, যে ব্যক্তি জিনা থেকে বেঁচে থাকে ও তওবা করে, সে নিশ্চয়ই নেককার।
৪. ঈমান ও ইবাদতের সাদৃশ্যতা?
এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে বলা হয়েছে:
“পবিত্র নারীরা পবিত্র পুরুষদের জন্য আর পবিত্র পুরুষেরা পবিত্র নারীদের জন্য।” (সূরা আন-নূর: ২৬)
অর্থাৎ ঈমান ও ইবাদতের দিক থেকে সাদৃশ্য থাকা জরুরি। তবে “উত্তম কেউ” বলতে সবচেয়ে উত্তম ঈমানদার বোঝায়, যার সাথে আপনার দ্বীনি মান মিলে যায়।
সবচেয়ে ব্যাপক ও সার্বিক অর্থ
“উত্তম কেউ” বলতে এমন ব্যক্তি বোঝায়— যে দুনিয়ায় আপনার জন্য দ্বীনের ব্যাপারে সহায়ক হবে, আখিরাতে জান্নাতে আপনার সঙ্গী হবে এবং দুনিয়ার জীবনে আপনার জন্য শান্তি ও সন্তুষ্টির কারণ হবে। এটি কেবল বাহ্যিক গুণ নয়; বরং দ্বীনের দৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ উত্তমতা।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) ফতোয়া শামীতে লিখেছেন:
“বিবাহের উদ্দেশ্য হলো দ্বীন রক্ষা করা ও নেককার সন্তান লাভ করা। তাই উত্তম পাত্র-পাত্রী সেই, যে দ্বীনদার, নেককার এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল।”
(রদ্দুল মুহতার: ৩/৫৭)
দোয়া করার অর্থ ও গুরুত্ব
আপনি যখন বলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে উত্তম কাউকে দিন”, তখন আপনি আসলে নিচের বিষয়গুলো চাচ্ছেন:
- এমন একজন জীবনসঙ্গী চাচ্ছেন, যে আল্লাহকে ভয় করে।
- যে আপনার ঈমান ও আমলে সহায়ক হবে।
- যে দুনিয়ায় ও আখিরাতে আপনার জন্য কল্যাণের কারণ হবে।
- যে পাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং নেক আমলে অগ্রগামী।
এ দোয়া করা সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ ﷺ দোয়া শিখিয়েছেন:
“রَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ”
“হে আমাদের রব! আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন, যারা আমাদের চোখের শীতলতা (শান্তি) হবে।” (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)
উপসংহার
“উত্তম কেউ” বলতে আপনি যদি কেবল সৌন্দর্য, সম্পদ বা বংশ চান, তাহলে তা ইসলামের শিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং আপনি দোয়া করবেন সর্বোত্তম দ্বীনদার ও নেককার ব্যক্তি পাওয়ার জন্য—যে আপনার ঈমান ও আমলকে শক্তিশালী করবে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে আপনার কল্যাণের কারণ হবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন এবং আমাদের দোয়া কবুল করুন। (আমীন)
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।