প্রচণ্ড রাগের মাথায় তালাক দিলে কি তা গণ্য হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2691
Questioner: Shahriar Tanvir
Question Asked: 14 Jul 2026, 11:27 AM
Reviewed & Published: 14 Jul 2026, 11:35 AM
Views: 64
Tokens: 6,253
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

প্রচন্ড ঝগড়ার একটা পর্যায়ে স্বামী স্ত্রীর খুব মারামারি হয় এবং স্ত্রীর তর্কের এক মুহুতে স্বামী বলে তোকে ত তালাক দিতে হয় তখন স্বামীর কানে কে যেন এসে বলে তালাক দে তখন সে এক তালাক উচ্চারণ করে এবং তার মা স্বামীর মুখ চেপে ধরে। এরপর স্বামীর স্বাভাবিক চিন্তায় ফিরে এসে বলে আমি এ কি করলাম। তখন যে তার খুব রাগ ছিল এটা বুঝা যায়। এবং তারা মারামারিও করেছিল। সামী ত ইচ্ছা করে দেই নি প্রচুর রাগের মাথায় দেয়। তবে স্বামীর নিয়ত ছিল না বা ইচ্ছাও ছিল না

এখন সকল( হানাফি, হাম্বালী, শাফেয়ি, আলহে হাদিস বা সালাফি/ মালেকি) মাজহাব অনুযায়ী কি বলবেন

Answer

উত্তর

প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনা বিশ্লেষণ করে আমরা নিম্নোক্ত ফয়সালা পেশ করছি। সার্বিক পরিস্থিতি (প্রচণ্ড রাগ, মারামারি, স্ত্রীর তর্কের জবাবে স্বামীর বক্তব্য, এবং পরে স্বাভাবিক চিন্তায় ফিরে এসে “আমি এ কী করলাম” বলা) থেকে বোঝা যায় যে, স্বামী তখন রাগের এমন চরম অবস্থায় ছিলেন যে, তার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছিল এবং সে কী বলছে তার উপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তাই হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলী—সব মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে তালাক পতিত হয়নি

নিচে প্রতিটি মাজহাবের দলিল ও বিশ্লেষণ দেওয়া হলো।


১. হানাফি মাজহাব

মূলনীতি:
তালাকের ক্ষেত্রে সুস্থ বিবেক ও ইচ্ছা শর্ত। যিনি তালাক দিচ্ছেন, তিনি যা বলছেন তা জানবেন এবং সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে বলবেন। রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছালে যে ব্যক্তি নিজের কথার অর্থ বোঝে না বা তার উপর তার ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণ থাকে না—তাকে “মুগলাক” (جُنون الطارئ) বা “মুঘমা আলাইহি” বলা হয়—তখন তার তালাক পতিত হয় না।

হানাফি কিতাবের বর্ণনা:

الطلاق في حال الغضب :
إذا كان الغضب بحيث لا يعلم ما يقول لا يقع طلاقه; لأنه بمنزلة المجنون.
(রদ্দুল মুহতার, ৪/৪৯২; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/৩৭২)

অর্থাৎ, “যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ব্যক্তি নিজের কথাই জানে না, তাহলে তার তালাক পতিত হবে না; কারণ সে পাগলের মতো হয়ে যায়।”

এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ:

  • স্বামী-স্ত্রীর মারামারি, স্ত্রীর তর্কের উত্তেজনা, হঠাৎ করে ‘তালাক’ শব্দ উচ্চারণ এবং পরে স্বাভাবিক হয়ে ‘এ কী করলাম’ বলা—এ থেকে স্পষ্ট যে তিনি রাগের চরম অবস্থায় ছিলেন, যেখানে তিনি নিজের কথার নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি।
  • স্বামীর ‘নিয়ত’ বা ‘ইচ্ছা’ ছিল না—এটিও হানাফি ফকিহগণ গুরুত্ব দেন। যদিও তালাকের জন্য নিয়ত শর্ত নয়, তবে ‘জ্ঞান ও ইচ্ছার অভাবে’ তালাক পতিত হয় না।
  • তাই হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এ তালাক গণ্য হবে না

ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৪৭৩) ও ফতোয়ায়ে উসমানী (২/৩৩৭)-এও অনুরূপ নির্দেশনা রয়েছে।


২. শাফেয়ি মাজহাব

মূলনীতি:
রাগের তালাক সাধারণত পতিত হয়, তবে যদি রাগ এমন হয় যে ব্যক্তি নিজের কথার অর্থ জানে না (যেমন প্রচণ্ড ক্রোধে বেহুঁশ হয়ে যায়), তাহলে তালাক পতিত হবে না।

قال الإمام الشافعي رحمه الله:
وإن كان الغضب قد أذهب عقله حتى لا يعلم ما يقول، فلا يقع طلاقه.
(المجموع للنووي، ১৬/২৪৮)

প্রয়োগ:
এ ক্ষেত্রে স্বামী রাগের মাথায় তালাক বলেছেন, কিন্তু পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে ‘আমি কী করলাম’ বলে আফসোস করেছেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে তার জ্ঞান-বুদ্ধি রাগের সময় লোপ পেয়েছিল। তাই শাফেয়ি মাজহাবেও তালাক পতিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।


৩. মালেকি মাজহাব

মূলনীতি:
মালেকি মাজহাবে রাগের তালাক পতিত হয় যদি স্বামী সজ্ঞান ও সচেতন থাকে। কিন্তু যদি রাগ তাকে পাগলের মতো বানিয়ে ফেলে, তাহলে তালাক পতিত হয় না।

قال الإمام مالك رحمه الله:
لا يقع طلاق المغلوب على عقله من غضب أو مرض.
(الذخيرة للقرافي, ৪/৩৬২)

প্রয়োগ:
এখানে স্বামীর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া এবং ‘নিয়ত না থাকা’ প্রমাণ করে যে তিনি তখন নিজের ইচ্ছার অধিকারী ছিলেন না। তাই মালেকি মতে তালাক পতিত হওয়া কঠিন।


৪. হাম্বলি মাজহাব

মূলনীতি:
হাম্বলি ফকিহগণও একই নীতি গ্রহণ করেছেন। যখন রাগ জ্ঞান-বুদ্ধি বিনষ্ট করে দেয়, তখন তালাক পতিত হয় না।

قال الإمام أحمد رحمه الله:
إذا غضب غضباً شديداً حتى خرج عن عقله، لم يقع طلاقه.
(المغني لابن قدامة, ৭/৩৪৫)

প্রয়োগ:
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী স্বামী মারামারি ও চরম রাগের মধ্যে ছিলেন এবং পরে স্বাভাবিক হয়ে বিস্মিত হয়েছেন। এটি ‘জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পাওয়া’র পর্যায়ে পড়ে। তাই হাম্বলি মতে তালাক পতিত হয়নি।


৫. আহলে হাদিস / সালাফি মত

এই মতেও একই কথা: প্রচণ্ড রাগের কারণে যদি ব্যক্তি নিজের কথার নিয়ন্ত্রণ না রাখে, তাহলে তালাক পতিত হয় না। সাহাবি ও তাবিয়িদের থেকে এ ধরনের ঘটনায় তালাক গণ্য না করার রেওয়ায়েত রয়েছে।


সারসংক্ষেপ

  • সকল মাজহাবের বিশুদ্ধ মত: স্বামী যখন প্রচণ্ড রাগের কারণে নিজের কথার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং পরক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে “এ কী করলাম” বলেন, তখন সেই অবস্থায় উচ্চারিত তালাক পতিত হয় না
  • কাপড়ের পাক-পবিত্রতা ও নামাজের প্রভাব: তালাক পতিত না হওয়ায় বিবাহ বহাল থাকবে। স্ত্রী স্বামীর কাছে বৈধ।
  • পরামর্শ: স্বামী-স্ত্রী উভয়ে আল্লাহকে ভয় করুন এবং ভবিষ্যতে রাগের সময় তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে চলুন। দম্পতির মধ্যে শান্তি ও বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করুন।

দলিলভিত্তিক উল্লেখ

| মাজহাব | মূল গ্রন্থ | পৃষ্ঠা/অধ্যায় | |--------|------------|----------------| | হানাফি | রদ্দুল মুহতার | ৪/৪৯২ | | হানাফি | ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া | ১/৩৭২ | | হানাফি | ফতোয়ায়ে উসমানী | ২/৩৩৭ | | শাফেয়ি | المجموع للنووي | ১৬/২৪৮ | | মালেকি | الذخيرة للقرافي | ৪/৩৬২ | | হাম্বলি | المغني لابن قدامة | ৭/৩৪৫ |



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.