মৃত ব্যক্তির জন্য সুন্নাহ কী কী? খতম, মিলাদ, কিয়াম, দরুদ কি জায়েয? সোমবারে মৃত্যুর ফজিলত কি এবং রুহ কিসের তৈরি?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
(২) সোমবারে মৃত্যু বরণের কোন ফজিলত আছে কি কেননা এই দিনে নবীজী সাঃ জন্মগ্রহণ করেছেন।
(৩) রুহ কিসের তৈরি?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার তিনটি প্রশ্নের জবাব শরিয়তের আলোকে এবং হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের রেফারেন্স সহ দেওয়া হলো:
১. মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনের করণীয় ও সুন্নাহ কী কী?
ইসলামী শরিয়তে মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনদের জন্য কিছু সুন্নাহ ও মুস্তাহাব আমল নির্ধারিত আছে। অন্যদিকে অনেক প্রচলিত আমল (যেমন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে খতম, মিলাদ, কিয়াম, দরুদ) বিদআত হওয়ার কারণে পরিত্যাজ্য। নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:
সুন্নাহ ও মুস্তাহাব আমল:
- মৃত ব্যক্তির চোখ বন্ধ করা, শরীর কাপড়ে ঢেকে দেওয়া। (বাহিশতী জেওয়ার, জানাজার অধ্যায়)
- জানাজার গোসল ও কাফন দেওয়া। (রাদ্দুল মুহতার, ২/১৯৪)
- জানাজা পড়া এবং দাফনে তাড়াতাড়ি করা। (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৯৪৪)
- দাফনের পর মৃতের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা। (আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২১)
- মৃতের পক্ষ থেকে সদকা করা। (সহীহ বুখারি, হাদিস: ২৭৬০)
- কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতের রুহে পৌঁছানোর নিয়তে দোয়া করা। এটি জায়েজ। তবে নির্দিষ্ট দিনে বা নির্দিষ্ট সংখ্যক লোক একত্র হয়ে খতম পড়ার রীতি সুন্নাহ নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮১)
- তিন দিন পর্যন্ত শোক ও সান্ত্বনা দেওয়া (তা‘যিয়াত) মুস্তাহাব। এর বেশি মিলাদ-কিয়ামের আয়োজন করা বিদআত। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৮০)
বিদআত ও পরিত্যাজ্য কাজ:
- খতম, মিলাদ, কিয়াম (নির্দিষ্ট নিয়মে দাঁড়ানো) – এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এটি বিদআতে সাইয়্যিয়াহ (মন্দ বিদআত)। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৯০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮৫)
- দরুদ-সালামের নির্দিষ্ট মজলিস (যেখানে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করা হয়) – প্রমাণিত নয়। তবে যে কোনো সময় দরুদ পাঠ করা সওয়াবের কাজ। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮০)
- চুল-দাড়ি ইত্যাদি কাটা, নিয়মিত মৃতের জন্য খানা প্রস্তুত করা ইত্যাদি। এগুলোতে সুন্নাহর আলাদা কোনো পদ্ধতি নেই।
➡️ সুন্নাহ হলো: মৃতের জন্য দোয়া, সদকা, কুরআন তিলাওয়াত (স্বতন্ত্রভাবে), এবং সাধ্যমতো ঋণ আদায় করা। নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান (খতম, মিলাদ, কিয়াম) বাদ দিয়ে সাধারণভাবে সওয়াব পাঠ করাই উত্তম।
২. সোমবারে মৃত্যুবরণের কোনো ফজিলত আছে কি?
সোমবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম ও ওফাতের দিন। কিন্তু শুধু সোমবারে মৃত্যুবরণ করায় বিশেষ কোনো ফজিলত কুরআন-হাদিসে প্রমাণিত নয়। তবে জুমুআর দিন বা রাতে মৃত্যুবরণ করলে কবরের আজাব থেকে মুক্তির ঘোষণা এসেছে। (তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৪)
সোমবারে জন্মগ্রহণের বিষয়টি নবীজীর বিশেষ মর্যাদা, কিন্তু অন্য কারও জন্য এ দিনে মৃত্যুবরণের জন্য বিশেষ কোনো সওয়াব নেই। তবে যে কোনো দিন ইমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করাই সর্বশ্রেষ্ঠ। (মাআরিফুল কুরআন, সূরা আলে ইমরান: ১৯৫ এর তাফসির)
➡️ নিষ্কর্ষ: সোমবারে মৃত্যুর আলাদা কোনো ফজিলত নেই; বরং ইমান ও আমলে সালেহর ওপর মৃত্যুই কাম্য।
৩. রুহ (আত্মা) কিসের তৈরি?
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ ۖ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُم مِّنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا
(সূরা বনি ইসরাইল: ৮৫)
অর্থ: “তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন: রুহ আমার রবের আদেশ (সৃষ্টি) থেকে; এবং তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যই।”
সুতরাং রুহের বস্তুগত প্রকৃতি মানুষের জ্ঞানের বাইরে। হানাফি ফকিহদের মতে, রুহ একটি লতিফা (সূক্ষ্ম বস্তু) যা আল্লাহর বিশেষ সৃষ্টি। এটি অগ্নি, পানি, মাটি বা আলো দ্বারা গঠিত নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সৃষ্ট একটি আমরি (অদৃশ্য) জগতের সত্তা যা দেহকে জীবিত রাখে। (শরহু মাআনিল আসার, ইমাম তাহাবি; উসুলুশ শাশি; রাদ্দুল মুহতার, ১/২১০)
➡️ সংক্ষেপ: রুহের সৃষ্টি সম্পর্কে বিশদ জানা সম্ভব নয়। এটি আল্লাহর নির্দেশজাত একটি বিশেষ সৃষ্টি। এর স্বরূপ বুঝতে চেষ্টা না করে ঈমান রাখাই কর্তব্য।
সারসংক্ষেপ:
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. মৃতের আত্মীয়দের সুন্নাহ আমল | মৃতের জন্য দোয়া, সদকা, তিলাওয়াত (স্বতন্ত্র)। খতম, মিলাদ, কিয়াম বিদআত। | | ২. সোমবারে মৃত্যুর ফজিলত | বিশেষ ফজিলত নেই। ইমানের ওপর মৃত্যুই শ্রেষ্ঠ। | | ৩. রুহ কিসের তৈরি | এটি আল্লাহর আমরি সৃষ্টি; পঞ্চভৌতিক নয়। জ্ঞানীরা এর স্বরূপ জানেন না। |
আল্লাহ তাআলা আমাদের সুন্নাহ বুঝে আমল করার তাওফিক দিন। (আমিন)