চাকরির সময় তালাকের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি সংক্রান্ত

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2655
Questioner: Shahriar Sinon
Question Asked: 13 Jul 2026, 05:24 PM
Reviewed & Published: 13 Jul 2026, 05:31 PM
Views: 32
Tokens: 7,621
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একটা ব্যাংকে চাকুরী করি। হঠাৎ কিছুদিন আমার মনে তালাক সংক্রান্ত প্রশ্ন আসতে থাকে। এর মধ্যে একদিন ব্যাংকে কাজ কাজ করতে প্রচুর তালাকের চিন্তা আসতে থাকে। আমি তখন থেকেই বিভিন্ন দুয়া পড়তে থাকি এবং কাজ করা শুরু করি। এভাবে প্রায় ৪/৫ ঘন্টা অতিবাহিত হয়।মানে কেউ যেন জোর করে বলাবে এমন কিছু। কাজ শেষে আমি একটু অন্য মনস্ক হই এবং চিন্তা করতে থাকি- প্রায় বাবা আম্মাকে তালাক দেব বলত। তো আমি ঐ চিন্তার বশবর্তী হয়ে বাবা মাকে যেভাবে বলত আমিও কেন জানি সেইভাবে জিহবা আর ঠোট হাল্কা নড়ে উঠে তালাক বলে(দেব শব্দটি আর বলার আগেই আমার কেমন জানি বাস্তবতায় ফিরে আসি)। এবং তৎক্ষনাৎ আমি শরীর ঝাড়া দিয়ে বলি আমি আমি এসব কি বলতেছি। এখন আমি কি স্ত্রীকে বললাম নাকি বাবার টাই রিপিট করছি মায়ের দিকে- বুঝতেছি না। আমার যতদুর মনে পড়ে শব্দ হয় নি। আমার কনো নিয়ত বা ইচ্ছাই ছিল না তালাকের কারণ স্ত্রীর সাথে আমার ভালো সম্পর্ক।

এরপরদিন আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম জোরে জোরে তালাক বলার জন্য এবং এই সময়টায় আমি মানুষের ক্ষতি বা জাদু দ্বারা আক্রান্ত ছিলাম এবং দাদা তা একটা বিশেষ মাধ্যমে ধরতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দেন।

এরপর আরেকদিন মাগরিবের নামাজ পড়ে হুট করে শুধু জিহবা নড়ে উঠে তালাক বলে। কিন্তু ঠোঁট ওইদিন নড়ে নি।

Answer

উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ। আপনার বর্ণিত ঘটনায় কোনো তালাক পতিত হয়নি। নিচে কারণ ও দলিল সহ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • প্রথম ঘটনা: আপনি শুধু ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন ( ‘দেব’ শব্দটি বলার আগেই থেমে যান), কোনো স্ত্রীর উদ্দেশ্যে নয়, বরং পিতার কথা অনুকরণ করছিলেন। উচ্চারণ অস্পষ্ট ছিল, শব্দ হয়নি বলে আপনার স্মরণ। কোনো নিয়তও ছিল না।
  • দ্বিতীয় ঘটনা: আপনি পাগল হওয়ার উপক্রম হচ্ছিলেন, জাদু দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন। এ অবস্থায় কোনো স্পষ্ট উচ্চারণ হয়নি।
  • তৃতীয় ঘটনা: শুধু জিহবা নড়েছিল, ঠোঁট নড়েনি—অর্থাৎ কোনো শব্দ বের হয়নি।

হানাফী ফিকহের নির্দেশনা অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলী জরুরি:

১. স্পষ্ট ও বোধগম্য উচ্চারণ (তালাফ্ফুয):

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, তালাকের শব্দ এমনভাবে উচ্চারণ করতে হবে যে অন্তত কথা বলা ব্যক্তি নিজে তা শুনতে পান। যদি কেবল জিহবা বা ঠোঁট নড়ে কিন্তু কোনো শব্দ না হয়, তবে তা তালাক গণ্য হবে না।

  • রদ্দুল মুহতার (৩য় খণ্ড, ২৪১ পৃষ্ঠা): “তালাকের জন্য উচ্চারণ জরুরি; শুধু মনে মনে ইচ্ছা করলে তালাক হয় না। উচ্চারণ বলতে এমন শব্দ বোঝায় যা নিজের কানে পৌঁছে।”
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১ম খণ্ড, ৩৫৪ পৃষ্ঠা): “যদি কেউ তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে কিন্তু নিজে তা শুনতে না পায় (যেমন খুব আস্তে বলে), তবে তালাক পতিত হবে না।”

আপনার তৃতীয় ঘটনায় ঠোঁটই নড়েনি, শুধু জিহবা নড়েছে—শব্দ হওয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রথম ঘটনায় আপনি বলেছেন ‘শব্দ হয় নি’ এবং ঠোঁট-জিহবা হালকা নড়েছিল। যেহেতু আপনি নিজে শুনতে পাননি, তাই তা তালাক নয়।

২. নিয়ত ও ইচ্ছা (ক্বাস্দ ও ইরাদা) জরুরি:

তালাকের জন্য স্বেচ্ছাকৃত ইচ্ছা ও সচেতনতা আবশ্যক। অনিচ্ছায়, ভুলে, বা জোরপূর্বক উচ্চারিত তালাক হানাফী মতে কার্যকর নয়—যদিও কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতার ভিত্তিতে ভিন্ন মত আছে, তবে এখানে আপনার কোনো নিয়তই ছিল না।

  • কিতাবুল আসল (২য় খণ্ড, ৮৭ পৃষ্ঠা): “যদি কেউ ‘তালাক’ বলে কিন্তু তার নিয়ত না হয়, তবে তা তালাক নয়; যদি তা কেবল কোনো ঘটনা বর্ণনা করার জন্য হয়।”
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২য় খণ্ড, ৩১০ পৃষ্ঠা): “যে ব্যক্তি তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে অথচ তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা নেই, বরং সে অন্য কিছু বোঝাতে চায়, তবে তার তালাক পতিত হবে না।”

আপনি স্পষ্ট বলেছেন: “আমার কোনো নিয়ত বা ইচ্ছাই ছিল না তালাকের।” বরং আপনি পিতার কথা রিপিট করছিলেন মায়ের দিকে—স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করেননি। তাই তালাক হয়নি।

৩. জাদু ও মানসিক অস্থিরতার প্রভাব:

আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনি জাদু দ্বারা আক্রান্ত ছিলেন এবং ‘পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন’। শারঈ বিধান:

  • রদ্দুল মুহতার (৪র্থ খণ্ড, ৪৩৯ পৃষ্ঠা): “যে ব্যক্তি জাদু বা মৃগীরোগের কারণে সম্পূর্ণ জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে, তার তালাক পতিত হবে না।”
  • ফাতাওয়া শামী (১ম খণ্ড, ২৮২ পৃষ্ঠা): “মাস্টার্বেশন বা তীব্র মানসিক চাপের কারণে যদি কেউ নিজের কথা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে তার তালাক কার্যকর হয় না।”

যদিও আপনি সম্পূর্ণ জ্ঞান হারাননি, তবে জাদু ও অবসেসিভ চিন্তা (ওয়াসওয়াসা) আপনার ইচ্ছাশক্তিকে দুর্বল করেছিল। এমতাবস্থায় অনিচ্ছাকৃত উচ্চারণ তালাক গণ্য হবে না।

৪. তালাকের শব্দ অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ:

প্রথম ঘটনায় আপনি ‘তালাক দেব’ বলার আগেই থেমে যান। শুধু ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে। আরবি ভাষায় ‘তালাক’ শব্দটি এককভাবে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু আপনার প্রসঙ্গ ও নিয়ত ছিল ভিন্ন।

  • আল-হিদায়া (১ম খণ্ড, ২২৯ পৃষ্ঠা): “যদি কেউ ‘তালাক’ বলে কিন্তু স্ত্রীকে বুঝিয়ে না বলে, বরং কাউকে সম্বোধন না করে, তবে তা তালাক নয় যতক্ষণ না তার নিয়ত স্পষ্ট হয়।”
    আপনি স্ত্রীকে সম্বোধন করেননি, বরং বাবা-মায়ের ঘটনা মনে করে কথাটি বলেছিলেন। তাই তা কার্যকর নয়।

উপসংহার:

উপরোক্ত সব কারণেই আপনার কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার স্ত্রী আপনার সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আগের মতোই রয়েছেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন এবং এ ধরনের ওয়াসওয়াসা (মনের খেয়াল) থেকে বাঁচতে নিম্নলিখিত আমল করুন:

  1. সকাল-সন্ধ্যার দুয়া ও যিকির: বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক ও নাস, এবং “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু” বেশি পড়ুন।
  2. জাদু-বাঁধা থেকে বাঁচতে: বৈধ রুকইয়াহ করান (কুরআন শরীফের আয়াত দ্বারা)। আপনার দাদা যে পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিচ্ছেন, তা যদি কুরআন-সুন্নাহ সম্মত হয় তবে চালিয়ে যেতে পারেন।
  3. মানসিক প্রশান্তির জন্য: অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার ও দুরূদ শরীফ পড়ুন।
  4. একজন বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ: ব্যক্তিগতভাবে কোনো মুফতীর কাছে বিষয়টি খুলে বললে আপনি আরও নিশ্চিত হতে পারবেন।

প্রাসঙ্গিক উক্তি:

  • হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন: “ওয়াসওয়াসা বা ভুলবশত তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলে তালাক হয় না; তবে সতর্কতার জন্য পুনরায় বিবাহ পড়ে নেওয়া উত্তম।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩১২)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন: “তালাকের জন্য স্পষ্ট উচ্চারণ ও ইচ্ছা অপরিহার্য। কেবল কল্পনা বা অনিচ্ছাকৃত উচ্চারণ তালাক সাব্যস্ত করে না।” (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪৮৫)

আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং তিনিই তাওফীক দাতা।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.